তালাক নিয়ে দ্বিধা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আরেকবার ওয়াইফ হাজবেন্ডের থেকে তালাক চাইলে হাজবেন্ড বলে সে দিবেনা ওয়াইফ চাইলে দিতে পারে তখন ওয়াইফ বলে দিলাম।
এর কিছুদিন পর ওয়াইফ হাজবেন্ডকে কয়েকটি শর্ত দেয় যেগুলা না মানলে সে হাজবেন্ডের থেকে তালাকের অনুমতি পাবে।(এক্ষেত্রে সবগুলা শর্ত না মানলে কি ওয়াইফ তালাকের অনুমতি পাবে নাকি ১টা ২টা না মানলেও পেয়ে যাবে?)হাজবেন্ডকে স্টাম্প পেপারে শর্ত লিখতে বলে হাজবেন্ড লিখে সাইন করে যদিও ওয়াইফ সাইন করেনি। পরবর্তীতে ওয়াইফ তালাক দিতে চাইলে হাজবেন্ড বলে ওয়াইফ দিতে পারবেনা বা দিলেও হবেনা,কারন ওয়াইফের সাইন নেই।
হাজবেন্ড তালাক দিতে বাধা দেয় এবং বলে দিলেও সে মানবেনা।একসময় স্ত্রী তালাক নিয়ে নেয়(উল্লেখ্য স্বামী তালাকের অনুমতি ফিরিয়ে নিলাম এই কথা সরাসরি বলছে কি না কারো স্পষ্ট মনে নেই,সন্দেহ হচ্ছে বলছিলো)
এখন তালাক কি হয়ে গেছে?হলেও কি আবার বিয়ে করা যাবে?হাজবেন্ড যদি তালাক না মানে এক্ষেত্রে করনীয় কি?
Answer
তালাক নিয়ে দ্বিধা — বিস্তারিত ফতোয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারিণী একজন স্ত্রী (ওয়াইফ) যিনি তার স্বামীর (হাজবেন্ড) সাথে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। মূল ঘটনাগুলো হলো:
- ঝগড়ার সময় স্ত্রী তালাকের নিয়তে সরে যেতে চাইলে স্বামী বলেছিলেন "ঠিক আছে" — কিন্তু তালাকের নিয়তে নয়।
- স্ত্রী তালাক চাইলে স্বামী বলেছিলেন "আমি দেব না, তুমি চাইলে দিতে পারো" — তখন স্ত্রী বলেছিলেন "দিলাম"।
- স্ত্রী কিছু শর্ত দেন, যা না মানলে তিনি তালাকের অনুমতি পাবেন। স্বামী স্ট্যাম্প পেপারে শর্তগুলো লিখে সাইন করেন, কিন্তু স্ত্রী সাইন করেননি।
- পরে স্ত্রী তালাক নিতে চাইলে স্বামী বাধা দেন এবং বলেন স্ত্রীর সাইন নেই বলে তা বৈধ হবে না।
- একসময় স্ত্রী তালাক নিয়ে নেন। স্বামী "অনুমতি ফিরিয়ে নিলাম" বলেছিলেন কি না — তা স্পষ্ট নয়, সন্দেহ আছে।
মূল প্রশ্নসমূহ
- তালাক কি হয়ে গেছে?
- হয়ে থাকলে আবার বিয়ে করা যাবে কি?
- স্বামী যদি তালাক না মানে, তাহলে করণীয় কী?
