আমীন বলার পর দরুদ পড়া প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি একজনের জন্য দোয়া করেছিলাম,এই ভাবে আল্লাহ আপনাকে আফিয়াতের সাথে উত্তম জীবন সঙ্গী দান করুন আমীন ইয়া রব্বি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
আমি শেষে রব্বির পর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম পড়েছি বলে তিনি আমাকে কিছু কথা বলেছেন সেগুলো হচ্ছে এমন
ওনার উত্তম ছিল: আপনি রব্বির পরে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লিখেছেন।এটা লিখা হারাম। ক্ষেত্র বিশেষে কুফরি। নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাঃ আমাদের মতোই মানুষ কিন্তু তিনি আল্লাহর রসুল। তিনি মাটির তৈরী৷ আমিও মাটির তৈরী। আল্লাহ হলেন রব৷ মুহাম্মদ সাঃ হলেন রাসুল।
আমি এর পর বলেছিলাম যে : আমি এই উদ্দেশ্যে বলি না , আল্লাহ ভালো জানেন, প্রত্যেক টা দোয়া করলে ঝুলত অবস্থায় থাকে যতক্ষণ না দরুদ পড়া হচ্ছে আল্লাহর রাসুলের উপর, দোয়া করার বইগুলোতে,আসমানী খামে , বিভিন্ন শায়েখের কথাতে এবং উস্তাদ উস্তাযারা বলেন দোয়ার শেষে দরুদ পরতে ইহাতে দোয়া কবুল দ্রুত হয় , তাই যে দোয়াই করি না কেনো শেষে যেনো দরুদ পড়ি এই নির্দেশ পেয়েছিলাম,সেই দোয়া অন্যান্য দোয়ার চেয়ে আগে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অধিক, আমার উদ্দেশ্য এটাই আরকি ,তবে অনেক শুকরিয়া আমি এই বিষয়ে ভালোভাবে স্টাডি করে উপযুক্ত কিছু পেলে অবশ্যই বাদ দিব এবং খেয়াল রাখব ইনশাআল্লাহ , কারন আমার উদ্দেশ্য রব কে খুশি করা উনাকে সন্তুষ্ট করা ওনাকে নারাজ করা না, অনেক অনেক শুকরিয়া
এরপর তিনি আবার বলেন':আমার কাছে উপযুক্ত দলিল আছে। আলহামদুলিল্লাহ। আপনি হয়তো স্থানীয় বিদআতি কারো থেকে ইলম নিচ্ছেন। বিষয়টা এমন আক্ষরিকভাবে চিন্তা করা যাবে না। মুনাজানেতর শুরুতে এবং শেষে দরুদ পড়া হয় যেতে পারে কিন্তু আক্ষরিকভাবে না। ইসমে আজম রেজা বেরলভিদের আক্বিদার জিনিস যেইটা দলিল হিসেবে গণ্য হবে না। মেইলের জন্য সমস্যা হচ্ছে না হলে আয়াত পড়ে পড়ে দলিল দিতাম।
আমি আবার বলেছিলাম : জাযাকিল্লাহু খাইরান। আমার উদ্দেশ্য মোটেও ‘ইয়া রব্বি’ বলে রাসূল ﷺ কে উদ্দেশ্য করা ছিল না। আমি ‘আমিন, ইয়া রব্বি’ বলে আল্লাহকে ডেকেছি, এরপর আলাদাভাবে রাসূল ﷺ এর ওপর দরুদ পাঠ করেছি। তবে লেখাটা একসাথে হয়ে যাওয়ায় যদি ভুল বোঝার সুযোগ থাকে, তাহলে আমি আলাদা করে লিখব ইনশাআল্লাহ। আপনার কাছে যে দলিলগুলো আছে, সুযোগ হলে আমাকে পাঠাবেন আমি দেখে নেব ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ সকল ভুল মাফ করে দিক
ওনার রিপ্লাই এমন ছিল:আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু আক্ষরিকভাবে বিষয় টি ভুল মেসেজ দিচ্ছে। আর এভাবে যারা মাজারপুজারী পিরপন্থী আছে তারা লিখে। সুতরাং আপনি আপনার অজান্তেই অন্য এক গোষ্ঠীর পারপার সার্ভ করে ফেলছেন। আক্ষরিক অর্থে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লেখার দরকার নাই যদি না তার নাম লিখছি। এছাড়া কিছু মৌলিক বিশ্বাস যেমন রাসুল সাঃ মাটির তৈরী। তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। তিনি আমাদের মতোই মানুষ
একানে রবের কথা বলা আছে। রবের দয়ার আসলেই শেষ নেই। অসীম। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছিলাম রবের সাথে রাসুল কে রিলেট না করতে।দুটো ভিন্ন সত্তা আমাদের দ্বারা যেন অসাবধানতার কারণে এমন না হয়!
