কৃত্রিম ঘাসের মাঠ ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা কি জায়েজ?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়া সালাতু ওয়া সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ।
প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যবসা (কৃত্রিম ঘাসের মাঠ ভাড়া দেওয়া) মূলত একটি মুবাহ ব্যবসা, তবে এর সাথে কিছু শর্ত ও সতর্কতা জড়িত। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবসাটি জায়েজ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে:
১. মাঠ ভাড়া দেওয়ার মূল চুক্তি:
কৃত্রিম ঘাসের মাঠ তৈরি করে তা ঘণ্টার ভিত্তিতে ভাড়া দেওয়া একটি মুবাহ ব্যবসা। এটি ইসলামী ফিকহের “ইজারাহ” (ভাড়া/লিজ) নীতির আওতাভুক্ত। ইজারাহতে শর্ত হলো, ভাড়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো বৈধ জিনিসের ব্যবহার দেওয়া। যেহেতু মাঠটি খেলাধুলার জন্য ব্যবহার করা হয় এবং খেলাধুলা বা শারিরিক কসরত নিজে মুবাহ , তাই মূল চুক্তিটি মুবাহ বা বৈধ।
(সূত্র: আল-হিদায়াহ, ৩/২২০; ফাতাওয়া আলমগীরি, ৪/৪১০)
২. খেলার সময় ও সতর ঢাকার সমস্যা:
প্রশ্নে বলা হয়েছে, বিকেল থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত খেলা হয় এবং অনেক খেলোয়াড় সতর (শরীরের আবশ্যকীয় অংশ) ঢেকে খেলে না। এটি একটি গুরুতর সমস্যা। ইসলামে পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা, আর মহিলার সতর হলো পুরো শরীর (চেহারা ও হাতের কব্জি ছাড়া)। খেলাধুলার সময়ও সতর ঢেকে রাখা ফরজ।
তবে, মাঠ ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা জায়েজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মাঠের মালিক বা ব্যবসায়ীকে চেষ্টা করতে হবে যেন খেলোয়াড়রা সতর ঢেকে খেলে। যদি মালিক সতর ঢাকার বিষয়ে নিষেধ করেন বা শর্ত হিসেবে বলেন, তাহলে ব্যবসাটি জায়েজ হবে। কিন্তু যদি মালিক জানেন যে, এখানে সতর ঢেকে খেলা হয় না, এবং তিনি তা বন্ধ করার কোনো চেষ্টা করেন না, তাহলে এই ব্যবসা থেকে আয় করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হবে।
রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে এসেছে, কোনো জিনিস ভাড়া দেওয়া জায়েজ, তবে যদি সেই জিনিসটি এমন কাজে ব্যবহৃত হয় যা হারাম বা গুনাহের কাজ, তাহলে তা ভাড়া দেওয়া জায়েজ নয়। কিন্তু এখানে খেলাধুলা নিজে হারাম নয়, বরং সতর ঢাকার মতো একটি ফরজ কাজ লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাই মালিকের দায়িত্ব হলো, তিনি খেলোয়াড়দের সতর ঢাকতে বলবেন এবং চুক্তিতে শর্ত দেবেন।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫; ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৮০)
৩. খেলার সময়সীমা:
বিকেল থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত খেলা চলা নিজে কোনো সমস্যা নয়, তবে এর মধ্যে নামাজের সময় হলে খেলোয়াড়দের নামাজ পড়ার সুযোগ দিতে হবে। মালিকের উচিত, খেলার সময়সূচিতে নামাজের বিরতি রাখা। যদি নামাজের সময় খেলা চলতে থাকে এবং খেলোয়াড়রা নামাজ না পড়ে, তাহলে মালিকের জন্য ব্যবসাটি জায়েজ থাকবে না, কারণ এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার শামিল।
(সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, ১৪/৪৫৬)
৪. ব্যবসার আয়ের বৈধতা:
যদি মালিক উপরোক্ত শর্তগুলো (সতর ঢাকা, নামাজের বিরতি) মানার চেষ্টা করেন এবং খেলোয়াড়দেরকে এসব বিষয়ে সচেতন করেন, তাহলে এই ব্যবসার আয় হালাল হবে। কিন্তু যদি মালিক সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন এবং জানা সত্ত্বেও সতর ঢাকার বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেন, তাহলে তার আয়ে বরকত থাকবে না এবং তা মাকরূহ হবে।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, “যে ব্যবসায় হারাম কাজের সহযোগিতা করা হয়, তা থেকে আয় করা জায়েজ নয়। তবে যদি ব্যবসাটি নিজে বৈধ হয় এবং হারাম কাজটি অন্যায়ভাবে হয়ে যায়, তাহলে মালিকের চেষ্টা অনুযায়ী ব্যবসাটি জায়েজ হতে পারে।”
(সূত্র: মা’আরিফুল কুরআন, ২/৪৫০)
৫. পরামর্শ:
- মাঠ ভাড়া দেওয়ার সময় লিখিত বা মৌখিকভাবে শর্ত দিন যে, খেলোয়াড়দের সতর ঢেকে খেলতে হবে এবং নামাজের সময় বিরতি দিতে হবে।
- মাঠে একটি নোটিশ বা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিন যেখানে সতর ঢাকার নির্দেশনা লেখা থাকবে।
- খেলার সময়সূচি এমনভাবে সাজান যেন নামাজের সময় খেলা বন্ধ থাকে।
- যদি কোনো দল সতর ঢেকে না খেলে, তাহলে তাদের ভাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন।
উপসংহার:
আপনার ব্যবসাটি মূলত মুবাহ, তবে শর্ত হলো, আপনাকে সতর ঢাকা ও নামাজের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং চেষ্টা করতে হবে। যদি আপনি এসব বিষয়ে উদাসীন থাকেন, তাহলে ব্যবসাটি মাকরূহ হবে এবং আয়ে বরকত কম হবে। আল্লাহ তাআলা আপনাকে হালাল রিজিক দান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।