বেগানা নারীর প্রতি আকর্ষণ থেকে পরিত্রাণ
Halal and Haram · Hanafi
Question
হুজুর, অনেক মানসিক পেরেসানি নিয়ে প্রশ্নটি করছি।আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি যথাসম্ভব মেয়েদের সংপর্শ এড়িয়ে চলতাম স্কুল থেকেই এবং যথাসম্ভব দীন পালনের চেষ্টা করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসে একাডেমিক প্রয়োজনে মেয়েদের সাথে কাজ করতে হয়।
দু:খজনকভাবে একজনকে আমার ভাল লেগে যায়। কিন্তু মেয়েটি দীনী চিন্তাধারা পোষণ করে না। একাডেমিক কাজে মাঝেমধ্যে দেখা করতে হয় । আমি অনেক চেস্টা করেছি ভুলে যাওয়ার, তাহাজ্জুত নামাজ পড়ে কান্না কাটি করেছি। কিন্তু কোনো ভাবেই মাথা থেকে বের করতে পারছি না। কয়েকমাস যাবত এই সমস্যা বয়ে চলছি।
হুজুর,এখন আমি কি করতে পারি? অনেক মানসিক চিন্তায় থাকি এটা নিয়ে
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই,
আপনার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পরিবেশে দীন ধরে রাখা সত্যিই কঠিন, বিশেষ করে যখন একাডেমিক কারণে মেয়েদের সাথে কাজ করতে হয়। আপনার চেষ্টা এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করার বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
প্রথমত, জেনে রাখুন: বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ একটি মানবিক স্বভাব। ইসলাম এটি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে না, বরং এর জন্য বৈধ ও অবৈধ পথের নির্দেশনা দিয়েছে। আপনি যে সংগ্রাম করছেন, এটি আপনার ঈমানের প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ "আর যে তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।" (সূরা আর-রাহমান: ৪৬)
আপনার করণীয় সম্পর্কে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নোক্ত পরামর্শ দিচ্ছি:
১. দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করুন (গর্দান নিচু রাখুন)
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উদ্দেশ্যে বলেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ "মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত।" (সূরা আন-নূর: ৩০)
হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সহ সকল ইমামের মতে, বেগানা নারীর দিকে (প্রয়োজন ছাড়া) তাকানো হারাম। এমনকি প্রয়োজন থাকলেও শুধু প্রয়োজনীয় পরিমাণে তাকানো জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)
ব্যবহারিক পদক্ষেপ: একাডেমিক কাজে যখন কথা বলতে হয়, তখন সরাসরি চোখের দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে বা পাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। প্রয়োজনে ফোনে বা ইমেইলে যোগাযোগ সীমিত রাখুন।
২. বিয়ের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বিবেচনা করুন
আপনি যদি আর্থিকভাবে সক্ষম হন এবং বিয়ের বয়স হয়, তাহলে বিয়ে করার চেষ্টা করুন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ "হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সহিহ বুখারি: ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)
মনে রাখবেন: আপনি যে মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, তিনি যদি দীনদার না হন, তাহলে তার সাথে বিয়ে করা আপনার জন্য উচিত হবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ "নারীর সাথে চারটি বিষয়ের জন্য বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দীন। তুমি দীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলায় ধূসরিত হোক।" (সহিহ বুখারি: ৫০৯০, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬)
৩. একাকীত্ব ও নিভৃতে থাকা এড়িয়ে চলুন
আপনার মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার একটি কারণ হতে পারে একাকীত্ব। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَا خَلَا رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ الشَّيْطَانُ ثَالِثَهُمَا "কোনো পুরুষ যখন কোনো নারীর সাথে একান্তে থাকে, তখন শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয়।" (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫)
ব্যবহারিক পদক্ষেপ: একাডেমিক কাজে মেয়েদের সাথে একান্তে (একা একা) দেখা করা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে গ্রুপে কাজ করুন বা অন্য কাউকে সাথে রাখুন। একা একা চিন্তা করার সময় কমিয়ে দিন এবং বন্ধুদের সাথে সময় কাটান।
৪. রোজা রাখুন
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ "আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা তার জন্য (কামনা-বাসনা দমনের) ঢাল স্বরূপ।" (সহিহ বুখারি: ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)
ব্যবহারিক পদক্ষেপ: আপনি যদি বিয়ে করতে না পারেন, তাহলে সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার চেষ্টা করুন। এটি আপনার কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
৫. দোয়া ও যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন
আপনি তাহাজ্জুদ পড়ে কান্না করেছেন, এটি খুবই উত্তম। এই আমলটি চালিয়ে যান। সাথে সাথে নিম্নোক্ত দোয়াগুলো পড়ুন:
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي "হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।" (সূরা ত্বহা: ২৫-২৬)
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ "হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।" (সুনানে তিরমিজি: ২১৪০)
৬. চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার জন্য ব্যস্ততা বাড়ান
আপনি যখন চিন্তায় ডুবে থাকেন, তখন শয়তান সেই সুযোগে আপনার মনে আরও খারাপ চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়। তাই:
- কুরআন তিলাওয়াতের সাথে সম্পর্ক বাড়ান। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন পড়ার অভ্যাস করুন।
- দ্বীনি ইলম অর্জনের চেষ্টা করুন। কোনো মাদরাসা বা অনলাইন কোর্সে ভর্তি হতে পারেন।
- নিয়মিত জামাতের সাথে নামাজ পড়ুন।
- ভালো বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, যারা আপনাকে দীনের উপর থাকতে সাহায্য করবে।
৭. এই আকর্ষণকে বিয়ের মাধ্যমে বৈধ করার চিন্তা করবেন না (যদি মেয়েটি দীনদার না হয়)
আপনি নিজেই বলেছেন মেয়েটি দীনী চিন্তাধারা পোষণ করে না। তাই তার সাথে বিয়ের চিন্তা করবেন না। কারণ দীনদার স্ত্রী আপনার দীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্য কল্যাণকর। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)在其著名的著作《রদ্দুল মুহতার》中提到,দীনদার স্ত্রী নির্বাচন করা অপরিহার্য, কারণ দীনদার না হলে সংসার ধ্বংস হতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৯০)
৮. ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
মনে রাখবেন: এই পরীক্ষা আপনার জন্য একটি সুযোগ। আপনি যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে থাকেন।"
৯. প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
যদি এই সমস্যা আপনার দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা বা ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে একজন মুসলিম মনোবিদ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিতে পারেন। এটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং নিজের যত্ন নেওয়ার একটি উপায়।
১০. সর্বোপরি, তাওবার দরজা খোলা রাখুন
আপনি যদি কোনো গুনাহের কাজ করে থাকেন (যেমন: তাকানো, কথা বলা ইত্যাদি), তাহলে সাথে সাথে তাওবা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
সবশেষে: আপনার জন্য আমার দোয়া রইল। আল্লাহ আপনাকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন। আমিন।
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানিয়ে দিন।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)