ব্যাক্তিটা হানাফি মাযহাবের
এখানে কি আমার বোঝার কোন ভুল আছে নাকি উনার বুঝার কোন ভুল আছে ?
Answer
প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি একটি দোয়া করেছিলেন এইভাবে: "আল্লাহ আপনাকে আফিয়াতের সাথে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন, আমীন ইয়া রব্বি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম"। একজন ব্যক্তি আপত্তি তুলেছেন যে 'রব্বি' শব্দের পর 'সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম' লেখা/বলা হারাম বা কুফরি। তিনি বলেছেন এটি মাজারপূজারীদের পদ্ধতি। অথচ আপনার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহকে ডেকে দোয়া করা এবং পরে আলাদাভাবে রাসূল ﷺ-এর উপর দরুদ পাঠ করা।
মূল বিধান ও বিশ্লেষণ
১. দরুদ পাঠের গুরুত্ব
দরুদ পাঠ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا "নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর উপর দরুদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার উপর দরুদ পাঠাও এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)
২. দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পাঠের বিধান
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, দোয়া কবুল হওয়ার জন্য দরুদ পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ دَعَا وَلَمْ يُصَلِّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَيْسَ بِدُعَاءٍ "যে ব্যক্তি দোয়া করে এবং নবীর উপর দরুদ পাঠ করে না, তার দোয়া (কবুলের উপযোগী) হয় না।" (মু'জামুল আওসাত, তাবারানি)
আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
كُلُّ دُعَاءٍ مَحْجُوبٌ حَتَّى يُصَلِّيَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ "প্রত্যেক দোয়া আটকে থাকে যতক্ষণ না নবীর উপর দরুদ পাঠ করা হয়।" (সুনানে দারাকুতনি, আল-মু'জামুল কাবির, তাবারানি)
৩. 'আমীন ইয়া রব্বি' বলার পর দরুদ পাঠের বিধান
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো: "আমীন ইয়া রব্বি" বলার পর "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" বলা বা লেখা কি জায়েজ?
উত্তর: এতে কোনো সমস্যা নেই, ইনশাআল্লাহ। কারণ:
১. উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ: আপনার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহকে ডাকা এবং পরে রাসূল ﷺ-এর উপর দরুদ পাঠ করা। ইসলামে নিয়ত ও উদ্দেশ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। হাদিসে আছে: "ইন্নামাল আ'মালু বিন নিয়্যাত" (নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল)।
২. দরুদ পাঠ একটি স্বতন্ত্র ইবাদত: দোয়ার পর দরুদ পাঠ করা সুন্নত এবং মুস্তাহাব। এটি রাসূল ﷺ-কে আল্লাহর সাথে শরিক করার জন্য নয়, বরং রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ এবং দোয়া কবুলের মাধ্যম হিসেবে।
৩. আলাদা বাক্য হিসেবে গণ্য: "আমীন ইয়া রব্বি" একটি বাক্য এবং "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" আরেকটি স্বতন্ত্র বাক্য। একই বাক্যে ব্যবহৃত হলেও এগুলো আলাদা আলাদা অর্থ বহন করে।
৪. আপত্তিকারী ব্যক্তির ভুল
যে ব্যক্তি আপত্তি তুলেছেন, তার বুঝার মধ্যে নিম্নলিখিত ভুলগুলো রয়েছে:
১. আক্ষরিক অর্থের অতিরঞ্জন: তিনি "আমীন ইয়া রব্বি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" পড়াকে আক্ষরিকভাবে একই বাক্য হিসেবে গণ্য করেছেন, যেখানে মনে হবে 'রব্বি' বলেই রাসূল ﷺ-কে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু আরবি ব্যাকরণ ও প্রসঙ্গ অনুযায়ী এটি সঠিক নয়।
