গর্ভবতী অবস্থায় কাজ করানো কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবের নিকট আমার জীবনের চরম জুলুম ও সংকটের বিষয়ে হানাফি ফিকহের আলোকে সঠিক মাসআলা ও শরয়ী সমাধান জানতে চাচ্ছি। কারো গীবত করা এখানে উদ্দেশ্য নয়; আমার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঠিক মাসআলা ও ইসলামের বিচার পাওয়ার উদ্দেশ্যেই আমার ও আমার সন্তানদের সাথে হওয়া অন্যায়গুলো বিস্তারিত তুলে ধরছি:
১. গর্ভকালীন ও অসুস্থতায় জুলুম: আমার বড় ছেলে পেটে আসলে শুরুর দিকে এতোই অসুস্থ হয়ে যাই যে, শুয়ে নামাজ পড়তে হতো, কখনো বা কাযা হয়ে যেতো। বাথরুমে ধরে ধরে যাওয়া লাগতো। পানি, ঔষধ সব বমি হয়ে যেতো। আমার কোমর, মাথা সবসময় ব্যথা করতো। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারতাম না কোমরের ব্যথায়। এই অবস্থায় আমাকে দিয়ে ঘর ঝাড়ু, মোছা থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজ করাতো সংসারের বাকি দুইজন সুস্থ নারী (শাশুড়ি ও ননদ)। তারা শুধু সব তরকারি কেটে রেডি করে দিলে রান্নাটা করতো। আমার এই শারীরিক কষ্ট দেখে উনারা উপহাসও করতেন।
প্রেগন্যান্সির ৬ মাসের সময় আমাকে দিয়ে মোটা কম্বল ধুতে বাধ্য করে। ফলস্বরূপ ব্লিডিং হয়ে হাসপাতালে দৌড়াতে হয়েছে।
"ইসলামে একজন অসুস্থ গর্ভবতীর ওপর সাধ্যের বাইরে এভাবে কাজ চাপানো ও তাকে নিয়ে উপহাস করার শরয়ী বিধান কী?"
২. ননদের প্ররোচনা, জোরপূর্বক সফর ও অবহেলা: বাচ্চা নরমালে হলেও আমার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। বাচ্চা হয়ে গেলে বাচ্চার বাবাকে ওনার বোন (ননদ) আমার আড়ালে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বুঝায় যে, "বাচ্চা রেখে থাকবি কী করে? আমরাও থাকতে পারবো না বাবুকে দূরে রেখে"—এমন আরো অনেক কিছু বুঝায়। বাচ্চার বাবা প্রথমে নিতে চাননি, কিন্তু ননদ ব্রেইনওয়াশ করানোর কারণে উনি নিতে রাজি হন। ফলে আমার ও আমার বাবা-মার অনুরোধ না শুনে বাচ্চা জন্মের মাত্র ১১ দিনের মাথায় ৩০০ কি.মি. দূরের জার্নি করিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে বাচ্চার বাবা সপ্তাহে ৬ দিন মাদ্রাসায় থাকতেন (বৃহস্পতিবার রাতে আসতেন, शनिवार ফজরের আগে চলে যেতেন)। উনি বাসায় না থাকার সুযোগে বাসায় ননদ বাচ্চার পাশে থাকা সত্ত্বেও বাচ্চা প্রস্রাব করলেও চেঞ্জ করে দিতো না, আমাকেও ডাক দিতো না চেঞ্জ করার জন্য। এভাবে বাচ্চার অনেক ঠান্ডা লেগে যায় এবং পরবর্তীতে আমার বড় ছেলেটি মারা যায়। অসুস্থতা নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করে রাতে গভীর ঘুমে চলে যেতাম, এতে রাতেও বাচ্চাকে ঠিকমতো যত্ন করতে পারতাম না। বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে বাচ্চার বাবাকে যখন ডায়াপার কিনে দিতে বলি তখন বাচ্চার ছোট ফুফু বাচ্চার বাবাকে বুঝায়, " বাচ্চাকে ছোট থেকে অভাব শিখাতে হয়, তা না হলে বড় হয়ে মানুষ হয় না।"
"ক্ষতি হবে জেনেও ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে সফরে বাধ্য করা এবং বাচ্চার প্রতি এমন অবহেলা করার শরয়ী হুকুম কী?"
