সরকারি ভাতা (গর্ভকালীন, বিধবা, বয়স্ক, অসুস্থতা) যাকাত প্রদানকারী ব্যক্তির জন্য গ্রহণ করা জায়েজ কি না?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4271
Questioner: Amatullah
Question Asked: 21 Aug 2026, 07:33 PM
Reviewed & Published: 21 Aug 2026, 07:45 PM
Views: 31
Tokens: 4,492
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু
সরকারি বিভিন্ন ভাতা যেমন গর্ভকালীন ভাতা, বিধবা ও বয়স্ক ভাতা এগুলো যারা যাকাত দেয় তারা এসব ভাতা খাওয়া জায়েজ হবে কিনা?

রিসেন্টলি শুনেছি স্ট্রোক করলে রোগী তার মেডিকেল রিপোর্ট উপস্থাপন সাপেক্ষ সরকার তাকে ৫০০০০ টাকা ভাতা প্রদান করসে উপজেলা পরিষদ থেকে। এতে ধনী গরীব পার্থক্য নেই, স্ট্রোক করসে তো রোগী এই ভাতাটা পাবে এমন।

আমার এক আত্নীয়ের প্রশ্ন তার মা স্ট্রোক করসে কিন্তু তিনি বা তার পরিবার যাকাত প্রদান করে মানে যাকাত দেয়ার যোগ্য
তো ওনার প্রশ্ন উনি কি এই ভাতা টা গ্রহন করা ঠিক হবে? আর এটা গ্রহনে জায়েজ হবে কিনা? যেহেতু ধনী গরীব সবাইকেই সরকার থেকে দেয়ার বিধান আছে?

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে কয়েকটি মূলনীতি স্পষ্ট করা জরুরি:

১. সরকারি ভাতার প্রকৃতি

সরকারি ভাতা (যেমন: গর্ভকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, অসুস্থতা ভাতা ইত্যাদি) সাধারণত রাষ্ট্রীয় কোষাগার (Bait-ul-Mal) থেকে প্রদেয় একটি আর্থিক সহায়তা। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির দান-সদকা নয়, বরং রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য বরাদ্দকৃত একটি অধিকার।

২. যাকাত প্রদানকারী ব্যক্তির জন্য ভাতা গ্রহণের বিধান

যাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি যদি প্রকৃতই অভাবী, অসহায়, ঋণগ্রস্ত বা অসুস্থ হয়ে আর্থিক সংকটে থাকেন, তাহলে তার জন্য সরকারি ভাতা গ্রহণ করা জায়েজ। কারণ, যাকাত প্রদানকারী হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তিনি সবসময় স্বচ্ছল; বরং অনেক সময় মানুষ নিজের ওপর যাকাত ফরজ হওয়ার পরও বিভিন্ন কারণে (যেমন: ঋণ, অসুস্থতা, পারিবারিক দায়িত্ব) প্রকৃতপক্ষে অভাবী থাকেন।

কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা:

  • আল্লাহ তাআলা বলেন:

    "আর যারা তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে বলে স্বীকার করে।"
    (সূরা আয-যারিয়াত: ১৯)

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধন-সম্পদ চায়, আল্লাহ তাকে পর্যাপ্ত দান করেন।"
    (সুনান আত-তিরমিজি: ২৩৪৯)

৩. ধনী-গরিব নির্বিশেষে ভাতা প্রদানের শর্ত

যদি সরকার কোনো ভাতা সব নাগরিককে (ধনী-গরিব নির্বিশেষে) দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে, তাহলে সেটি রাষ্ট্রীয় নীতি। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে যাকাত বা সদকা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট খাতের (আট শ্রেণির) জন্য। কিন্তু সরকারি ভাতা যাকাতের অন্তর্ভুক্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক প্রকল্প। তাই:

  • যদি ভাতা গ্রহীতা প্রকৃতই অভাবী হন, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েজ।
  • যদি ভাতা গ্রহীতা স্বচ্ছল হন এবং তার ওপর যাকাত ফরজ হয়, তাহলে তার জন্য এই ভাতা গ্রহণ করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হতে পারে, কারণ এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার। তবে যদি তিনি অসুস্থ বা জরুরি প্রয়োজনে থাকেন, তাহলে তা গ্রহণে দোষ নেই।

৪. স্ট্রোক রোগীর জন্য ৫০,০০০ টাকা ভাতা

আপনার আত্মীয়ের মা স্ট্রোক করেছেন এবং তিনি বা তার পরিবার যাকাত দেন। অর্থাৎ তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল। কিন্তু স্ট্রোকের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। এই অবস্থায়:

  • যদি পরিবারটি চিকিৎসার খরচ বহনে সক্ষম হয়, তাহলে এই ভাতা গ্রহণ করা জায়েজ হবে না, কারণ এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং এর জন্য ধনী-গরিব নির্বিশেষে দেওয়া হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে স্বচ্ছল ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় সাহায্য গ্রহণ উচিত নয়।
  • যদি পরিবারটি চিকিৎসার খরচ বহনে অক্ষম হয় (যদিও তারা যাকাত দেয়, কিন্তু অসুস্থতার কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে), তাহলে এই ভাতা গ্রহণ করা জায়েজ। কারণ, এটি তাদের জন্য বৈধ সাহায্য।

৫. হানাফি ফিকহের নির্দেশনা

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহরদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে:

"রাষ্ট্রীয় কোষাগার (Bait-ul-Mal) থেকে সাহায্য গ্রহণ করা ততক্ষণ পর্যন্ত জায়েজ, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি প্রকৃতই অভাবী বা অসহায়।"
(রদ্দুল মুহতার: ৩/২৬০)

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন:

"যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন পূরণে সক্ষম, তার জন্য রাষ্ট্রীয় সাহায্য গ্রহণ করা মাকরূহ।"
(আল-খারাজ: ১/৮৫)

৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

  • যাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি যদি প্রকৃতই অভাবী হন (যেমন: ঋণগ্রস্ত, অসুস্থ, বা আয় কম), তাহলে সরকারি ভাতা গ্রহণ করা জায়েজ
  • স্বচ্ছল ব্যক্তি (যিনি নিজের ও পরিবারের খরচ বহনে সক্ষম) যদি ভাতা গ্রহণ করেন, তাহলে তা মাকরূহ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার।
  • স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে: যদি চিকিৎসার খরচ পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়, তাহলে ভাতা গ্রহণ করা জায়েজ। আর যদি তারা চিকিৎসার খরচ বহনে সক্ষম হন, তাহলে গ্রহণ না করাই উত্তম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।

রেফারেন্স:

  • সূরা আয-যারিয়াত: ১৯
  • সুনান আত-তিরমিজি: ২৩৪৯
  • রদ্দুল মুহতার: ৩/২৬০
  • আল-খারাজ: ১/৮৫
  • ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪৫৬
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৮০

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.