২. বিদআতের অভিযোগ: তিনি এটাকে বিদআত বা মাজারপূজারীদের পদ্ধতি বলেছেন, যা সঠিক নয়। দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পাঠ করা সাহাবা ও তাবেয়ীনদের আমল দ্বারা প্রমাণিত।
৩. কুফরির অভিযোগ: কুফরির অভিযোগ করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কোনো মুসলিমকে কুফরি বলা তখনই জায়েজ, যখন সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয় যে সে কুফরি করেছে। এখানে আপনার উদ্দেশ্য স্পষ্টতই আল্লাহকে ডাকা ছিল, তাই এটি কুফরি হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
৫. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহে দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) বলা হয়েছে।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) -এ বর্ণিত আছে যে, দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূল ﷺ-এর উপর দরুদ পাঠ করা এবং দোয়ার শেষেও দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ১/৪৯০)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) -তেও দোয়ার আদব সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পাঠ করা উচিত। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩১৯)
৬. রাসূল ﷺ-এর মানবিকতা ও রিসালাত
আপত্তিকারী ব্যক্তি বলেছেন: "মুহাম্মদ সাঃ আমাদের মতোই মানুষ কিন্তু তিনি আল্লাহর রসুল। তিনি মাটির তৈরী। আমিও মাটির তৈরী।"
এটি সঠিক বিশ্বাস যে, রাসূল ﷺ ছিলেন মানুষ, মাটির তৈরি, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি সাধারণ মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ "বলুন, আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ, তবে আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়।" (সূরা আল-কাহফ: ১১০)
তবে রাসূল ﷺ-এর উপর দরুদ পাঠ করা তাকে আল্লাহর সাথে শরিক করা নয়। দরুদ পাঠ একটি ইবাদত, যা আল্লাহ নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন।
৭. আপনার অবস্থানের সঠিকতা
আপনার অবস্থান সঠিক। আপনি:
- আল্লাহকে ডেকেছেন ("আমীন ইয়া রব্বি")
- রাসূল ﷺ-এর উপর দরুদ পাঠ করেছেন ("সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম")
- আপনার উদ্দেশ্য ছিল দোয়া কবুলের মাধ্যম হিসেবে দরুদ পাঠ করা
এটি সম্পূর্ণ জায়েজ এবং মুস্তাহাব। আপনার মধ্যে কোনো ভুল নেই।
উপসংহার ও পরামর্শ
১. আপনার বুঝার কোনো ভুল নেই। দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পাঠ করা সুন্নত ও মুস্তাহাব। "আমীন ইয়া রব্বি" বলার পর "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" বলা জায়েজ।
২. আপত্তিকারী ব্যক্তির বুঝার ভুল আছে। তিনি আক্ষরিক অর্থের অতিরঞ্জন করেছেন এবং কুফরির অভিযোগ এনেছেন, যা সঠিক নয়।
৩. ভবিষ্যতে সতর্কতা: যেহেতু লেখার সময় একসাথে হয়ে গেলে ভুল বোঝার সুযোগ থাকে, তাই আপনি চাইলে আলাদা করে লিখতে পারেন, যেমন: "আমীন ইয়া রব্বি" "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।" এটি আরও পরিষ্কার হবে।
৪. শান্তিপূর্ণ আলোচনা: এই বিষয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক না করে শান্তিপূর্ণভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করুন। ইসলামে দ্বন্দ্ব-বিবাদ না করে নম্রভাবে কথা বলার নির্দেশ রয়েছে।
৫. ইলম অর্জন: নিজে আরও ভালোভাবে বিষয়টি অধ্যয়ন করুন এবং প্রামাণ্য দলিলসহ আলোচনা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের দোয়া কবুল করুন। আমীন।