টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করার বিধান কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমাদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমার জাওয অল্প বেতনে ইমামতি করেন, এই আয় দিয়ে সংসার চালানো খুব কষ্টকর। তাই বিয়ের পরও আমাকে বাবার বাসায় থাকতে হচ্ছে। এ কারণে বাবাও আমাদের ওপর বিরক্ত হচ্ছেন ও কটু কথা শুনতে হচ্ছে। শ্বশুরবাড়িতে থাকাও এখন সম্ভব হচ্ছে না, কারণ আমার সিজার হয়েছে এবং সেখানে টিউবওয়েল চাপতে হয়।
আমাদের ব্যবসা করার মতো কোনো মূলধন নেই, জমি-জায়গা বা অন্য কোনো আয়ের ব্যবস্থাও নেই। হারাম থেকে বাঁচার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করি।
এখন আমার বাবা চান, আমার জাওয টুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া যান। সেখানে আমাদের নিকটাত্মীয় আছেন এবং যাওয়ার পর ভালো কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। বর্তমানে শ্রমিক ভিসা বন্ধ থাকায় সরাসরি শ্রমিক ভিসায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিকল্পনা হলো, টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজের সুযোগ হলে এবং শ্রমিক ভিসা চালু হলে যত দ্রুত সম্ভব বৈধ শ্রমিক ভিসা/ওয়ার্ক পারমিট করে নেওয়া।
আমাদের প্রশ্ন হলো:
টুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে কাজ করা যদি দেশটির ভিসার শর্ত ও আইন অনুযায়ী বৈধ না হয়, তাহলে এভাবে গিয়ে কাজ করা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম হবে? যদি হারাম হয়, তাহলে আমাদের এই কঠিন আর্থিক পরিস্থিতিতে কীভাবে বৈধ উপায়ে বিদেশে গিয়ে উপার্জন করা সম্ভব?
আমরা হারাম থেকে বাঁচতে চাই এবং যথাসম্ভব হালাল ও বৈধ পথেই যেতে চাই। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কী করা উচিত?
আরেকটি বিষয়:
গতবার উত্তরে বলা হয়েছিল, টুরিস্ট ভিসায় কাজের নিয়ত ছাড়া ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া যাওয়া যাবে এবং সুযোগ এলে শ্রমিক ভিসা করা যাবে।
কিন্তু এর মধ্যে যদি কাজের সুযোগ আসে এবং সেই কাজের আয় শরিয়ত অনুযায়ী হারাম হয়, তাহলে সেই আয় পরে সদকা করে দিলে কি দায়মুক্ত হওয়া যাবে? আমাদের আর্থিক অবস্থা খুবই কঠিন, প্রায় সব পথ বন্ধ। তাই আমাদের জন্য কোনো শরয়ি সহজতার সুযোগ আছে কি?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটি মূল বিষয় পরিষ্কার করতে চাই:
১. টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে:
টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করা মূলত দেশটির আইন ও ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে থাকে। শরিয়তের দৃষ্টিতে, কোনো মুসলিম দেশের বৈধ আইন মেনে চলা জরুরি, যতক্ষণ না তা শরিয়তের কোনো বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"المسلمون على شروطهم" "মুসলিমরা তাদের শর্তসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯৬)
তাই টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করা, যা দেশটির আইনে নিষিদ্ধ, তা শরিয়তের দৃষ্টিতেও বৈধ নয়। ইমাম
২. টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করলে ইনকাম কি করতে হবে?
যদি কেউ টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করে ইনকাম করে, তাহলে সেই ইনকাম হারাম হবে না, যদি বৈধ কাজ দ্বারা ইনকাম করা হয়। তবে এভাবে চুক্তি ভঙ্গ করাটা শরীয়তসম্মত নয়।
৩. বৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার বিকল্প:
আপনাদের জন্য কিছু বৈধ বিকল্প হতে পারে:
ক) সরাসরি শ্রমিক ভিসার জন্য অপেক্ষা করা এবং চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। যখন শ্রমিক ভিসা চালু হবে, তখন বৈধভাবে যাওয়া।
খ) বৈধ ব্যবসা বা অন্য কোনো পেশায় আয়ের ব্যবস্থা করা।
গ) দেশের ভেতরেই অন্য কোনো বৈধ উপায়ে আয়ের চেষ্টা করা।
ঘ) আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের সাহায্য নেওয়া।
৪. কঠিন পরিস্থিতিতে শরয়ি সহজতা:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا" "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, হারাম কাজ করা জায়েজ হয়ে যাবে। বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করার পর ক্ষমা করবেন। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি হারাম থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে হালাল রিজিকের পথ দেখাবেন।"
৫. আপনার করণীয়:
১. তওবা ও ইস্তিগফার - আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন। ২. সবর ও ধৈর্য - কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরুন, আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ৩. বিকল্প চিন্তা - দেশের ভেতরে বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে আয়ের চেষ্টা করুন। ৪. পরামর্শ - স্থানীয় আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করুন। ৫. দুআ - আল্লাহর কাছে রিজিকের জন্য দুআ করুন।
উপসংহার:
টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়, কারণ এটি দেশটির আইন লঙ্ঘন। তবে যদি আপনি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যান এবং সেখানে গিয়ে বৈধভাবে শ্রমিক ভিসা করার সুযোগ পান, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়। আল্লাহ তাআলা আপনাদের জন্য সহজ পথ তৈরি করে দিন এবং হালাল রিজিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب