এটা বের হবো কিভাবে।আমাকে সাহায্য করুন উস্তায।
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার একজন মেয়ে এবং আমার একজন বেস্ট ফ্রেন্ড আছে সেও মেয়ে।প্রথম প্রথম আমাদের সম্পর্কটা অনেক সুন্দর ছিলো।আমার নিয়্যাত ছিলো আমরা একসাথে দ্বীন প্রাকটিস করবো একসাথে আমল করবো।কিন্তু যত দিন যেতে লাগলো আমরা আবেগে জড়িয়ে পড়লাম।ওর হাত ধরতে ভালো লাগে। ভালোবাসি বলতে ভালো লাগে। তারপর জড়িয়ে ধরা।এসব করতে করতে আমরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজে জড়িয়ে পড়লাম।স্বামী স্ত্রী যেমন মিলিত হয় আমরাও সেইম ওইভাবে মিলিত হই।এটা কয়েকবার হয়েছে।দূরে থাকলে ছবি গোপন ছবি আদান প্রদান ভিডিও কলে অশ্লিলতা সবই চলমান।এসব করার পর আমি একটুও শান্তি পাই না।আমি জানি আমি অনেক বড় অপরাধে জড়িয়ে আছি।কিন্তু কোনোভাবেই এটা থেকে বের হতে পারছি না।আমি যদি তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিই তাহলে ও পাগলামি করে।খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়।সেও জানে এটা গুনাহ।এটা থেকে বের হওয়ার ইচ্ছে ওরও আছে।কিন্তু সে আমাকে ছাড়তে পারবে না।আমিও তাকে ছাড়া থাকতে পারি না নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। আমরা প্রতিনিয়ত এই গুনাহ করে যাচ্ছি। এর ফলে নিজের দ্বীনদারিতাও হারানোর পথে।আমি কি করবো উস্তায আমাকে একটা পরামর্শ দেন প্লিজ।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন এবং সংকটপূর্ণ। আপনার আন্তরিক অনুশোচনা এবং এই গুনাহ থেকে বের হওয়ার আগ্রহ দেখে আমরা খুবই আশাবাদী যে, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন এবং সঠিক পথ দেখাবেন ইনশাআল্লাহ।
আপনার সমস্যার গুরুত্ব
আপনি যে কাজে জড়িয়ে পড়েছেন, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম (নিষিদ্ধ) এবং বড় গুনাহ। বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক, গোপন ছবি আদান-প্রদান, ভিডিও কলে অশ্লীলতা — এগুলো সবই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ বলেছেন "ব্যভিচারের কাছেও যেও না" — অর্থাৎ এমন সব কাজ থেকেও দূরে থাকতে হবে যা ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়, যেমন: অবৈধ সম্পর্ক, আবেগপূর্ণ কথাবার্তা, স্পর্শ, জড়িয়ে ধরা ইত্যাদি।
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) তে উল্লেখ আছে:
النظر إلى الأجنبية حرام، واللمس بشهوة حرام "অপরিচিত (অ-মাহরাম) নারীর দিকে (শাহওয়াতের সাথে) তাকানো হারাম এবং শাহওয়াতের সাথে স্পর্শ করাও হারাম।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২৯)
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ বলা হয়েছে:
الزنا من أكبر الكبائر بعد الشرك بالله "ব্যভিচার শিরকের পর সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১২৮)
আপনার করণীয় — ব্যবহারিক সমাধান
১. তাওবাহ করুন
সর্বপ্রথম আপনাকে আন্তরিক তাওবাহ করতে হবে। তাওবাহর শর্ত হলো:
- গুনাহ করা বন্ধ করা
- গুনাহর জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা
হাদীসে আছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ "গুনাহ থেকে তাওবাহকারী এমন, যেন তার কোনো গুনাহই নেই।" (ইবনে মাজাহ: ৪২৫০)
২. সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করুন
আপনাকে অবশ্যই এই সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করতে হবে। এখানে "কথা কমানো" বা "ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া" নয় — বরং একবারে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি। কারণ, শয়তান ধীরে ধীরে আবার আপনাদেরকে সেই পথে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
৩. তার "পাগলামি"র হুমকি মোকাবেলা
আপনার বন্ধু যে "পাগলামি" বা "খাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার" হুমকি দিচ্ছে — এটি একটি মানসিক চাপ ও হেরফেরের কৌশল। এটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি তার এই হুমকিতে ভীত হয়ে গুনাহ চালিয়ে যেতে পারবেন না।
