মিশনারি হসপিটালে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়া জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার চর্মরোগের সমস্যা আছে দীর্ঘদিন হলো, অনেক জায়গায় দেখাইছি , কোথাও পরিপূর্ণ ফলাফল পাচ্ছি না, এই অবস্থায় একজন বললো মিশনারি হসপিটালে ডাক্তার দেখাতে।
এখন মিশনারি হসপিটালের চিকিৎসা নেয়া কি ঠিক হবে?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতuh
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, মিশনারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয (বৈধ) কি না, তা নির্ভর করে সেখানে গিয়ে ধর্মীয় বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার শর্ত বা আকিদা (বিশ্বাস) নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না, তার উপর।
আপনার প্রশ্নটি যেহেতু হানাফী মাযহাব অনুযায়ী করা হয়েছে, তাই আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে বিশ্লেষণ করব।
১. চিকিৎসা করানো ইসলামে বৈধ ও উৎসাহিত
প্রথমত, জেনে রাখা জরুরি যে, রোগ হলে চিকিৎসা করানো ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ এবং উৎসাহিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমরা চিকিৎসা করাও, কেননা আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ দেননি যার নিরাময় দেননি।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭৮)
সুতরাং আপনার চর্মরোগের জন্য ডাক্তার দেখানো এবং চিকিৎসা নেওয়া নিজেই কোনো গুনাহের কাজ নয়, বরং এটি সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি।
২. মিশনারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার বিধান
মিশনারি হাসপাতাল মূলত খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের (Missionaries) দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামী পণ্ডিতগণ (ফুকাহায়ে কেরাম) কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন:
ক. যদি চিকিৎসা নিতে গিয়ে ধর্মীয় প্রভাব বা চাপ থাকে: যদি কোনো মিশনারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীকে খ্রিস্টান ধর্মের রীতিনীতি (যেমন: প্রার্থনা, বাইবেল পাঠ, ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব) মেনে চলতে বাধ্য করা হয়, অথবা চিকিৎসার শর্ত হিসেবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয়, তাহলে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয নয় (নাজায়েয)।
খ. যদি শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবা নেওয়া হয় (ধর্মীয় বিষয়ে জড়িত না হয়ে): যদি হাসপাতালটি শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবা দেয় এবং রোগীকে তার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসে (ইসলাম) অটল রেখে শুধুমাত্র ডাক্তারি চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাহলে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয (বৈধ)। কারণ, ইসলামে রোগীর জন্য নিরাময়ের উপায় খোঁজা জরুরি, আর চিকিৎসা একটি পার্থিব (দুনিয়াবি) কাজ। ডাক্তার মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তার কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয, যদি না সে ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে।
৩. হানাফী ফিকহের কিতাবের দলিল
হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব "রদ্দুল মুহতার" (ফাতাওয়া শামী) এবং "ফাতাওয়া হিন্দিয়া" (আলমগীরি)-তে অমুসলিম ডাক্তার বা চিকিৎসক থেকে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে:
- রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, ২য় খণ্ড) এ উল্লেখ আছে যে, প্রয়োজনে অমুসলিম (যেমন: ইহুদি, খ্রিস্টান) ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানো জায়েয, তবে শর্ত হলো—সে যেন এমন কোনো ওষুধ বা পদ্ধতি না দেয় যা শরিয়তের পরিপন্থী (যেমন: হারাম উপাদান বা ধর্মীয় কুসংস্কার)।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫ম খণ্ড, ৩৫৩ পৃষ্ঠা) তে বলা হয়েছে, "যদি কোনো মুসলিমের জন্য মুসলিম ডাক্তার পাওয়া না যায়, তবে জিম্মি (অমুসলিম নাগরিক) ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানোতে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না সে ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে।"
৪. আপনার ক্ষেত্রে করণীয়
আপনি লিখেছেন, আপনি দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগছেন এবং অনেক জায়গায় দেখিয়েছেন, কিন্তু ফল পাননি। এখন একজন আপনাকে মিশনারি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আপনার জন্য নির্দেশনা:
১. প্রথমে খোঁজ নিন: আপনি যে মিশনারি হাসপাতালে যেতে চান, সেখানে গিয়ে দেখুন তারা কি শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবা দেয়, নাকি রোগীদের উপর ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে? সাধারণত অনেক মিশনারি হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি ধর্মপ্রচারও করা হয়। যদি সেখানে গিয়ে আপনাকে খ্রিস্টান ধর্মের কোনো আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বলা হয়, অথবা আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত আসার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেখানে যাওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
২. যদি শুধু চিকিৎসা হয়: যদি হাসপাতালটি একটি সাধারণ হাসপাতালের মতোই আচরণ করে, শুধুমাত্র ডাক্তারি পরামর্শ ও ওষুধ দেয়, এবং আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসে কোনো হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয। কারণ, আপনার রোগ নিরাময়ের প্রয়োজনীয়তা আছে, আর ইসলাম কঠিন অবস্থায় সহজতার নির্দেশ দিয়েছে।
৩. বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করুন: যেহেতু আপনি অনেক জায়গায় দেখিয়েছেন, তাই চেষ্টা করুন কোনো মুসলিম ডাক্তার বা ইসলামী হাসপাতালে (যেমন: বাংলাদেশের ইবনে সিনা, ল্যাবএইড, বা কোনো সরকারি হাসপাতালের ভালো চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ) দেখাতে। যদি সেখানে ভালো ফল না পান, তবেই মিশনারি হাসপাতালে যাওয়ার কথা ভাবুন, তবে শর্ত হলো—ধর্মীয় বিষয়ে সতর্ক থাকবেন এবং নিজের ঈমান (বিশ্বাস) রক্ষা করবেন।
৫. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
মনে রাখবেন, চিকিৎসা নেওয়া জায়েয হলেও, রোগ নিরাময় সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হাতে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রোগ এবং তার নিরাময় উভয়ই নাজিল করেছেন।" (সহিহ বুখারি)। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দুআ করা এবং ধৈর্য ধরা জরুরি। কোনো ডাক্তার বা হাসপাতালকে আল্লাহর সাথে শরিক (অংশীদার) বানানো যাবে না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
- যদি মিশনারি হাসপাতালে গিয়ে আপনাকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়, অথবা আপনার আকিদা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেখানে যাওয়া হারাম (নাজায়েয)।
- যদি সেখানে শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় এবং ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা হয়, তাহলে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয (বৈধ)।
আপনার জন্য আমার পরামর্শ হলো, প্রথমে ভালোভাবে খোঁজ নিন। যদি সম্ভব হয়, অন্য কোনো ভালো মুসলিম চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। আর যদি সত্যিই সেখানে যেতেই হয়, তাহলে নিজের ঈমান ও বিশ্বাস অটুট রাখুন এবং শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সুস্থতা দান করুন এবং আপনার রোগ থেকে মুক্তি দিন। আমিন।