বাধ্য হয়ে সুদ গ্রহনের ক্ষেত্রে করনীয়
Halal and Haram · Hanafi
Question
এখন আমরা পুরোপুরি ব্যাংকের টাকায় চলি।
ব্যাংকে যা টাকা আছে সব আমার মায়ের উপার্জিত টাকা। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমার মা আমার নামে একাধিক সঞ্চয়পত্র কিনে এবং আমার নামে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করে। উনি যখন দরকার হয় তখন চেক বইয়ে আমার সাইন নিয়ে টাকা তুলে। আমার জানামতে এই সুদের টাকা হারাম। আর হারাম গ্রহনকারীর কোনো ইবাদত কবুল হয় না। আবার আমার জানামতে কেউ যদি বাধ্য হয় তাহলে আর জন্য জীবনধারনের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু গ্রহন করা জায়েজ। উদাহরণসরূপ আমাকে সন্ধ্যায় এক কাপ দুধ (সারাদিনে আরো অনেক জিনিস থাকে বিভিন্ন ফলমূল, বাদাম ইত্যাদি ) খেতে দেয় এখন এটার তো আমার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই, আমি এটা বলতেও পারব না যে আমি খাব না। এইক্ষেত্রে আমি কি আমাকে দেওয়া দুধ টুকু ফেলে দিব?
আমি বর্তমানে চাকিরর চেষ্টা করছি।
যতদিন না চাকরি হয় আমাকে আমার মায়ের সাথে থাকতে হবে এক্ষেত্রে আমার করনীয় কি?
আর
ব্যাংকে রাখা কোনো টাকাই আমার নয়। আমি আমাকে মাকে বলিও নি আমার নামে কোনো টাকা রাখতে। আমি বারবার বলেছি আমার কোনো টাকার দরকার নেই। আমার নামে যাতে কিছু না রাখে। কিন্তু যেহেতু আমি একমাত্র সন্তান তাই সব টাকা আমার নামে রেখেছেন। এখন উনি যেহেতু আমার নামে টাকা রেখেছেন এবং আমার থেকে চেক বইয়ে সাইন নিয়ে টাকা তুলে এক্ষেত্রে আমি কি গুনাহগার হবো?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আপনি সত্যের পথে এসেছেন। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি সুদ (রিবা) সম্পর্কে সচেতন এবং হারাম থেকে বাঁচতে চান—এটি আপনার ঈমানের আলামত। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
আপনার প্রশ্নের উত্তর কয়েকটি ধাপে দেওয়া হলো:
১. সুদ (রিবা) গ্রহণের বিধান:
আপনি সঠিকই জানেন যে, সুদ (ব্যাংকের সুদ) গ্রহণ করা হারাম। কুরআন ও হাদিসে এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন দাঁড়াবে না, যেভাবে দাঁড়ায় সেই ব্যক্তি, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
তবে জরুরত (প্রয়োজন) এবং ইযতিরার (অনন্যোপায় অবস্থা) এর ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু শিথিলতা আছে। যদি কোনো ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য কোনো হালাল উপায় না পায় এবং ক্ষুধায় মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে, তাহলে শুধুমাত্র প্রয়োজন পরিমাণ গ্রহণ করা জায়েজ হবে, তবে তা গুনাহ থেকে খালাস পাওয়ার জন্য নয়, বরং জীবন বাঁচানোর জন্য।
তবে আপনার ক্ষেত্রে: আপনি বলেছেন যে, আপনার মা আপনাকে খাওয়ান, থাকার ব্যবস্থা করেন, এবং বাড়িতে পর্যাপ্ত খাবার থাকে (দুধ, ফলমূল, বাদাম ইত্যাদি)। এটি ইযতিরার (অনন্যোপায় অবস্থা) নয়। কারণ আপনার জীবিকা নির্বাহের জন্য হালাল উপায়ে (যেমন: চাকরি, অন্য কোনো বৈধ উপায়) আপনি চেষ্টা করছেন। তাই আপনি যদি সুদের টাকায় কেনা জিনিস খান, তবে তা জায়েজ হবে না, যদি না আপনি সত্যিই অনন্যোপায় হয়ে পড়েন (যেমন: ক্ষুধায় মৃত্যুর আশঙ্কা)।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি যদি আপনার মায়ের সাথে থাকেন এবং তিনি আপনাকে খাওয়ান, কিন্তু সেই খাবার সুদের টাকায় কেনা, তাহলে আপনি কি করবেন?