- আপনি তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে, এই সম্পর্ক সম্পূর্ণ হারাম এবং আপনারা উভয়েই আল্লাহর গযবের ভয়ে এই সম্পর্ক ছিন্ন করছেন।
- যদি সে সত্যিই আপনার ভালো বন্ধু হয়, তবে সে আপনার দ্বীনের মঙ্গল কামনা করবে, আপনার ধ্বংস নয়।
- তার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করার দায়িত্ব আপনার নয় — এটি তার নিজের সিদ্ধান্ত। আপনি তার জন্য দোয়া করবেন।
৪. বিয়ের পরামর্শ
যদি আপনারা দুজনেই সত্যিই একে অপরকে ভালোবাসেন এবং একসাথে থাকতে চান, তাহলে সঠিক ও বৈধ পথ হলো বিয়ে করা। তবে এর জন্য প্রয়োজন:
- অভিভাবকদের সম্মতি
- বৈধ পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন করা
হাদীসে আছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে।" (বুখারী: ৫০৬৫)
তবে মনে রাখবেন, বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের মধ্যে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ থাকতে হবে। বিয়ের পরই কেবল বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে।
৫. দ্বীনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করুন
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়ুন
- কুরআন তিলাওয়াত করুন
- যিকির করুন, বিশেষ করে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এবং "আস্তাগফিরুল্লাহ"
- নফল রোজা রাখুন — এটি প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
হাদীসে আছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ "যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিয়ে করে, আর যে সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোজা রাখে, কারণ রোজা তার জন্য ঢাল স্বরূপ।" (বুখারী: ৫০৬৫)
৬. সঙ্গী পরিবর্তন করুন
নিজের জন্য সৎ ও দ্বীনদার বান্ধবী তৈরি করুন যারা আপনাকে ভালো কাজে উৎসাহিত করবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ "মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের উপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে সে কাকে বন্ধু বানায়।" (আবু দাউদ: ৪৮৩৩, তিরমিযী: ২৩৭৮)
৭. পরিবার ও অভিভাবককে জানান
যদি সম্ভব হয়, আপনার পরিবারের কোনো বিশ্বস্ত সদস্যকে বিষয়টি জানান। তারা আপনাকে এই সম্পর্ক থেকে বের হতে সাহায্য করবে এবং প্রয়োজনে আপনার বন্ধুর পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করতে পারবে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. তাঁর তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন এ উল্লেখ করেছেন যে, অবৈধ সম্পর্কের কারণে:
- মানুষের ঈমান দুর্বল হয়ে যায়
- নামাজের প্রতি অনীহা তৈরি হয়
- হালাল রিজিকে বরকত কমে যায়
- অন্তরে অস্থিরতা ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়
আপনি নিজেই বলেছেন যে, এই কাজের পর আপনি "একটুও শান্তি পাচ্ছেন না" — এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা এবং আপনার ঈমান জীবিত থাকার প্রমাণ। এই অস্বস্তিই আপনার তাওবাহর পথ খুলে দিয়েছে।
চূড়ান্ত পরামর্শ
১. আজই এই সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করুন — কোনো শর্ত ছাড়া। ২. আন্তরিক তাওবাহ করুন এবং নিয়মিত ইস্তিগফার পড়ুন। ৩. নামাজ ও রোজা নিয়মিত পালন করুন। ৪. বিয়ে করার ইচ্ছা থাকলে বৈধ পথে বিয়ে করুন, তবে বিয়ের আগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ রাখুন। ৫. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন — তিনি অবশ্যই পথ দেখাবেন।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আল্লাহ আপনাকে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখান এবং আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দান করুন। আমিন।