৩. বাচ্চার ওপর অত্যাচার ও পুত্রবধূর গায়ে হাত তোলা: আমার ননদ দুধের বাচ্চার ঠোঁটে ইচ্ছে করে ঝাল লাগিয়ে দিয়ে বাচ্চার কান্না দেখে মজা নিতো। বাচ্চাকে চোখের আড়ালে চা, বিস্কুট খাওয়াতো। ১ মাসের সময় জোর করে বাচ্চাকে চিনি, পানি দিয়ে গরুর দুধ জ্বালিয়ে খাওয়ায়। একদিন ঘর মোছার সময় বাচ্চা ঘুম থেকে উঠে খাওয়ার জন্য কান্না করলে আমি কাজ ফেলে বাচ্চাকে খাওয়াতে গেলে আমার শাশুড়ি আমার গায়ে হাত তোলেন এবং সাথে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। আমার অন্যায় ছিল—আমি ঘর মোছার ন্যাকড়া না ধুয়ে কেন বাচ্চাকে খাওয়াতে আসলাম!
"ইসলামের দৃষ্টিতে অবুঝ শিশুর সাথে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করা এবং শাশুড়ি কর্তৃক পুত্রবধূর গায়ে হাত তোলার গুনাহ বা শাস্তি কী?"
৪. ভণ্ডামি, মিথ্যাচার ও খাবারে হিংসা: আমার ননদ তার ভাইকে মার গায়ে হাত তোলার বিষয়টা জানানোর দায়িত্ব নিয়েও এই সম্পূর্ণ অন্যায়ের ঘটনা আমার স্বামীর থেকে গোপন করে। উনাদের অন্যায় ধরিয়ে দিলে ওনারা লোকদেখানো অভিনয় করে স্বামীর সামনে ও পিছনে মাফ চাইতেন, কিন্তু আবার একই কাজ করতেন।
বাচ্চার বাবা বিয়ের পর আমাকে কড়া আদেশ করেছিলেন—"আমার মা, বোনদের সম্পর্কে কোনো অভিযোগ আমার কাছে করা যাবে না। তাদের মতো এতো ভালো শাশুড়ি, ননদ কোথাও পাবে না।" এই আদেশের কারণে আমি উনাকে জানাতে পারিনি, চেষ্টা করলেও উনি শুনতে চাননি।
বাচ্চার বাবা বাসায় আসলে উনারা এমন আচরণ করতেন যেন সব স্বাভাবিক, কোনো ঘটনাই ঘটেনি এবং ওনারা আমাকে ও আমার সন্তানকে অনেক যত্ন করেন, ভালোবাসেন, সব কাজ ওনারাই করেন। অথচ ওনারা কোনোদিন ঘুম থেকে উঠে বিছানাও গোছাতো না, রুম ঝাড়ু দিতো না, খেয়ে প্লেটটাও ধুয়ে রাখতো না। সংসারে অভাব থাকায় কোনো পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে ডিম, দুধ আর মাছ মাসেও খেতে পারতাম না। বাচ্চা বুকের দুধ খেতো, ফলে শরীরে অনেক ঘাটতি পড়ে যাওয়ায় কোমর ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা ছিল অনেক বেশি। আমার স্বামী আমাকে একটু ভালো খাওয়ালে বা যত্ন করলে ননদ ও শাশুড়ি সেটাতেও তীব্র নজর ও হিংসা করতেন।
বাচ্চার দাদির কাছে বাচ্চাকে রাখার জন্য দিলে দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতো এবং বলতো—"কোলে নিয়ে বটির কাজ করো, আমি রাখতে পারবো না।" বাধ্য হয়ে ওই বাচ্চা কোলে নিয়ে রান্না, পাশে শুইয়ে কাটাকুটি, থালাবাসন ধোয়া ও বাড়িওয়ালার কাছে রেখে ছাদে কাপড় নাড়তে যাওয়া—সব করতে হয়েছে। অথচ এই মানুষগুলোই যখন বাচ্চার বাবা বাসায় আসতো, বাচ্চাকে কোল থেকে নিচে রাখতোই না। বাচ্চার বাবাকে বলতো—"বাচ্চা তো সারাদিন আমার বুকের ওপরই থাকে", আরেকজন বলতো—"বাচ্চা তো সবসময় আমার পাশে শুয়ে থাকে।"
"স্বামীর আড়ালে স্ত্রীর ওপর এমন দ্বিমুখী অভিনয়, মিথ্যাচার ও খাবারে হিংসা করার শরয়ী হুকুম কী?"
