হিন্দু বাড়ির শ্রাদ্ধ খাওয়া সম্পর্কে
Halal and Haram · Hanafi
Question
হিন্দু বাড়ির শ্রাদ্ধ কি খাওয়া যাবে।
দই মুড়ি চিড়া মাছ ডাল এগুলো
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—হিন্দু বাড়ির শ্রাদ্ধের (শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের) খাবার খাওয়া জায়েয নয়। এটি হারাম বা নাজায়েয হওয়ার মূল কারণ হলো, শ্রাদ্ধ একটি শিরকী ও কুফরী আনুষ্ঠানিকতা, যা মৃত ব্যক্তির আত্মার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান ও পূজা-অর্চনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, কোনো মুসলমানের জন্য এমন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা বা তার খাবার গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. কুরআনুল কারিমের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ إِنَّكُمْ إِذًا مِّثْلُهُمْ "আর তিনি তোমাদের প্রতি কিতাবে নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে যে, আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনায় মগ্ন হয়। নিশ্চয়ই (তখন) তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে।" (সূরা আন-নিসা: ১৪০)
শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানটি শিরক ও কুফরীর একটি প্রকাশ্য রূপ। তাই সেখানে উপস্থিত থাকা এবং খাবার গ্রহণ করা এই আয়াতের আওতায় পড়ে।
২. হাদীসের দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَجْلِسْ عَلَى مَائِدَةٍ يُدَارُ عَلَيْهَا الْخَمْرُ "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন এমন টেবিলে না বসে যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৭৭৪, মুসনাদে আহমাদ: ১৪৩৯৮)
যদি মদ পরিবেশন করা টেবিলে বসা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে যে টেবিলে শিরকী অনুষ্ঠানের (শ্রাদ্ধের) খাবার পরিবেশন করা হয়, সেখানে বসা ও খাওয়া তো আরও বড় গুনাহের কাজ। কারণ শিরক হলো সবচেয়ে বড় পাপ।
৩. হানাফী ফিকহের নির্দেশনা:
(ক) ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী)-তে উল্লেখ আছে:
وَإِنْ أَهْدَى الْمُشْرِكُ لِلْمُسْلِمِ شَيْئًا مِنْ لَحْمِ مَا ذُبِحَ لِعِيدِهِ أَوْ لِنُصُبِهِ لَا يَأْكُلُهُ "যদি কোনো মুশরিক (অংশীবাদী) তার উৎসব বা পূজার জন্য যবেহকৃত গোশত মুসলমানকে হাদিয়া দেয়, তবে তা খাওয়া জায়েয নয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৩৪)
শ্রাদ্ধের খাবারও এই বিধানের আওতাভুক্ত। কারণ শ্রাদ্ধ হলো হিন্দুদের একটি ধর্মীয় পূজা-অনুষ্ঠান, যা মৃতের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।
(খ) রদ্দুল মুহতার (আল-দুররুল মুখতার)-এ বলা হয়েছে:
وَلَوْ أَهْدَى إلَيْهِ مِنْ لَحْمِ أُضْحِيَتِهِ أَوْ عَقِيقَتِهِ أَوْ نَذْرِهِ لَا يَأْكُلُهُ إنْ عَلِمَهُ "যদি কেউ তার কুরবানী, আকিকা বা মান্নতের গোশত (মুসলমানকে) হাদিয়া দেয়, তবে সে যদি জানতে পারে (যে এটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গোশত), তাহলে তা খাবে না।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪৫৫)
এখানে মূলনীতি হলো—যে খাবার কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা পূজার জন্য নিবেদিত করা হয়, তা মুসলমানের জন্য খাওয়া জায়েয নয়। শ্রাদ্ধের খাবারও সম্পূর্ণভাবে এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
(গ) ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মুফতি রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-এর মত: তিনি বলেন, হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানের (যেমন: শ্রাদ্ধ, পূজা) খাবার খাওয়া জায়েয নয়। কারণ এগুলো শিরকী অনুষ্ঠান এবং সেখানে অংশগ্রহণ করা গুনাহের কাজ। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৩৫)
৪. মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.-এর মত: তিনি তার ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তৈরি খাবার—তা সে দই-মুড়ি-চিড়াই হোক বা মাছ-ডাল—সবই খাওয়া নাজায়েয। কারণ এগুলো তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী তৈরি ও নিবেদন করা হয়। (আপ কে মাসায়িল আওর উনকা হল, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১২৮)
৫. মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম-এর মত: তিনি বলেন, হিন্দুদের শ্রাদ্ধ বা পূজার খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম। এমনকি যদি খাবারটি সাধারণ হয় (যেমন: দই, মুড়ি, চিড়া, মাছ, ডাল), তবুও তা খাওয়া জায়েয নয়, কারণ এটি শিরকী অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত। (ফিকহী মাকালাত, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৮৫)
আপনার উল্লেখিত খাবারগুলো (দই, মুড়ি, চিড়া, মাছ, ডাল) সম্পর্কে: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, সেখানে দই-মুড়ি-চিড়া, মাছ, ডাল এসব খাবার থাকে। এগুলো সাধারণভাবে হালাল খাবার হলেও, শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে পরিবেশন করার কারণে সেগুলো খাওয়া নাজায়েয। কারণ:
১. এটি শিরকী অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত। ২. এটি মৃত ব্যক্তির আত্মার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। ৩. সেখানে অংশগ্রহণ করা ইসলামী আকীদার পরিপন্থী।
সতর্কতা ও উপদেশ:
- কোনো মুসলমানের জন্য হিন্দুদের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে যাওয়া, সেখানে উপস্থিত থাকা বা খাবার গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও গুনাহের কাজ।
- যদি কোনো কারণে আপনাকে দাওয়াত দেওয়া হয়, তবে ভদ্রভাবে অস্বীকার করা উচিত এবং কারণ ব্যাখ্যা করা উচিত যে, ইসলামী আকীদা অনুযায়ী এটি আমাদের জন্য জায়েয নয়।
- তবে যদি কেউ জেনে না থাকার কারণে খেয়ে ফেলে, তাহলে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ থেকে বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।