হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের ইনকাম হালাল কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হচ্ছে
১. একজন পুরুষ হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার যদি নারী পুরুষ উভয়ই রোগীর চিকিৎসা করে তব তার ইনকাম হালাল হবে কি?
২. কোনো এক ব্যক্তি তার কিছু সম্পদ ওয়াকফ আলাল আওলাদ হিসেবে এই শর্তে ওয়াকফ করে যে তার বংশধরদের কেউ সদাকাহ খাওয়ার উপযুক্ত হলে তারা তা গ্রহণ করবে । তার বংশধরদের কারো অবস্থা এমন হয় যে তার বাবার দিকের কোনো সম্পদ পায়নি তার বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং সে অনেক কষ্ট করে একটা ব্যবসা শুরু করে সচ্ছল হয় তাহলে তার কি ঐ ওয়াকফ কৃত সম্পদ গ্রহণ করা জায়েয হবে?
৩. কারো ইনকাম হারাম হলে তার বাসায় বেড়াতে যাওয়া যাবে কি? বা তার বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়া অথবা তার থেকে কোনো উপহার গ্রহণ করা যাবে কি?
৪. সরকারি চাকরির অবসরের পর যে পেনশন টাকা দেয় তা কি হালাল?
৫. সহশিক্ষা বিদ্যমান এমন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করা যাবে কি না ? করলে ইনকাম হালাল হবে কি না ছেলেদের ক্ষেত্রে
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন ১:
পুরুষ হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার যদি নারী-পুরুষ উভয়ের চিকিৎসা করেন, তবে তার ইনকাম হালাল হবে কি?
উত্তর:
ইসলামী শরীয়তে চিকিৎসা একটি বৈধ পেশা। তবে নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান মেনে চলা আবশ্যক। যদি ডাক্তার পর্দার নিয়ম মেনে (যেমন: প্রয়োজনে নারী রোগীকে দেখা, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টি বা স্পর্শ থেকে বিরত থাকা) চিকিৎসা করেন, তবে তার ইনকাম হালাল হবে। কিন্তু যদি তিনি পর্দা লঙ্ঘন করেন (যেমন: অপ্রয়োজনীয়ভাবে নারী রোগীকে স্পর্শ করা বা দেখা), তবে তা গুনাহের কাজ হবে।
দলিল:
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"বলুন, নারী-পুরুষের দৃষ্টি অবনত রাখা এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করা।" (সূরা আন-নূর: ৩০-৩১)
- হাদীসে এসেছে:
"তোমাদের কারো মাথায় লোহার সুচ বিদ্ধ করা তার জন্য উত্তম, তার চেয়ে যে নারীকে স্পর্শ করে যার সাথে তার বৈধ সম্পর্ক নেই।" (মু'জামুল কাবীর, তাবরানী; সহীহ আল-জামি' ৫০৪৫)
সারসংক্ষেপ:
যদি ডাক্তার পর্দার বিধান মেনে চিকিৎসা করেন, তবে ইনকাম হালাল। কিন্তু পর্দা লঙ্ঘন করলে তা গুনাহ হবে।
প্রশ্ন ২:
ওয়াকফ আলাল আওলাদ (সন্তানদের জন্য ওয়াকফ) এর শর্তে কেউ সম্পদ ওয়াকফ করলে, তার বংশধরদের মধ্যে কেউ যদি সচ্ছল হয়, তবে সে ঐ সম্পদ গ্রহণ করতে পারবে কি?
উত্তর:
ওয়াকফ আলাল আওলাদ একটি বৈধ ওয়াকফ। যদি ওয়াকফকারী শর্ত করে যে, বংশধরদের মধ্যে যারা সদাকাহ খাওয়ার উপযুক্ত (অর্থাৎ গরিব) তারা গ্রহণ করবে, তবে সচ্ছল ব্যক্তি ঐ সম্পদ গ্রহণ করতে পারবে না। কিন্তু যদি সে আগে গরিব ছিল এবং পরে সচ্ছল হয়, তবে সে ঐ সম্পদ থেকে আর গ্রহণ করতে পারবে না, কারণ ওয়াকফের শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র গরিবদের জন্য তা নির্ধারিত।
দলিল:
- ফাতাওয়া আলমগীরীতে বলা হয়েছে:
"ওয়াকফ আলাল আওলাদ বৈধ, এবং শর্তানুযায়ী তা পালন করা আবশ্যক।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৫০)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:
"ওয়াকফের শর্ত পালন করা ওয়াজিব।" (আল-হিদায়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫)
সারসংক্ষেপ:
যদি ওয়াকফের শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র গরিব বংশধররা গ্রহণ করতে পারে, তবে সচ্ছল ব্যক্তি তা গ্রহণ করতে পারবে না।
প্রশ্ন ৩:
কারো ইনকাম হারাম হলে তার বাসায় বেড়াতে যাওয়া, দাওয়াত খেতে যাওয়া বা তার থেকে উপহার গ্রহণ করা যাবে কি?