৫. অসুস্থতায় খাটানো ও ইবাদতে বাধা: বড় বাচ্চাটা মারা গেলে আমি শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবেই অনেক অসুস্থ হয়ে যাই এবং জরায়ুর ইনফেকশন ধরা পড়ে। তারপরও আমাকে রেস্ট নেওয়ার সুযোগ দেয়নি। শরীরের যন্ত্রণায় কান্না করলে ননদ রাগারাগি করতো এবং বলতো—"একটু হলে আরেকটু বেশি অভিনয় করি আমি।" একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘুমালে ঘুম থেকে রাগারাগি করে উঠাতো। পিঠা খেতে মন চাইলে আমাকে চাল বাটাতে হতো, অনুষ্ঠানের সবরকম মসলা বেটে দিতে হতো। এদের কাজের চাপে রমাদ্বনে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারতাম না।
"সন্তানহারা অসুস্থ নারীর কষ্টকে 'অভিনয়' বলে উপহাস করা, জোর করে খাটানো এবং রমাদানের ইবাদতে বাধা সৃষ্টির গুনাহ কেমন?"
৬. বিচ্ছেদের জন্য কুফরি জাদু: এর মাঝে পরিবারের একজন (আমার শাশুড়ি) আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের জাদু করে কয়েকবার করে। অথচ উনি ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, কুরআন তিলাওয়াত করে, তর্জমা তাফসির পড়ে, পর্দা করে এবং নফল রোজা রাখে। ওনার এই জাদুর কারণে আমার স্বামী তো আমাকে সহ্য করতে পারতো না। ছোট থেকে ছোট বিষয়ে মনোমালিন্য হলে সেটা অনেক বড় আকার ধারণ করতো। একবার আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য হলে উনার পরিবারের মানুষ তালাক দেওয়ার জন্য উনাকে অনেক প্রেশার দেয়। এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে যেগুলো লিখলে লেখা শুধু বড় হবে কিন্তু তাদের কর্ম ফুরাবে না।
"একজন নারী বাহ্যিক এসব ইবাদত করার পরেও যদি অন্যের সংসার ভাঙতে কুফরি জাদু করেন, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে ওনার ঈমান ও ইবাদতের হুকুম কী? ওনার এই জাদুর পাপ কি নামাজ-রোজার মাধ্যমে মাফ হবে?"
৭. ১ম সন্তানের চিকিৎসায় বাধা ও মৃত্যু (২০২৩ সাল): আমার বড় ছেলে আজ থেকে সাড়ে ৩ বছর আগে আমার স্বামীর পরিবারেরই এক সদস্যের বদনজরের শিকার হয়। আল্লাহ বাচ্চাটাকে অনেক সুদর্শন করে বানিয়ে দুনিয়াতে দিয়েছিলেন, তার সৌন্দর্যের ওপরই বদনজর লাগে। লাগার কিছুক্ষণ পর থেকেই বাচ্চাটার বমি, পাতলা পায়খানা শুরু হয়। ৩ দিন পরে পাতলা পায়খানা, বমি বন্ধ হয় কিন্তু পানিশূন্যতায় খিঁচুনি শুরু হয়। বদনজর লাগার পর একটানা ১ সপ্তাহ অসুস্থ থাকার পর আল্লাহর মেহমান হয়ে যায়। মেডিকেল চিকিৎসা করাতে চাইলে পরিবারের ওই সদস্যসহ আরো কয়েকজন বাধা দেয়। বাচ্চার বাবাকে চিকিৎসা না করানোর জন্য বুঝায়, ফলে দেরি করে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মেডিকেলের চিকিৎসা বাচ্চাটার ওপর কাজ করেনি এবং রুকইয়াহ সম্পর্কে তখন না জানার কারণে রুকইয়াহও করা হয়নি।
"সন্তান অসুস্থ হওয়ার পর এভাবে চিকিৎসায় বাধা দেওয়া এবং বাচ্চার বাবার অবহেলার উসিলায়ও সন্তানের মৃত্যু হলে, ইসলামে এর দায় কার ওপর বর্তাবে? ওই বাধা প্রদানকারীদের শরয়ী গুনাহ বা শাস্তি কী?"