উত্তর
প্রথম ঘটনা: "ঠিক আছে" বলা
ঝগড়ার সময় স্ত্রী তালাকের নিয়তে সরে যেতে চাইলে স্বামী "ঠিক আছে" বলেছেন — কিন্তু তালাকের নিয়তে নয়।
হানাফি ফিকহের নিয়ম: তালাকের জন্য স্পষ্ট শব্দ (صريح) বা কিনায়া (کنایہ) শব্দ ব্যবহার করতে হয়। "ঠিক আছে" বলা কোনো তালাকের শব্দ নয়। এমনকি কিনায়া শব্দ হিসেবেও গণ্য নয়। কিনায়া শব্দে তালাক দিলে নিয়তের প্রয়োজন হয়, আর এখানে স্বামীর তালাকের নিয়ত ছিল না। তাই এই ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি।
দ্বিতীয় ঘটনা: "দিলাম" বলা
স্ত্রী তালাক চাইলে স্বামী বলেন "আমি দেব না, তুমি চাইলে দিতে পারো" — তখন স্ত্রী বলেন "দিলাম"।
গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ: স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। তালাক দেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র স্বামীর। স্ত্রী শুধুমাত্র খুলা (خلع) বা মুবারাত (مبارات) এর মাধ্যমে তালাক নিতে পারে, তবে তা স্বামীর সম্মতিতে। এখানে স্বামী "তুমি চাইলে দিতে পারো" বলেছেন — এটি কি তালাকের ক্ষমতা দান (تفویض طلاق)?
হানাফি ফিকহে, স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দেন (তাফবিজ), তবে স্ত্রী তা প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু এখানে স্বামীর উক্তিটি "তুমি চাইলে দিতে পারো" — এটি একটি সাধারণ কথোপকথন, তালাকের ক্ষমতা দানের স্পষ্ট ইন্তেখাব নয়। তাছাড়া স্ত্রী "দিলাম" বলেছেন — কিন্তু তিনি কি বলেছেন "আমি তালাক দিলাম"? নাকি অন্য কিছু? প্রশ্নে স্পষ্ট নয়।
হানাফি ফিকহের নিয়ম: স্ত্রী যদি বলে "আমি নিজেকে তালাক দিলাম" (طلاق دیا) এবং স্বামী তাকে এ ক্ষমতা দিয়ে থাকেন, তবে একটি তালাকে বায়িন (طلاق بائن) পতিত হবে। কিন্তু এখানে স্বামীর "তুমি চাইলে দিতে পারো" বলা কি তালাকের ক্ষমতা দান? — এটি সন্দেহজনক। সাধারণত এ ধরনের কথায় তালাকের ক্ষমতা দান প্রমাণিত হয় না।
রদ্দুল মুহতার এ উল্লেখ আছে:
"إذا قال الزوج لزوجته: طلقي نفسك، فطلقت نفسها، وقع الطلاق" "যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে: তুমি নিজেকে তালাক দাও, অতঃপর স্ত্রী নিজেকে তালাক দেয়, তবে তালাক পতিত হবে।"
কিন্তু এখানে স্বামী বলেননি "তুমি নিজেকে তালাক দাও" — বরং বলেছেন "তুমি চাইলে দিতে পারো" — যা একটি অনুমতিসূচক বাক্য, আদেশ নয়। তাই এ ঘটনায় তালাক পতিত হওয়া সন্দেহপূর্ণ।
তৃতীয় ঘটনা: শর্তযুক্ত অনুমতি
স্ত্রী কিছু শর্ত দেন, যা না মানলে তিনি তালাকের অনুমতি পাবেন। স্বামী স্ট্যাম্প পেপারে শর্তগুলো লিখে সাইন করেন, কিন্তু স্ত্রী সাইন করেননি।
বিশ্লেষণ: এটি একটি চুক্তির মতো। স্ত্রী সাইন না করায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হিসেবে গণ্য নয়। তবে স্বামী লিখে সাইন করেছেন — এটি তার পক্ষ থেকে একটি অঙ্গীকার। কিন্তু ইসলামি ফিকহে তালাকের ক্ষেত্রে এ ধরনের লিখিত অঙ্গীকার কি তালাক পতিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট?
