খালি গায়ে কুরআন পড়া প্রসঙ্গে
Taharah Purity · Hanafi
Question
১. শাওয়ার দিয়ে গোসল করার সময় নাপাক কাপড়ের থেকে পানি টপ টপ করে ফ্লোরে পড়ছিল। আমি খালি পায়ে ছিলাম। আবার শাওয়ারের পানি ও পড়ছিল। আমার পায়ের পাতা, পা, হাঁটু ইত্যাদি কি নাপাক হবে?
২. গোসলের সময় যদি নাপাক কাপড়ের পানির ছিটা আমার গায়ে পড়ে, তাহলে কি নাপাক হবো? শাওয়ারের পানি লেগেছিল কিনা শরীরের ওই জায়গায়, মনে নেই।
৩. কুরআন শরীফ পড়ার জন্য কি খালি গায়ে অথবা হাতা কাটা গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় তিলাওয়াত করা যাবে?
৪. অজু ছাড়া কি এমন ইসলামিক বই পড়া যাবে যাতে কুরআনের আয়াত আছে? এমনিতে পাক থাকলে, শুধু অজু নেই। (অর্থাৎ বড় নাপাকি না যে ফরজ গোসল করতে হবে)।
৫. কমোড এ প্রস্রাব করার সময় মনে হয় যে শরীরে ছিটা পড়ছে, কিন্তু দেখি নাই, এমন অবস্থায় কি শরীর নাপাক ধরে নিবো?
৬. কিছুদিন আগে প্যান্টের নীচের অংশ ফ্লোরের পানিতে লেগেছিল, নাপাক কাপড় ছিল ওই জায়গায়, সেটা নাপাক কাপড়ের পানি কিনা নিশ্চিত না, প্যান্ট কি নাপাক ধরে নিব?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
উত্তর প্রদানের পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে নিচ্ছি—ইসলামে পবিত্রতা ও নাপাকির ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো ইয়াকীন (নিশ্চিত জ্ঞান) এর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, আর সন্দেহ দ্বারা মূল পবিত্রতা নষ্ট হয় না। অর্থাৎ, কোনো কিছু নাপাক হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে তা পবিত্রই গণ্য হবে। এটি ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি: "اليقين لا يزول بالشك" (সন্দেহ দ্বারা নিশ্চিত বিশ্বাস দূরীভূত হয় না)।
আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত উত্তর নিম্নরূপ:
১. শাওয়ারের পানি ও নাপাক কাপড়ের পানি মিশে ফ্লোরে পড়লে পা নাপাক হবে কি?
উত্তর: না, আপনার পা, পায়ের পাতা বা হাঁটু নাপাক হবে না। কারণ, শাওয়ারের পানি প্রবলভাবে পড়ছিল (যাকে ফিকহের ভাষায় "মাআ' কাসীর" বা অধিক পরিমাণ পানি বলা হয়)। নাপাক কাপড় থেকে টপ টপ করে যে পানি পড়ছিল, তা শাওয়ারের বিশাল পানির সাথে মিশে গিয়ে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য (রং, গন্ধ, স্বাদ) হারিয়ে ফেলেছে। তা ছাড়া অধিক পানি ফ্লোরে পড়ার কারণে নাপাকি চলে গিয়েছে। তবে নাপাকের চিহ্ন আপনার পায়ে যদি লেগে থাকে তখন ভিন্ন কথা। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৩)
২. গোসলের সময় নাপাক কাপড়ের পানির ছিটা গায়ে লাগলে শরীর নাপাক হবে কি?
উত্তর: না, শরীর নাপাক হবে না। কারণ, গোসলের সময় শাওয়ারের পানি প্রবলভাবে পড়ছে। নাপাক কাপড় থেকে যে সামান্য ছিটা এসেছে, তা এই প্রবল পানির সাথে মিশে গিয়ে পবিত্র হয়ে গেছে। আপনি নিজেও বলেছেন, শরীরের ওই জায়গায় শাওয়ারের পানি লেগেছিল কিনা মনে নেই। যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে, ওই জায়গায় শুধু নাপাক পানির ছিটাই লেগেছে এবং সেখানে শাওয়ারের পানি লাগেনি, তাই মূলত শরীর পবিত্রই থাকবে। সন্দেহের কারণে নাপাকি ধার্য করা যাবে না। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৮৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৪৩)
৩. খালি গায়ে বা হাতাকাটা গেঞ্জি পরে কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে কি?
