স্বাক্ষী ছাড়া বিয়ে জায়েজ কি না
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিবাহের বৈধতা সম্পর্কে ফতোয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একটি মেয়ে ও ছেলে নিজেরা বিবাহ করেছে। বিবাহটি কাজী অফিসে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কাজী এবং ছেলে-মেয়ে ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত ছিল না। কাজী বলেছেন, সাক্ষী পরে ম্যানেজ করে লিখে দেবেন। বিবাহের সময় কোনো টোকেন (সার্টিফিকেট) দেওয়া হয়নি, তিন মাস পরে দেওয়া হবে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বিবাহটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হয়েছে কি না?
শরীয়তের বিধান
বিবাহের শর্তাবলী
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. ইজাব (প্রস্তাব) - মেয়ের পক্ষ থেকে বা তার অভিভাবকের পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব ২. কবুল (সম্মতি) - ছেলের পক্ষ থেকে সেই প্রস্তাব গ্রহণ ৩. সাক্ষী - দুইজন মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষীর উপস্থিতি
সাক্ষীর শর্ত
বিবাহের সাক্ষী হওয়া অপরিহার্য শর্ত। সাক্ষী ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।
কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে:
"তোমাদের মধ্য থেকে দুইজন পুরুষ সাক্ষী রাখো।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮২)
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
"সাক্ষী ব্যতীত কোনো বিবাহ নেই।" (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজী, সুনানে ইবনে মাজাহ)
রদ্দুল মুহতার (হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ)-এ উল্লেখ আছে:
"সাক্ষী ব্যতীত বিবাহ সম্পন্ন হয় না। যদি সাক্ষী ছাড়া বিবাহ হয়, তবে তা বাতিল (অবৈধ) বলে গণ্য হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫)
কাজীর ভূমিকা
কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহের অপরিহার্য অংশ নন। তিনি শুধুমাত্র নিবন্ধনকারী বা নথিভুক্তকারী। কাজীর উপস্থিতি বিবাহের বৈধতার শর্ত নয়। তবে সাক্ষী থাকা আবশ্যক।
সাক্ষী পরবর্তীতে ম্যানেজ করার বিষয়
কাজী যদি বলেন যে সাক্ষী পরে ম্যানেজ করে দেবেন, এটি শরীয়তসম্মত নয়। বিবাহের সময়ই সাক্ষী উপস্থিত থাকা আবশ্যক। পরবর্তীতে সাক্ষী ম্যানেজ করা বা তৈরি করা জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হবে এবং তা বিবাহকে বৈধ করবে না।
টোকেন বা সার্টিফিকেট
টোকেন বা বিবাহের সার্টিফিকেট শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহের শর্ত নয়। এটি শুধুমাত্র আইনগত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। সার্টিফিকেট না পাওয়া বিবাহের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।
এই বিবাহের বিধান
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- বিবাহটি কাজী অফিসে হয়েছে
- কাজী এবং ছেলে-মেয়ে ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত ছিল না
- কাজী বলেছেন সাক্ষী পরে ম্যানেজ করে দেবেন
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এই বিবাহটি বৈধ হয়নি, কারণ বিবাহের সময় দুইজন সাক্ষী উপস্থিত ছিল না। সাক্ষী ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে:
"সাক্ষী ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না। যদি সাক্ষী ছাড়া বিবাহ হয়, তবে তা বাতিল।" (আল-হিদায়া, ২/৩০০)
ফতোয়ায় আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"যদি কোনো ব্যক্তি সাক্ষী ছাড়া বিবাহ করে, তবে তা বাতিল।" (ফতোয়ায় আলমগীরী, ১/২৮০)
করণীয়
যেহেতু বিবাহটি সাক্ষী ছাড়া হয়েছে, তাই এটি শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে করণীয় হলো:
১. পুনরায় বিবাহ করা - ছেলে ও মেয়েকে দুইজন মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে পুনরায় বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে। অভিভাবকের সম্মতিতে এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিতে নতুন করে নিকাহ করতে হবে।
২. অভিভাবকের সম্মতি - মেয়ের অভিভাবকের (পিতা বা নিকটাত্মীয়) সম্মতিতে বিবাহ হওয়া উত্তম। তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিজে বিবাহ করলে তা বৈধ, তবে সাক্ষী থাকা আবশ্যক।
৩. সাক্ষী নিশ্চিত করা - দুইজন বিশ্বস্ত মুসলিম পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত রেখে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে।
৪. কাজীকে অবহিত করা - কাজীকে জানাতে হবে যে পূর্বের বিবাহটি সাক্ষী না থাকার কারণে শরীয়তসম্মত হয়নি, তাই নতুন করে বিবাহ সম্পন্ন করা হবে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
এই বিবাহটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হয়নি, কারণ বিবাহের সময় দুইজন সাক্ষী উপস্থিত ছিল না। সাক্ষী ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না। কাজী পরবর্তীতে সাক্ষী ম্যানেজ করে দেবেন বলেছেন, এটি শরীয়তসম্মত নয়। তাই ছেলে-মেয়েকে দুইজন মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে পুনরায় বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।