উত্তর:
যদি কারো পুরো ইনকাম হারাম হয়, তবে তার বাসায় যাওয়া বা তার দাওয়াত খাওয়া জায়েয নেই, যদি না জানা যায় যে, তার খাবার বা উপহার হালাল উপার্জন থেকে। তবে যদি তার খাবার বা উপহার হালাল উপার্জন থেকে হয়, তবে তা গ্রহণ করা জায়েয। কিন্তু যদি সন্দেহ থাকে, তবে তা পরিহার করা উত্তম।
দলিল:
- হাদীসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার শরীরে যে গোশত বেড়ে ওঠে, তা জাহান্নামের আগুনে পোড়াবে।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস ১৭৫০)
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"হারাম উপার্জনকারীর সাথে সম্পর্ক রাখা এবং তার দাওয়াত গ্রহণ করা মাকরূহ।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৮৫)
সারসংক্ষেপ:
যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, তার খাবার বা উপহার হালাল উপার্জন থেকে, তবে গ্রহণ করা যাবে। অন্যথায় পরিহার করা উত্তম।
প্রশ্ন ৪:
সরকারি চাকরির অবসরের পর পেনশন টাকা হালাল কি?
উত্তর:
সরকারি চাকরির পেনশন হালাল, যদি চাকরিটি বৈধ হয় এবং সরকারের নিয়ম অনুযায়ী তা প্রদান করা হয়। পেনশন হলো চাকরির বেতনের একটি অংশ যা সরকার ভবিষ্যতে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। তাই এটি হালাল।
দলিল:
- ফাতাওয়া উসমানীতে বলা হয়েছে:
"সরকারি চাকরির বেতন ও পেনশন হালাল, যদি চাকরিটি বৈধ হয়।" (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫০)
- ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি বৈধ চাকরি করে, তার বেতন ও পেনশন হালাল।" (আল-আসার, পৃষ্ঠা ১৫০)
সারসংক্ষেপ:
সরকারি চাকরির পেনশন হালাল, যদি চাকরিটি বৈধ হয়।
প্রশ্ন ৫:
সহশিক্ষা (co-education) বিদ্যমান এমন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করা যাবে কি? করলে ইনকাম হালাল হবে কি?
উত্তর:
সহশিক্ষা বিদ্যমান এমন স্কুলে শিক্ষকতা করা জায়েয হবে না, যদি সেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান লঙ্ঘন হয় এবং অশ্লীলতা বা ফিতনার আশঙ্কা থাকে। তবে যদি স্কুলে পর্দার ব্যবস্থা থাকে, তবে শিক্ষকতা করা জায়েয।
দলিল:
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা নারীদের সাথে এমনভাবে কথা বলো না যা ফিতনার কারণ হয়।" (সূরা আল-আহযাব: ৩২)
- ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দে বলা হয়েছে:
"সহশিক্ষা বিদ্যমান স্কুলে শিক্ষকতা করা জায়েয নয়, যদি সেখানে পর্দার বিধান লঙ্ঘন হয়।" (ফাতাওয়া দারুল উলূম, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৫০)
সারসংক্ষেপ:
যদি স্কুলে পর্দার ব্যবস্থা না থাকে এবং ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে শিক্ষকতা করা জায়েয নয়। কিন্তু পর্দার ব্যবস্থা ও ফিতনার আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকলে তা জায়েয।
সূত্র:
- ফাতাওয়া উসমানী
- রদ্দুল মুহতার
- ফাতাওয়া আলমগীরী
- আল-হিদায়া
- ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