নাবালেক মেয়ে শিশুকে কি কোনো জরুরি কারণ ছাড়া নন মাহারাম পুরুষের কোলে দেওয়া জায়েয আছে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
১.নাবালেক মেয়ে শিশুকে কি কোনো জরুরি কারণ ছাড়া নন মাহারাম পুরুষের কোলে দেওয়া জায়েয আছে?
২.অনেক বাবা মা ইচ্ছেকৃত ভাবে সৌহার্দ্য দেখিয়ে ছোট নাবালেক মেয়ে শিশুকে ননমাহারাম পুরুষে কোলে দেন। সেই ক্ষেত্রে বাবা-মার এই কাজটি শরীয়দৃষ্টিতে কেমন হবে?
জাঝাকাল্লাহ্
Answer
জাযাকাল্লাহু খাইরান আপনার প্রশ্নের জন্য। নিম্নে আপনার প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর প্রদান করা হলো:
প্রশ্ন ১: নাবালেগ মেয়ে শিশুকে জরুরি কারণ ছাড়া নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া
উত্তর: ইসলামী শরীয়তে নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক) মেয়ে শিশুকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
হানাফী মাযহাবের মত:
হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (শামী) এবং ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"শিশা (ছোট মেয়ে) যদি এমন বয়সের হয় যে, পুরুষের দিকে আকর্ষণ বোধ করে না এবং পুরুষও তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না, তবে তাকে কোলে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি এমন বয়স হয় যে, সাধারণত আকর্ষণের বিষয় হয়ে থাকে, তবে তা জায়েয নয়।"
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, যে শিশু মেয়ে দুধপান করা অবস্থায় থাকে বা এত ছোট যে পুরুষের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই এবং পুরুষেরও তার প্রতি আকর্ষণ নেই, এমন শিশুকে কোলে নেওয়া জায়েয। কিন্তু যখন সে এমন বয়সে পৌঁছে যে, সাধারণত তার দিকে পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, তখন তাকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া জায়েয নয়।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, যে শিশুর বয়স এমন যে, সে নিজে থেকে পবিত্রতা রক্ষা করতে পারে না এবং তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ জন্মাতে পারে, তাকে নন-মাহরামের কোলে দেওয়া মাকরূহ।
আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে:
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) এবং মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মতে, বর্তমান যুগে সাধারণত ২-৩ বছর বয়সের পর থেকে মেয়ে শিশুদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। তাই সতর্কতামূলকভাবে ছোটবেলা থেকেই নন-মাহরাম পুরুষের কোলে না দেওয়াই উত্তম।
ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ আছে:
"ছোট মেয়ে শিশুকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া জায়েয আছে কি না, তা নির্ভর করে শিশুটির বয়স ও অবস্থার উপর। যদি শিশুটি এত ছোট হয় যে, সাধারণত মানুষের আকর্ষণের বিষয় নয় (যেমন: ২ বছরের কম বয়সী), তবে জায়েয। কিন্তু এর বেশি বয়সে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া জায়েয নয়।"
সারসংক্ষেপ:
১. জরুরি কারণ ছাড়া নাবালেগ মেয়ে শিশুকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া জায়েয নেই যদি শিশুটি এমন বয়সের হয় যে, তার প্রতি সাধারণত আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।
২. যদি শিশুটি খুব ছোট হয় (যেমন: দুধপানকারী বা ২ বছরের কম) এবং জরুরি প্রয়োজন থাকে, তবে সীমিত পরিসরে জায়েয হতে পারে।
৩. সতর্কতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি: যেহেতু বর্তমান সমাজে ফিতনার আশংকা বেশি, তাই ছোটবেলা থেকেই নন-মাহরাম পুরুষের কোলে না দেওয়াই অধিক নিরাপদ এবং উত্তম।
প্রশ্ন ২: বাবা-মায়ের ইচ্ছাকৃতভাবে সৌহার্দ্য দেখিয়ে মেয়ে শিশুকে নন-মাহরামের কোলে দেওয়ার বিধান
উত্তর: বাবা-মায়ের ইচ্ছাকৃতভাবে সৌহার্দ্য দেখানোর নামে ছোট মেয়ে শিশুকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় ও গুনাহের কাজ।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
"বলুন, মুমিন পুরুষদেরকে তাদের দৃষ্টি নত রাখতে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করতে বলুন। এটা তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।" (সূরা আন-নূর: ৩০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন কোনো নারীকে (অন্য পুরুষের সাথে) একান্তে সাক্ষাৎ না করে। কারণ, তৃতীয়জন হলো শয়তান।" (সহীহ বুখারী: ৩০০৬)
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"যে মেয়ে শিশু এমন বয়সে পৌঁছেছে যে, তার প্রতি পুরুষের আকর্ষণ জন্মাতে পারে, তাকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া জায়েয নয়। আর যদি কেউ তা করে, তবে সে গুনাহগার হবে।"
রদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেছেন:
"ছোট মেয়েকে নন-মাহরামের কোলে দেওয়া তখনই জায়েয, যখন সে এমন ছোট থাকে যে, তার প্রতি কোনো প্রকার আকর্ষণ থাকে না। কিন্তু যখন সে এমন বয়সে পৌঁছে যে, সাধারণত আকর্ষণের বিষয় হয়, তখন তা জায়েয নয়।"
বাবা-মায়ের দায়িত্ব:
১. বাবা-মা সন্তানের অভিভাবক এবং তাদের দায়িত্ব হলো সন্তানকে সকল প্রকার ফিতনা থেকে রক্ষা করা।
২. সৌহার্দ্য দেখানো কোনো শরীয়তসম্মত অজুহাত হতে পারে না। ইসলামী আদব-কায়দার মধ্যে থেকেই সৌহার্দ্য প্রকাশ করা যায়।
৩. ইমাম আওযাঈ (রহ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজের মেয়েকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেয়, সে যেন নিজ হাতে তার মেয়েকে ফিতনায় ফেলে দেয়।"
আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে:
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:
"বর্তমান যুগে ফিতনা-ফাসাদ অনেক বেশি। তাই ছোট মেয়ে শিশুদেরকেও নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এমনকি আত্মীয়-স্বজন হলেও যদি মাহরাম না হয়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।"
সারসংক্ষেপ:
১. বাবা-মায়ের ইচ্ছাকৃতভাবে সৌহার্দ্য দেখিয়ে মেয়ে শিশুকে নন-মাহরাম পুরুষের কোলে দেওয়া শরীয়তসম্মত নয় এবং এটি গুনাহের কাজ।
২. এটি শিশুর ভবিষ্যতের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৩. বাবা-মা হিসেবে সন্তানের ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব।
৪. সৌহার্দ্য প্রকাশের জন্য নন-মাহরামের কোলে দেওয়া কখনোই জরুরি নয়; বরং শরীয়তসম্মত উপায়ে সৌহার্দ্য প্রকাশ করা যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।