- যদি আপনি জানেন যে, সেই খাবার সুদের টাকায় কেনা, তাহলে আপনার জন্য তা খাওয়া জায়েজ নয়, যদি না আপনি অনন্যোপায় হয়ে পড়েন। আপনি চেষ্টা করুন যত দ্রুত সম্ভব চাকরি খুঁজে বের করার এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।
- যদি আপনি না জানেন যে, সেই খাবার সুদের টাকায় কেনা, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ। কারণ ইসলামে "যা সামনে উপস্থিত" তা খাওয়ার অনুমতি আছে, যদি না নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে তা হারাম।
আপনার প্রশ্নের উত্তর: আপনি যদি নিশ্চিতভাবে জানেন যে, আপনার মা সুদের টাকায় সেই দুধ বা খাবার কিনেছেন, তাহলে আপনার জন্য তা খাওয়া জায়েজ নয় (যতক্ষণ না আপনি অনন্যোপায়)। তবে আপনি যদি না জানেন, তাহলে খেতে পারেন। দুধ ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং আপনি যদি না খান, তাহলে তা ফেলে দেওয়ার চেয়ে অন্য কাউকে দিয়ে দিন (যেমন: গরিব, পশু-পাখি) অথবা আপনার মাকে বলুন যে, আপনি ওই সময় খাবেন না।
২. আপনার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সঞ্চয়পত্র:
আপনি বলেছেন যে, আপনার মা আপনার নামে সঞ্চয়পত্র কিনেছেন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, কিন্তু আপনি চাননি। আপনি বারবার বলেছেন যে, আপনার নামে কিছু রাখতে। এখন তিনি আপনার সাইন নিয়ে টাকা তোলেন।
এক্ষেত্রে আপনার করণীয়:
- আপনি যদি সাইন না করেন, তাহলে তিনি টাকা তুলতে পারবেন না। তাই আপনি যদি সাইন করেন, তাহলে আপনি সেই লেনদেনে অংশ নিচ্ছেন। এটি আপনার জন্য গুনাহের কারণ হবে, কারণ আপনি সুদী লেনদেনে সহযোগিতা করছেন।
- আপনার কর্তব্য: আপনি আপনার মাকে স্পষ্টভাবে বলুন যে, আপনি সুদী লেনদেনে অংশ নিতে চান না এবং আপনার নামে কোনো সুদী অ্যাকাউন্ট বা সঞ্চয়পত্র রাখা জায়েজ নয়। আপনি তাকে অনুরোধ করুন, তিনি যেন আপনার নাম থেকে টাকা তুলে নিজের নামে রাখেন অথবা কোনো হালাল উপায়ে (যেমন: ইসলামী ব্যাংক, শরিয়াহ সম্মত সঞ্চয়) রাখেন।
- আপনি যদি সাইন না করেন এবং তিনি জোর করে আপনার নামে টাকা রাখেন, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন না। কারণ আপনি বাধ্য হয়েছেন এবং আপনি এর বিরোধিতা করেছেন। তবে আপনি যদি সাইন করেন, তাহলে আপনি দায়ী হবেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো হারাম কাজে সহযোগিতা করে, সে তার অংশীদার।" (সূত্র: মুসলিম)
৩. আপনার করণীয়:
১. চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যান: আপনি ইতিমধ্যে চাকরির চেষ্টা করছেন, এটি খুবই ভালো। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং দোয়া করুন। চাকরি পাওয়ার পর আপনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন এবং হারাম থেকে বাঁচতে পারবেন।