হানাফি ফিকহের নিয়ম: তালাকের জন্য স্বামীর স্পষ্ট ইজাব (প্রস্তাব) প্রয়োজন। স্ত্রীর শর্ত না মানলে তালাক পতিত হবে — এ ধরনের শর্তযুক্ত তালাক (تعلیق الطلاق) বৈধ। কিন্তু এখানে শর্তগুলো কী ছিল এবং সেগুলো মানা হয়নি কি না — তা স্পষ্ট নয়। তাছাড়া স্ত্রী সাইন করেননি — কিন্তু তালাকের জন্য স্ত্রীর সাইন বা সম্মতির প্রয়োজন নেই। তালাক স্বামীর ইচ্ছায় পতিত হয়।
তবে প্রশ্নে উল্লেখ আছে যে, স্বামী শর্তগুলো লিখে সাইন করেছেন — এটি তার পক্ষ থেকে একটি অঙ্গীকারপত্র। যদি শর্তগুলো মানা না হয়, তবে কি তালাক পতিত হবে? — এটি নির্ভর করে শর্তগুলোর প্রকৃতির উপর এবং স্বামীর নিয়তের উপর।
চতুর্থ ঘটনা: স্ত্রী তালাক নেওয়া
স্ত্রী তালাক নিয়ে নেন। স্বামী "অনুমতি ফিরিয়ে নিলাম" বলেছিলেন কি না — তা স্পষ্ট নয়, সন্দেহ আছে।
মূল কথা: স্ত্রী নিজে থেকে তালাক নিতে পারে না। তালাক নেওয়ার জন্য স্বামীর সম্মতি বা আদালতের ডিক্রি প্রয়োজন। যদি স্বামী তালাক দিতে রাজি না হন, তবে স্ত্রী খুলার (خلع) জন্য আদালতে যেতে পারেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
১. তালাক কি হয়েছে?
উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে বলা যায়:
- প্রথম ঘটনায় ("ঠিক আছে") — কোনো তালাক হয়নি।
- দ্বিতীয় ঘটনায় ("দিলাম") — এটি সন্দেহপূর্ণ। স্ত্রীর নিজ থেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা নেই। স্বামী "তুমি চাইলে দিতে পারো" বলেছেন — এটি তালাকের ক্ষমতা দান (তাফবিজ) হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সাধারণত এ ধরনের কথায় তালাক পতিত হয় না।
- তৃতীয় ঘটনায় (শর্তযুক্ত অনুমতি) — শর্তগুলো মানা না হলে তালাক পতিত হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে শর্তগুলোর প্রকৃতির উপর। তবে স্ত্রী সাইন না করায় এটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি নয়।
- চতুর্থ ঘটনায় (স্ত্রী তালাক নেওয়া) — স্ত্রী নিজ থেকে তালাক নেওয়ার কোনো বৈধ পদ্ধতি নেই। স্বামীর সম্মতি ছাড়া স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক পতিত হয় না।
সুতরাং, উপরোক্ত ঘটনাগুলোতে তালাক পতিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়। তবে যেহেতু প্রশ্নকারিণী বলেছেন "একসময় স্ত্রী তালাক নিয়ে নেয়" — এটি কীভাবে নিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। যদি তিনি আদালতের মাধ্যমে খুলা নিয়ে থাকেন, তবে সেটি ভিন্ন বিষয়।
২. আবার বিয়ে করা যাবে কি?
