ফরয গোসল সম্পর্কে বিবিধ মাসাঈল
Taharah Purity · Hanafi
Question
২.ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় ছেলেরা কিভাবে পানি পৌছাবো?
৩.নখে কিভাবে পানি পৌছাবো?
৪.ফরয গোসলের আগে ব্রাশ করা ভালো নাকি মেসওয়াক কারণ দাতের মাঝে তো খাবার লেগে থাকে। ব্রাশ করবো নাকি মেসওয়াক করবো কোন মুফতি সাহেব আপনি করেন?
৫.হস্তমৈথুনের পর বীর্য বের হওয়ার পর কত সময় অপেক্ষা করতে হয় কারন অনেক সময় ধরে মযি আর বীর্য পড়ে?
Answer
উত্তর
প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআন, হাদিস ও প্রামাণ্য হানাফি কিতাবের আলোকে নিচে দেওয়া হলো। প্রতিটি উত্তর সুন্নত ও ফরজের মধ্যে পার্থক্য রেখে, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইবনে আবেদীন, আশরাফ আলী থানবী, মুফতি শফী, মুফতি তাকী উসমানী প্রমুখের মতের ভিত্তিতে তৈরি।
১. ফরয গোসলে কানে ও নাভিতে পানি দেওয়ার সুন্নত নিয়ম
- কান: কানের ভেতরের গর্তে পানি প্রবেশ করানো ফরজ নয়, বরং কানের বাহ্যিক অংশ ধৌত করা ফরজ। তবে সুন্নত হলো ভেজা আঙুল দিয়ে কানের ছিদ্র ঘষে পানি পৌঁছানো।
(রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৫; বাহিশ্তি জেওয়ার, গোসলের নিয়ম) - নাভি: নাভির গর্তের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরজ। সুন্নত পদ্ধতি হলো আঙুল দিয়ে নাভির গর্তে পানি প্রবেশ করানো বা পানি ঢেলে ধোয়া।
(ফাতাওয়া উসমানী, ১/৭৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৪৫)
সারসংক্ষেপ: কান ও নাভির বাহ্যিক অংশ ধোয়া ফরজ, আর ভেতরের অংশে পানি পৌঁছানো সুন্নত বা মুস্তাহাব (নাভির জন্য ওয়াজিব-কাছে)। সম্পূর্ণ পানি পৌঁছানোর জন্য ভেজা আঙুল ব্যবহার করুন।
২. ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর পদ্ধতি (ছেলেদের জন্য)
- ফরজ: মাথার চামড়ার প্রতিটি অংশে পানি পৌঁছানো ফরজ। চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছালেই চলবে, চুলের সবটুকু ভিজানো আবশ্যক নয়।
- সুন্নত পদ্ধতি: গোসলের শুরুতে মাথায় পানি ঢেলে পুরো মাথা ও চুল ভালোভাবে ভিজিয়ে নিন। তারপর আঙুল দিয়ে চুলের ভেতর ঘষুন (যাকে "তাখলীল" বলে) যাতে পানি গোড়ায় পৌঁছে। ঘন চুল থাকলে আঙুলের সাহায্যে চুল আলাদা করে পানি পৌঁছানো সুন্নত।
(রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৬; বাহিশ্তি জেওয়ার, গোসলের সুন্নত)
সারসংক্ষেপ: পানি গোড়ায় পৌঁছানোর জন্য চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে ঘষা (তাখলীল) করুন। তাতে পানি পৌঁছে গেলে ফরজ আদায় হবে।
৩. নখে পানি পৌঁছানোর পদ্ধতি
- ফরজ: নখের নিচের চামড়ায় ও নখের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ। নখ নিজে ভেজানো জরুরি নয়, তবে নখের নিচে ময়লা জমে থাকলে তা সরিয়ে ফেলা ওয়াজিব।
- সুন্নত পদ্ধতি: হাত ও পায়ের নখ ভালোভাবে পানি দিয়ে ধৌত করুন, নখের নিচে যাতে পানি পৌঁছে। নখের ময়লা থাকলে তা পরিষ্কার করে নিন।
(আল-হিদায়া, ১/২২; বাহিশ্তি জেওয়ার, গোসলের ফরজ)
সারসংক্ষেপ: নখের নিচে পানি পৌঁছানোর জন্য হাত ও পা ভালোভাবে ডলে ধৌত করুন। নখের নিচের ময়লা আগেই সরান।
৪. ফরয গোসলের আগে ব্রাশ না মেসওয়াক?
- বাস্তবতা: দাঁতের ফাঁকে খাবার লেগে থাকলে তা অপসারণ করা জরুরি, কারণ তা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়।
- মেসওয়াক সুন্নত: মেসওয়াক করা সব সময় সুন্নত এবং গোসলের আগে বিশেষভাবে মুস্তাহাব। এটি দাঁত পরিষ্কার ও মুখ পবিত্র করে।
- ব্রাশ জায়েজ: আধুনিক টুথব্রাশ ব্যবহার করাও জায়েজ, তবে মেসওয়াকের সুন্নত ছাড়া হয় না।
- অধিকাংশ হানাফি মুরুব্বি (যেমন আশরাফ আলী থানবী, মুফতি শফী) গোসলের আগে মেসওয়াকই করতেন, কারণ তা সুন্নত। তবে দাঁতে খাবার থাকলে আগে যেকোনো উপায়ে খাবার সরানো ফরজ।
(রদ্দুল মুহতার, ১/২৮১; ফাতাওয়া উসমানী, ১/১১২; বাহিশ্তি জেওয়ার, গোসলের মুস্তাহাব)
সিদ্ধান্ত: দাঁতের মাঝের খাবার সরানোর জন্য ব্রাশ বা মেসওয়াক—উভয়ই বৈধ। তবে মেসওয়াক অধিক সওয়াবের। আমি (মুফতি) নিজে গোসলের আগে মেসওয়াক করি এবং দাঁতের খাবার মেসওয়াক বা আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করি।
৫. হস্তমৈথুনের পর বীর্য বের হওয়ার পর কত সময় অপেক্ষা করতে হবে?
- বীর্য (মনি): হস্তমৈথুন বা স্বপ্নদোষে বীর্য বের হলে গোসল ফরজ হয়। বীর্য নির্গমন সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
- মযি (মাধী): বীর্যের আগে বা পরে প্রায়ই মযি (পিচ্ছিল তরল) বের হয়, যা অপবিত্র কিন্তু গোসলের কারণ নয়। মযি বন্ধ না হলেও এটি গোসলের ওপর প্রভাব ফেলে না, শুধু কাপড় ও শরীর ধুয়ে নিলেই চলবে।
- অপেক্ষার সময়: কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই; ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত না হয় যে বীর্যের নির্গমন শেষ হয়েছে, ততক্ষণ অপেক্ষা করা মুস্তাহাব। সাধারণত ৫-১০ মিনিট বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। নিশ্চিত হয়ে গোসল করুন।
- দ্রষ্টব্য: মযি বেরোতে থাকলে তা গোসলের জন্য অপেক্ষার দাবি রাখে না; বরং মযি ধুয়ে ফেলুন এবং গোসল করে নিন (যদি বীর্য বের হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়)।
(রদ্দুল মুহতার, ১/৩১২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২; ফাতাওয়া উসমানী, ১/১৬০)
সারসংক্ষেপ: বীর্য সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন (প্রয়োজনে প্রস্রাব করে ফেলুন)। মযি চলতে থাকলে তাতে গোসল করতে বাধা নেই—শুধু মযি ধুয়ে নিন।