২. মাকে বোঝান: আপনার মা হয়তো ভালোবাসা থেকে আপনার নামে টাকা রেখেছেন, কিন্তু আপনি তাকে ইসলামের দৃষ্টিতে সুদের গুরুত্ব বোঝান। তাকে বলুন যে, সুদ হারাম এবং এটি আল্লাহর ক্রোধের কারণ। আপনি তাকে অনুরোধ করুন, তিনি যেন আপনার নামে কোনো সুদী লেনদেন না করেন।
৩. সাইন না করা: যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার নামে সেই অ্যাকাউন্ট বা সঞ্চয়পত্র আছে, ততক্ষণ আপনি সাইন করবেন না। যদি তিনি জোর করেন, তাহলে আপনি বলুন যে, এটি হারাম এবং আমি এতে অংশ নিতে পারি না।
৪. ইবাদত কবুলের বিষয়ে: আপনি যে ভয় পাচ্ছেন যে, হারাম গ্রহণ করলে ইবাদত কবুল হয় না—এটি সঠিক। তবে আপনি যদি হারাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন এবং তওবা করেন, তাহলে আল্লাহ আপনার ইবাদত কবুল করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।
৪. দুধ ফেলে দেওয়ার বিষয়ে:
আপনি যদি নিশ্চিত হন যে, সেই দুধ সুদের টাকায় কেনা, তাহলে আপনি তা খাবেন না। তবে ফেলে দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি অপচয়। আপনি তা অন্য কাউকে দিতে পারেন (যেমন: গরিব, পশু-পাখি) অথবা আপনার মাকে বলুন যে, আপনি ওই সময় খাবেন না। তবে মনে রাখবেন, আপনি যদি অনন্যোপায় না হন, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ নয়।
৫. আপনার মায়ের সাথে থাকা:
যতদিন চাকরি না হয়, ততদিন আপনার মায়ের সাথে থাকা জায়েজ। তবে আপনি চেষ্টা করুন, যত দ্রুত সম্ভব স্বাবলম্বী হওয়ার। আপনি যদি হালাল উপায়ে খাবার পেতে পারেন, তাহলে তা খান। যদি না পারেন, তাহলে আপনি অনন্যোপায় অবস্থায় পড়লে প্রয়োজন পরিমাণ গ্রহণ করতে পারবেন, তবে তা গুনাহ থেকে খালাস পাওয়ার জন্য নয়, বরং জীবন বাঁচানোর জন্য।
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. দুধ ফেলে দেওয়া: না, ফেলে দেবেন না। যদি নিশ্চিত হন যে, তা সুদের টাকায় কেনা, তাহলে খাবেন না; অন্য কাউকে দিন। যদি না জানেন, তাহলে খেতে পারেন।
২. সাইন দেওয়া: আপনি যদি সাইন না করেন, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন না। তবে আপনি যদি সাইন করেন, তাহলে আপনি সুদী লেনদেনে সহযোগিতা করছেন, যা গুনাহ। তাই সাইন না করাই উত্তম।
৩. মায়ের সাথে থাকা: যতদিন চাকরি না হয়, ততদিন থাকা জায়েজ। তবে চেষ্টা করুন স্বাবলম্বী হওয়ার এবং হারাম থেকে বাঁচার।
৪. ইবাদত কবুল: আপনি যদি হারাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন এবং তওবা করেন, তাহলে আল্লাহ আপনার ইবাদত কবুল করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনার চাকরি ও হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯ (সুদের নিষেধাজ্ঞা)
- সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮ (সুদী লেনদেনে সহযোগিতা নিষেধ)
- রদ্দুল মুহতার: ৪/১৮৭ (ইযতিরারের শর্ত)
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৩৫ (সুদী ব্যাংকের টাকা ব্যবহারের বিধান)
- বেহেশতি জেওর: ২/৩০ (সুদ ও হারামের বিধান)