যেহেতু তালাক পতিত হওয়া স্পষ্ট নয়, তাই বিবাহ এখনও বহাল থাকতে পারে। তবে যদি কোনোভাবে তালাক পতিত হয়ে থাকে, তাহলে:
- যদি ১টি তালাকে বায়িন (طلاق بائن) পতিত হয় — তবে নতুন করে নিকাহ করতে হবে (ইদ্দতের পর)।
- যদি ৩টি তালাক পতিত হয় — তবে হালালা ছাড়া পুনরায় বিয়ে বৈধ নয়।
৩. স্বামী তালাক না মানলে করণীয়:
যদি স্ত্রী সত্যিই তালাক নিতে চান এবং স্বামী রাজি না হন, তাহলে:
- স্ত্রী খুলার (خلع) জন্য স্থানীয় ইসলামি আদালতে বা সালিশি কমিটিতে যেতে পারেন।
- আদালত যদি খুলার অনুমতি দেয়, তবে তালাক পতিত হবে।
- স্বামীর সাথে সালিশ বা মধ্যস্থতার চেষ্টা করা যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ নসওয়াস (প্রমাণ)
কুরআন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا "যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা কর, তবে তার পরিবার থেকে একজন সালিস এবং তার পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
হাদিস:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَائِضٌ فَذَكَرَ ذَلِكَ عُمَرُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا "আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) তার স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় তালাক দেন। উমর (রা.) নবী (সা.)-কে এ কথা জানালে তিনি বললেন: তাকে বলো, সে যেন তাকে ফিরিয়ে নেয়।" (সহিহ বুখারি: ৫২৫২)
হানাফি ফিকহের উসূল:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, তালাকের জন্য স্বামীর স্পষ্ট ইজাব (প্রস্তাব) অপরিহার্য। স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই, যতক্ষণ না স্বামী তাকে এ ক্ষমতা দেন (তাফবিজ)।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):
"لا يقع طلاق المرأة بنفسها ما لم يفوض إليها الزوج" "স্ত্রীর নিজ থেকে তালাক পতিত হয় না, যতক্ষণ না স্বামী তাকে ক্ষমতা দেন।"
ফতোয়ায়ে শামি:
"إذا قالت المرأة: طلقت نفسي، ولم يكن الزوج فوض إليها، لا يقع الطلاق" "যদি স্ত্রী বলে: আমি নিজেকে তালাক দিলাম, অথচ স্বামী তাকে ক্ষমতা দেননি, তবে তালাক পতিত হবে না।"
ব্যবহারিক নির্দেশনা
১. তালাক পতিত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত নন — তাই বিবাহ এখনও বহাল আছে বলে গণ্য হবে।
২. স্ত্রী যদি সত্যিই তালাক নিতে চান — তাহলে স্থানীয় ইসলামি আদালতে বা মসজিদের ইমামের মাধ্যমে খুলার (خلع) আবেদন করুন।
৩. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মধ্যস্থতা — পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে সালিশের চেষ্টা করুন।
৪. আদালতের রায় — আদালত যদি খুলার অনুমতি দেয়, তবে তালাক পতিত হবে এবং ইদ্দত পালনের পর পুনরায় বিয়ে করা যাবে।
৫. তালাকের নিয়ত না থাকলে — তালাক পতিত হয় না। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় মুফতির সাথে পরামর্শ করুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্ন ১: তালাক কি হয়ে গেছে? উপরোক্ত ঘটনাগুলোতে তালাক পতিত হওয়া স্পষ্ট নয়। স্ত্রীর নিজ থেকে তালাক নেওয়ার কোনো বৈধ পদ্ধতি নেই। স্বামী "তুমি চাইলে দিতে পারো" বলা তালাকের ক্ষমতা দান হিসেবে গণ্য নয়। তাই তালাক পতিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
প্রশ্ন ২: হয়ে থাকলে আবার বিয়ে করা যাবে কি? যদি কোনোভাবে তালাক পতিত হয়ে থাকে (যেমন আদালতের মাধ্যমে খুলা), তবে ইদ্দত পালনের পর নতুন নিকাহ করা যাবে। তবে ৩ তালাক হলে হালালা ছাড়া নয়।
প্রশ্ন ৩: স্বামী তালাক না মানলে করণীয়? স্ত্রী খুলার জন্য আদালতে যেতে পারেন। আদালতের রায় অনুযায়ী তালাক পতিত হবে। তবে স্বামীর সাথে সালিশের চেষ্টা করা উত্তম।
সতর্কতা: এই ফতোয়া সাধারণ নিয়মের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করা অত্যন্ত জরুরি।