৮. ২য় সন্তানের ওপর বদনজর ও মৃত্যু (২০২৬ সাল): আমার ছোট ছেলে গত মে মাসে যখন ওর বয়স ৩.৫ মাস, আবার পরিবারের ঐ একই সদস্য(বড় ফুফু) থেকে বদনজরের শিকার হয়। ভিডিও কলের মাধ্যমে তার সৌন্দর্যের ওপর বদনজর পতিত হয়। ফোন রাখার সাথে সাথেই বাচ্চাটা প্রচণ্ড বমি করে যা আগে কোনোদিন করেনি এবং অসুস্থ হয়ে যায়। পরদিন থেকে বাচ্চা স্বাভাবিক হয়ে যায়। এইবার বদনজর সম্পর্কে জানা থাকায় সেই সদস্যকে বদনজর নিয়ে বুঝালাম (তবে সরাসরি বলিনি যে তার নজর লেগেছে)। অথচ সে এটা ধরে নিয়েছে যে তার বদনজর লেগেছে। এরপর সে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে, বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ দেয়, বাচ্চাকে কোনোদিন দেখবে না বলে অঙ্গীকার করে, বাচ্চার বাবার কাছে ফোন দিয়ে আমার নামে মিথ্যা বলে বিচার চায় এবং আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। আমি ফোন দিয়ে মাফ চাওয়ায় কথা বলা শুরু করে।
বদনজরের পর থেকে বাচ্চার শরীরে প্রচণ্ড তাপ উঠতো, তবে থার্মোমিটারে সবসময় স্বাভাবিকই আসতো। আমি রুকইয়াহ ও বদনজরের গোসল দেই একটানা ৭ দিন। এরপরও ওজন বাড়ছিল ঠিকই তবে স্বাস্থ্য ভেঙে হাড় দেখা যাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে হালকা ঠান্ডা লাগে, এরপর চিকিৎসা নেওয়া শুরু করলে উন্নতি হচ্ছিল না। চিকিৎসা নেওয়ার পর থেকে ওর অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাওয়া শুরু করে। সর্বশেষ ভুল চিকিৎসার উসিলায় ছোট ছেলেটাও আল্লাহর মেহমান হয়ে যায় গত জুন মাসে কুরবানির ঈদের পরে।
বদনজরের হাদিস এবং এর প্রতিকার (ওজুর পানি দিয়ে গোসল করানো) সম্পর্কে বাচ্চার ছোট ফুফা এবং ছোট ফুফি খুব ভালো করেই জানেন। ওনারা সব জানার পরেও বড় ফুফিকে বোঝাননি। উল্টো বাচ্চার বড় ফুফির পক্ষ নিয়ে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। বড় ফুফি গালিগালাজ ও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাদের সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং অহংকারবশত বাচ্চাকে ওজুর পানি দেননি। পরবর্তীতে তীব্র ঠাণ্ডা ও ভুল চিকিৎসার উসিলায় আমার এই ছোট সন্তানটিও মারা যায়।
প্রশ্ন ১: কারো বদনজর লেগেছে বলে প্রবল ধারণা হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার যদি সুন্নাহ অনুযায়ী ওজু বা গোসলের পানি চায়, তবে যার নজর লেগেছে তার জন্য সেই পানি দেওয়া কি বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব)?
প্রশ্ন ২. বাচ্চার বড় ফুফি, ছোট ফুফা (মুফতী) এবং ছোট ফুফি—সবাই বদনজরের বিধান এবং ওজুর পানির কার্যকারিতা জানার পরেও, অহংকারবশত বাচ্চাকে ওজুর পানি না দিয়ে চিকিৎসায় এক ধরণের বাধা সৃষ্টি করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে একটি অবুঝ বাচ্চার জীবন এভাবে সংকটে রেখে ওজুর পানি দিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং সমঝোতা না করে উল্টো আক্রান্ত মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করার শরয়ী গুনাহ, হুকুম ও শাস্তি কী? ওনারা কি এই বাচ্চার মৃত্যুর পেছনে পরোক্ষভাবে দায়ী এবং আল্লাহর দরবারে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন?