উত্তর: জ্বী, খালি গায়ে বা হাতাকাটা গেঞ্জি পরে কুরআন তিলাওয়াত করা সম্পূর্ণ জায়েয। কুরআন তিলাওয়াতের জন্য শরীর ঢাকা বা পোশাক পরা শর্ত নয়। তবে শর্ত হলো, শরীর ও পোশাক পবিত্র থাকতে হবে এবং তিলাওয়াতকারীকে অবশ্যই ওযু অবস্থায় থাকতে হবে। ছোট নাপাকি (ওযু ভঙ্গ) থাকলে তিলাওয়াত মাকরূহ, আর বড় নাপাকি (গোসল ফরজ) থাকলে তিলাওয়াত সম্পূর্ণ হারাম। তাই শরীর পবিত্র থাকলে এবং ওযু থাকলে খালি গায়ে তিলাওয়াত করা যাবে। তবে খালি গায়ে তেলাওয়াত করা আদবের পরিপন্থী। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩২; বাহিশ্তি জেওর, ১/৮৫)
৪. ওযু ছাড়া কুরআনের আয়াত সম্বলিত ইসলামিক বই পড়া যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, ওযু ছাড়া এমন ইসলামিক বই পড়া জায়েয, যাতে কুরআনের আয়াত আছে, তবে শর্ত হলো—বইটি যেন মূল কুরআন (মুসহাফ) না হয়। অর্থাৎ, তাফসির, ফিকহ বা দোয়ার বইয়ে যদি কুরআনের আয়াত থাকে, তাহলে সেটি ওযু ছাড়া স্পর্শ করা ও পড়া জায়েয। তবে ওযু ছাড়া অবস্থায় কোরআনের আয়াতের অংশের উপর হাত দেওয়া বা স্পর্শ করা যাবে না।
তবে উত্তম হলো, ওযু অবস্থায় পড়া। কিন্তু যদি বইটিতে এমনভাবে কুরআনের আয়াত থাকে যে, তা মূল কুরআনের মতোই মনে হয় (যেমন: শুধু কুরআনের আয়াত দিয়ে তৈরি বই), তাহলে সেটি ওযু ছাড়া স্পর্শ করা জায়েয হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ১/১৭২; ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৮৫)
৫. কমোডে প্রস্রাবের সময় শরীরে ছিটা পড়ার সন্দেহ হলে শরীর নাপাক ধরা হবে কি?
উত্তর: না, শুধু মনে হওয়া বা সন্দেহের কারণে শরীর নাপাক ধরা যাবে না। যতক্ষণ না আপনি চোখে দেখেন বা নিশ্চিত হন যে, প্রস্রাবের ছিটা শরীরে লেগেছে, ততক্ষণ শরীর পবিত্রই থাকবে। এটি ফিকহের মূলনীতি: "আসল হলো পবিত্রতা"। তাই এই সন্দেহ নিয়ে বারবার ওয়াসওয়াসায় (শয়তানি কুমন্ত্রণায়) পড়বেন না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪০; রদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭)
৬. ফ্লোরের পানিতে প্যান্ট ভিজলে, সেখানে নাপাক কাপড় ছিল, প্যান্ট নাপাক হবে কি?
উত্তর: না, প্যান্ট নাপাক হবে না। কারণ, আপনি নিশ্চিত নন যে, ফ্লোরের পানিটি নাপাক কাপড়ের পানিতে ভেজা ছিল কিনা। শুধু সন্দেহের কারণে পবিত্র প্যান্টকে নাপাক বলা যাবে না। ইসলামের মূলনীতি হলো, কোনো জিনিস পবিত্র থাকলে তা পবিত্রই থাকবে, যতক্ষণ না নাপাক হওয়া প্রমাণিত হয়। তাই এই প্যান্ট পরে নামাজ পড়া যাবে এবং এটি পবিত্রই গণ্য হবে। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৮০)
সংক্ষিপ্ত উপদেশ:
আপনার প্রশ্নগুলো থেকে মনে হচ্ছে, আপনি পবিত্রতা-নাপাকি নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা বা ওয়াসওয়াসায় (শয়তানি কুমন্ত্রণায়) ভুগছেন। ইসলামে এ ধরনের সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৬২)
তাই আপনি নিশ্চিত না হলে কোনো কিছুকে নাপাক মনে করবেন না। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করুন এবং নামাজ-ইবাদত করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার ইবাদতগুলো কবুল করুন। আমিন।