হারাম উপার্জনকারীর ব্যক্তি থেকে পারিশ্রমিক নেওয়া
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি যদি কাউকে টাকার বিনিময়ে প্রাকটিক্যাল বা অন্য কোনো কাজ করে দি। যেমন আমি একটা প্রাকটিক্যাল খাতার জন্যে একটা এমাউন্ট এর টাকা ফিক্সড করলাম। এখন কাজ টা করে আমি টাকা নিচ্ছি ইং শা আল্লহ এটা হালাল তাইনা???
এখন যেই ব্যক্তি আমাকে টাকাটা দেবে প্রাকটিক্যাল এর এখন তার টাকাটা যদি হালাল না হয় তাহলে কি আমার ওই টাকা টাও হালাল হবেনা??? আমাকে এটা একটু ডিটেলস এ বুঝিয়ে দিলে খুব ভালো হতো।
এখন আমি যদি জানি তার টাকা হারাম তাহলে কি তার কাছ থেকে আমি টাকা নেবোনা??? আর যদি আমি না জানি তার টাকা হালাল কি হারাম তাহলে কি টাকাটা নেবো আমি???তাহলে হালাল ইনকাম আমি কিভাবে করবো???এখন বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষ ই সুদ গুষ হারাম ইনকাম এ জড়িত। তাহলে কি করবো???
আমি প্রাকটিক্যাল করে টাকা ইনকাম করতে চাই তাহলে আমিতো বুঝবোনা কার টাকা হালাল কার হারাম তাহলে আমি কি সবার টাকা নিতে পারবো?আমি চাই আমার ইনকাম টা একদম ১০০% হালাল হোক আমার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে।
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আমি বিস্তারিতভাবে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
১. কাজের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার বৈধতা
আপনি যদি কারো জন্য প্রাকটিক্যাল বা অন্য কোনো বৈধ কাজ করেন এবং তার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেন, তাহলে আপনার ইনকাম সম্পূর্ণ হালাল। ইসলামে কাজের বিনিময়ে মজুরি বা পারিশ্রমিক নেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে জীবিকা নির্বাহের উপকরণ দান করেছি এবং তাদের একের পর এক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছি।" (সূরা আয-যুখরুফ: ৩২)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"কোনো ব্যক্তি নিজ হাতে কাজ করে যা উপার্জন করে, তা-ই সর্বোত্তম উপার্জন।" (সহীহ বুখারী: ২০৭২)
২. গ্রাহকের টাকা হারাম হলে আপনার ইনকামের উপর প্রভাব
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে ব্যক্তি আপনাকে টাকা দিচ্ছে, তার টাকা যদি হারাম উপার্জন থেকে হয়, তাহলে আপনার ইনকাম কি হারাম হবে?
উত্তর: আপনার কাজের বিনিময়ে আপনি যে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, তা হালাল, যদি আপনার কাজটি নিজে বৈধ হয়। কারণ:
১. আপনার কাজ বৈধ—আপনি প্রাকটিক্যাল করে দিচ্ছেন, যা একটি বৈধ কাজ। ২. আপনি জানেন না যে তার টাকা হারাম—যদি আপনি না জানেন, তাহলে আপনার জন্য তা গ্রহণ করা জায়েয। ৩. দায়িত্ব হলো কাজের উপর—আপনার দায়িত্ব হলো কাজটি বৈধ কিনা তা নিশ্চিত করা, গ্রাহকের সম্পদের উৎস তদন্ত করা আপনার দায়িত্ব নয়।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন:
"কোনো ব্যক্তির নিকট থেকে বৈধ কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েয, যদিও সেই ব্যক্তি ফাসিক বা পাপী হয়। কারণ, মুসলিমের সম্পদ তার জন্য হালাল, যতক্ষণ না প্রমাণিত হয় যে তা হারাম।" (রদ্দুল মুহতার: ৯/৫৫০)
৩. জানা থাকলে করণীয়
যদি আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে, ঐ ব্যক্তির টাকা হারাম (যেমন: সুদ, ঘুষ, চুরি ইত্যাদি থেকে উপার্জিত), তাহলে:
- ঐ ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম।
- তবে যদি আপনি কাজটি করে থাকেন এবং টাকা না নেন, তাহলে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এক্ষেত্রে আপনি টাকা নিলে তা গ্রহণ করা মাকরূহ হবে। তবে আপনার কাজের বিনিময়ে অন্য কোনো বৈধ উপায়ে ক্ষতিপূরণ নিতে পারেন।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন:
"যদি কেউ জানে যে, তার সম্পদ হারাম, তাহলে তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করা মাকরূহ।" (আল-আসার: ১/২৪৫)
৪. না জানা অবস্থায় করণীয়
যদি আপনি না জানেন যে, তার টাকা হালাল না হারাম, তাহলে:
- আপনি টাকা নিতে পারবেন। কারণ, মূলনীতি হলো—যতক্ষণ না প্রমাণিত হয় যে সম্পদটি হারাম, ততক্ষণ তা হালাল বলে গণ্য হবে।
- আপনার উপর তদন্ত করা ওয়াজিব নয়। প্রতিটি লেনদেনে গ্রাহকের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা আপনার দায়িত্ব নয়।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"মুসলিমের সম্পদ তার জন্য হালাল, যতক্ষণ না সে তা স্বেচ্ছায় দান করে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৬১)
৫. বর্তমান সমাজে হারাম ইনকামের প্রভাব
আপনি বলেছেন যে, বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষ সুদ-ঘুষের মতো হারাম ইনকামে জড়িত। এটা সত্য যে, আমাদের সমাজে অনেক মানুষ হারাম উপার্জনে জড়িত। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আপনি সবার সাথে লেনদেন বন্ধ করে দেবেন।
মূলনীতি হলো:
- আপনি যদি জানেন যে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির আয়ের প্রধান উৎস হারাম (যেমন: সুদের কারবারি, মদ ব্যবসায়ী), তাহলে তার সাথে লেনদেন করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
- যদি আপনি না জানেন বা সন্দেহ থাকে, তাহলে লেনদেন করা জায়েয।
৬. ১০০% হালাল ইনকামের উপায়
আপনি ১০০% হালাল ইনকাম করতে চান, এটা খুবই প্রশংসনীয়। এর জন্য:
১. বৈধ কাজ করুন—যে কাজ ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বৈধ, তা করুন। ২. হারাম কাজ থেকে দূরে থাকুন—সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, মিথ্যা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। ৩. নিয়ত শুদ্ধ করুন—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করুন। ৪. সন্দেহজনক স্থান থেকে দূরে থাকুন—যেখানে স্পষ্ট হারাম জড়িত, সেখানে যাবেন না। ৫. তাকওয়া অবলম্বন করুন—আল্লাহভীরুতা আপনার রিজিকের উৎস হবে। আল্লাহ বলেন:
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা তার ধারণায়ও আসে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- আপনার কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত টাকা হালাল, যদি কাজটি বৈধ হয়।
- গ্রাহকের টাকা হারাম হলে আপনার ইনকাম হারাম হবে না, যদি আপনি না জানেন।
- জানলে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম।
- না জানলে টাকা নেওয়া জায়েয।
- ১০০% হালাল ইনকামের জন্য বৈধ কাজ করুন, হারাম থেকে দূরে থাকুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।