৯. (যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা): এই ঘটনার পর আমি আর চুপ থাকতে পারিনি। আমি যখন উনাদেরকে উনাদের কর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করা শুরু করি, উনারা আর উত্তর দিতে পারেনি। বাচ্চার বাবার সামনে যখন সব ঘটনা পরিষ্কার হয়ে গেলো তখন উনারা সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে ১ মাস যাবত। একটুও অনুতপ্ত হয়নি নিজের কর্মের জন্য। অথচ আমার স্বামীকে তার করা অন্যায়গুলো ধরিয়ে দিলে অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা চায়। আমিও চাই না এদের সাথে আর যোগাযোগ হোক। এখন আমার ও আমার স্বামীর প্রশ্ন হলো—
"যে মানুষেরা সুযোগ পেলেই আমার ও আমাদের নিষ্পাপ বাচ্চাদের ওপর এমন চরম জুলুম করে, পরবর্তীতে ওনাদের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ ও সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন রাখা কি ইসলামের দৃষ্টিতে আমার জন্য জায়েজ হবে? এতে কি আমার কোনো গুনাহ হবে?"
আমরা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। এর একটি বিস্তারিত সমাধান দিলে আমরা মানসিকভাবে শান্তি পাবো ان شا ء الله.
جزاك الله خيرا
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা পড়ে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। আপনার উপর যা ঘটেছে তা সত্যিই অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও অন্যায়। আল্লাহ তায়ালা আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দিন এবং আপনাকে শক্তি দিন। আমিন।
আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নরূপ দেওয়া হলো:
১. গর্ভকালীন ও অসুস্থতায় জুলুম
উত্তর: ইসলামে কারো উপর ক্ষমতার অপব্যবহার করা, বিশেষ করে অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীর উপর সাধ্যের বাইরে কাজ চাপানো সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম যে তার পরিবারের সাথে উত্তম ব্যবহার করে।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
গর্ভবতী ও অসুস্থ নারীকে কাজে বাধ্য করা এবং উপহাস করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি জুলুম ও অন্যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৬:৪২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫:৩৫০)
২. ননদের প্ররোচনা, জোরপূর্বক সফর ও অবহেলা
উত্তর: নবজাতক শিশুকে ১১ দিন বয়সে ৩০০ কিমি দূরের সফরে নেওয়া এবং শিশুর যত্নে অবহেলা করা ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামে সন্তানের যত্ন ও লালন-পালন পিতামাতার উপর ফরজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (বুখারি: ৮৯৩)
শিশুর প্রতি অবহেলা ও ক্ষতি জেনেও এমন কাজে উৎসাহ দেওয়া মারাত্মক গুনাহ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২:১৮৫)
৩. শিশুর উপর অত্যাচার ও পুত্রবধূর গায়ে হাত তোলা
উত্তর: নিষ্পাপ শিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দেওয়া, ঝাল খাওয়ানো, অনুপযুক্ত খাবার খাওয়ানো—সবই ইসলামে হারাম ও নিষ্ঠুরতা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে আমাদের ছোটদের দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (তিরমিজি: ১৯২০)
শাশুড়ির পুত্রবধূর গায়ে হাত তোলা সম্পূর্ণ হারাম ও অন্যায়। ইসলামে কারো উপর শারীরিক নির্যাতন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। (রদ্দুল মুহতার, ৯:৫৬০)
৪. ভণ্ডামি, মিথ্যাচার ও খাবারে হিংসা
উত্তর: মিথ্যা বলা, দ্বিমুখী আচরণ করা এবং হিংসা করা ইসলামে কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।" (সূরা তাওবা: ১১৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানতের খিয়ানত করে।" (বুখারি: ৩৩)
হিংসা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সাবধান! হিংসা আগুন যেমন কাঠ পুড়িয়ে ফেলে, তেমনি হিংসা নেক আমল পুড়িয়ে ফেলে।" (আবু দাউদ: ৪৯০৩)
৫. অসুস্থতায় খাটানো ও ইবাদতে বাধা
উত্তর: অসুস্থ ব্যক্তিকে বিশ্রাম না দেওয়া এবং কাজে বাধ্য করা জুলুম। আর রমজানে ইবাদত থেকে বাধা দেওয়া আরও মারাত্মক গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ "যে কেউ আল্লাহর সম্মানিত বিষয়সমূহের সম্মান করে, তা তার রবের কাছে তার জন্য কল্যাণকর।" (সূরা হজ: ৩০)
অসুস্থ ব্যক্তির কষ্টকে "অভিনয়" বলে উপহাস করা অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা ও গুনাহ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২:২২০)
৬. বিচ্ছেদের জন্য কুফরি জাদু
উত্তর: জাদু করা ইসলামে কবিরা গুনাহ এবং কুফরি জাদু ঈমানের পরিপন্থী। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ "তারা কাউকে শিক্ষা দিত না যতক্ষণ না বলত, আমরা তো পরীক্ষা স্বরূপ; সুতরাং তুমি কুফরি করো না।" (সূরা বাকারা: ১০২)
যে ব্যক্তি জাদু করে এবং তা বিশ্বাস করে, সে কুফরি করে। তবে যদি কেউ জাদু করে কিন্তু তা বৈধ মনে না করে, তবে সে ফাসিক ও কবিরা গুনাহগার। তার নামাজ-রোজা কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে, তবে তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। (রদ্দুল মুহতার, ৬:২৮০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫:৩৫৫)
৭ ও ৮. বদনজর ও চিকিৎসায় বাধা
উত্তর: বদনজর সত্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"বদনজর সত্য, যদি কোনো জিনিস তাকদিরের আগে বাড়তে পারত, তবে বদনজরই বাড়ত।" (মুসলিম: ২১৮৮)
প্রশ্ন ১: যার বদনজর লেগেছে বলে প্রবল ধারণা হয়, তার জন্য ওজু বা গোসলের পানি দেওয়া **। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী বদনজর লাগানোর ব্যক্তিকে ওজু করতে বলা হয় এবং সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির উপর ঢালা হয়। (মুসলিম: ২১৮৮; আবু দাউদ: ৩৮৮০)
প্রশ্ন ২: বদনজরের পানি না দেওয়া এবং চিকিৎসায় বাধা দেওয়া মারাত্মক গুনাহ। যদি কারো অবহেলা ও বাধার কারণে শিশুর মৃত্যু হয়, তবে তারা আল্লাহর দরবারে দায়ী হবে। তবে মনে রাখতে হবে, মৃত্যু আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরে হয়। বাধা প্রদানকারীরা গুনাহগার হবে, কিন্তু মৃত্যুর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী হবে না, কারণ মৃত্যু আল্লাহর হুকুমে হয়। (ফাতাওয়া উসমানি, ২:২৫০)
৯. যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা
উত্তর: ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা সাধারণত নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি সম্পর্ক বজায় রাখা ক্ষতির কারণ হয় এবং তারা অনুতপ্ত না হয়ে জুলুম চালিয়ে যায়, তবে সীমিত যোগাযোগ বা প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ করা যেতে পারে।
তবে উত্তম হলো:
- সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন না করে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখা
- দোয়া করা যে তারা হেদায়েত পায়
- তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার চেষ্টা করা (যদিও ক্ষমা করা কঠিন)
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ "যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা করে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
তবে যদি সম্পর্ক রাখা আপনার জন্য মানসিক বা শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়, তবে দূরত্ব বজায় রাখা জায়েজ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২:৩০০)
আপনার করণীয়:
- সবর ও ধৈর্য ধারণ করুন — আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন
- দোয়া করুন — আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করুন
- স্বামীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন — তাকে সব জানান
- ক্ষমা করার চেষ্টা করুন — ক্ষমা করলে আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বাড়বে
- আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন — যদি সম্ভব হয় এবং প্রয়োজন মনে করেন
আল্লাহ তায়ালা আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দিন এবং আপনার ক্ষতিপূরণ করুন। আমিন।