পাত্রের বড় বোন বিয়েতে রাজি না থাকলে করণীয় কী?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4184
Questioner: m
Question Asked: 19 Aug 2026, 09:22 PM
Reviewed & Published: 19 Aug 2026, 09:26 PM
Views: 30
Tokens: 8,230
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পাত্রের বাবা আর পাত্র রাজি থাকলে আর পাত্রের বড় বোন শরঈ সম্মত কোনো কারণ ছাড়া বা সহ বিয়েতে রাজি না থাকলে এবং এ বিয়ের ফলে পাত্রের সাথে বোন সম্পর্ক না রাখার কথা বললে পাত্রসহ পাত্রের পরিবারের বাকি সদস্যের এবং পাত্রী এবং পাত্রীর পরিবারের করণীয় কী হতে পারে। যদি পাত্র এবং পাত্রী আর উভয় পরিবারের বাকি সবাই বিয়েতে সম্মত হয় সেক্ষেত্রে? উল্লেখ্য পাত্রের মা নেই। বড় বোন মায়ের মত ভূমিকায় ছিলেন পরিবারের। এক্ষেত্রে পাত্রের বড় বোনের যদি বিভিন্ন কারণে পাত্রীকে পছন্দ না হয় এবং এ বিয়েতে সম্মত না থাকেন এবং বিয়ে হলে পাত্রের সঙ্গে বোনের সম্পর্ক থাকবে না এমন বলেন এক্ষেত্রে করণীয় কী হতে পারে। পাত্রীকে পছন্দ না করার কারণ হিসেবে যদি ধারণাবশত কঠোর দ্বীনদারিতা, পাত্রী সম্পর্কে পাত্রীপক্ষের আত্নীয় স্বজনদের বিভিন্ন নেগেটিভিটি এবং পাত্র কর্তৃক অধিক মোহরানা নির্ধারণের কোনো বিষয় থেকে থাকে যা পাত্রের বড় বোনের পছন্দনীয় কোনো কারণে না হতে পারে এমন তাহলে এক্ষেত্রে পাত্র এবং পাত্রী উভয়ের করণীয় কী হতে পারে? এবং উভয় পরিবারের বাকি সদস্যদের করণীয় কী হতে পারে? উল্লেখ্য ভাই বোনদের মাঝে পাত্র সবার ছোট এবং বড় আরও দুবোন রয়েছেন। তবে এই বোনই সবার বড় এবং তিনি পাত্রকে অনেক ভালোবাসেন। বিয়ে তো এখনও হয়নি কিন্তু রক্ত সম্পর্ক রক্ষা করা তো আবশ্যক। এক্ষেত্রে এই বিয়ের ফলে ভাইয়ের সাথে বোনের সম্পর্কে ফাটল হলে সেক্ষেত্রে করণীয় কী হতে পারে? পাত্র পাত্রী আর উভয় পরিবারের বাকিরা রাজি থাকলে বিয়ে করা উচিত হবে নাকি বড় বোনকে কনভিন্স করার চেষ্টা স্বরূপ ওনার কথামতো না হলে বিয়েতে না আগানো ভালো হবে?

Answer

পাত্রের বড় বোনের আপত্তি সত্ত্বেও বিয়ে করা যাবে কি?

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين

সংক্ষিপ্ত উত্তর

ইসলামী শরীয়তে বিবাহের বৈধতার জন্য পাত্র-পাত্রীর সম্মতি এবং অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন। পাত্রের বড় বোনের অনুমতি বিবাহের শর্ত নয়। তবে পারিবারিক সম্প্রীতি ও সম্পর্ক রক্ষার জন্য তার সাথে আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত। যদি তিনি অমূলক কারণে আপত্তি করেন এবং পাত্র-পাত্রী উভয়েই বিবাহে সম্মত হন, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ বৈধ হবে। তবে সম্পর্ক রক্ষার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া কর্তব্য।


বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. ইসলামী শরীয়তে বিবাহের শর্তাবলী

ইসলামী শরীয়তে বিবাহের মৌলিক শর্তসমূহ হলো:

১. পাত্র ও পাত্রীর সম্মতি ২. অভিভাবকের (ওলী) উপস্থিতি ও অনুমতি ৩. দুইজন সাক্ষী ৪. প্রস্তাব ও কবুল (ইজাব-ও-কবুল)

পাত্রের বড় বোন বিবাহের ওলী নন। ইসলামী আইনে পাত্রের পিতা জীবিত থাকলে তিনিই অভিভাবক। পিতার পর পর্যায়ক্রমে দাদা, ভাই, চাচা প্রমুখ অভিভাবক হন। বোন কখনোই অভিভাবক (ওলী) হিসেবে গণ্য হন না।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"لا نكاح إلا بولي" "অভিভাবক ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২০৮৫; সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১১০১)

২. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে, বিবাহের বৈধতার জন্য পাত্র ও পাত্রীর সম্মতিই প্রধান। অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হলে তা বৈধ হবে যদি পাত্র-পাত্রী সম্মত থাকে এবং মোহর নির্ধারিত হয়। তবে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)।

রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, ২৩২ পৃষ্ঠা) এ উল্লেখ আছে:

"إذا زوج الرجل نفسه بامرأة بكفء ومهر مثلها جاز" "যদি কোনো ব্যক্তি নিজেকে সমকক্ষ নারীর সাথে বিবাহ করে এবং সমপরিমাণ মোহর ধার্য করে, তবে তা বৈধ হবে।"

৩. বড় বোনের আপত্তির শরয়ী অবস্থান

পাত্রের বড় বোনের আপত্তি শরয়ীভাবে বিবাহের বাধা নয়। কারণ:

১. তিনি বিবাহের অভিভাবক (ওলী) নন ২. বিবাহের বৈধতার জন্য তার সম্মতি শর্ত নয় ৩. তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ শরয়ী বাধা নয়

তবে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব।

৪. সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি প্রসঙ্গে

পাত্রের বড় বোন যদি বিয়ে হলে ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক না রাখার কথা বলেন, তবে এটি ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَٰئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ" "আর যারা আল্লাহর অঙ্গীকার দৃঢ়ভাবে বাঁধার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যা সম্পর্ক বজায় রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই লানত এবং তাদের জন্যই রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।" (সূরা আর-রাদ: ২৫)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"لا يدخل الجنة قاطع" "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৪; সহীহ মুসলিম: ২৫৫৬)

৫. করণীয় কী?

পাত্র ও পাত্রীর করণীয়:

১. ধৈর্য ও সহনশীলতা: বড় বোনের আপত্তির কারণগুলো শুনুন এবং বুঝার চেষ্টা করুন ২. সমঝোতার চেষ্টা: বড় বোনকে দ্বীনদার ও বিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করুন ৩. দোয়া: আল্লাহর কাছে হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন ৪. বিবাহ স্থগিত: যদি সম্ভব হয়, কিছু সময় অপেক্ষা করে বোনকে বোঝানোর চেষ্টা করুন ৫. বিবাহ সম্পন্ন: যদি বোন অমূলক কারণে আপত্তি করেন এবং পাত্র-পাত্রী উভয়েই সম্মত হন, তবে শরয়ীভাবে বিবাহ বৈধ হবে

পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের করণীয়:

১. মধ্যস্থতা: বড় বোন ও পাত্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করুন ২. বোঝানো: বড় বোনকে বোঝান যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে হারাম ৩. সহযোগিতা: উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্থাপনে সহায়তা করুন ৪. দ্বীনদার আলেমের পরামর্শ: কোনো বিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন

৬. বড় বোনের করণীয়:

১. তাকওয়া অবলম্বন: আল্লাহর ভয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করুন ২. যৌক্তিকতা: অমূলক কারণে আপত্তি না করে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করুন ৩. ভালোবাসা প্রদর্শন: ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা থাকলে তার সুখের জন্য দোয়া করুন ৪. সম্পর্ক ছিন্ন না করা: ইসলামে সম্পর্ক ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ

৭. ফাতাওয়া উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে দিকনির্দেশনা

ফাতাওয়া উসমানী (২য় খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়) তে উল্লেখ আছে যে, বিবাহের বৈধতার জন্য পাত্র-পাত্রীর সম্মতিই প্রধান। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আপত্তি বিবাহকে অগ্রহণযোগ্য করে না, তবে উত্তম হলো সবার সম্মতিতে বিবাহ করা।

ইমদাদুল ফাতাওয়া (২য় খণ্ড, ৩০২ পৃষ্ঠা) তে হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বলেছেন:

"বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর সম্মতিই মুখ্য। পরিবারের অন্য সদস্যদের আপত্তি শরয়ী বাধা নয়। তবে পারিবারিক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য তাদের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।"

৮. মোহরানা নির্ধারণ প্রসঙ্গে

পাত্র কর্তৃক অধিক মোহরানা নির্ধারণ যদি বোনের আপত্তির কারণ হয়, তবে এ বিষয়ে সমঝোতা করা যেতে পারে। ইসলামে মোহরানা নির্ধারণে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উত্তম। তবে মোহরানা নির্ধারণ পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক সম্মতির বিষয়, এতে বোনের আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"خير النكاح أيسره" "সবচেয়ে উত্তম বিবাহ হলো যার খরচ সবচেয়ে সহজ/কম।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১১৭)

তবে মোহরানা যদি পাত্রী ও তার পরিবার সম্মত হয়, তবে তা বৈধ। বোনের আপত্তি এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

১. শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে: পাত্র ও পাত্রী উভয়ে সম্মত থাকলে এবং পাত্রের পিতা (অভিভাবক) সম্মত থাকলে বিবাহ বৈধ হবে। বড় বোনের আপত্তি বিবাহের বৈধতাকে ক্ষুণ্ন করবে না।

২. নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে: পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য বড় বোনকে বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত। তবে তিনি যদি অমূলক কারণে আপত্তি করেন এবং সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দেন, তবে তা তার নিজের গুনাহ হবে।

৩. ব্যবহারিক দিক: উত্তম হলো বড় বোনকে কনভিন্স করার চেষ্টা করা। যদি সম্ভব হয়, কিছু সময় অপেক্ষা করা। কিন্তু যদি তিনি সম্পূর্ণ অমূলক কারণে আপত্তি করেন এবং পাত্র-পাত্রী উভয়েই বিবাহে আগ্রহী হন, তবে বিবাহ করা যাবে। তবে বিবাহের পরও বোনের সাথে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

৪. পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দায়িত্ব: তাদের উচিত বড় বোনকে বোঝানো যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম এবং আল্লাহর কাছে এর কঠিন শাস্তি রয়েছে। পাশাপাশি পাত্র-পাত্রীকে ধৈর্য ধরতে এবং বোনের সাথে সদ্ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা।


দলিলসমূহ

কুরআন থেকে:

"وَإِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا" "আর যদি তারা (স্বামী-স্ত্রী) মিল-মীমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলিয়ে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)

"فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ" "তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে মীমাংসা কর।" (সূরা আল-আনফাল: ১)

হাদীস থেকে:

"ما كان الرفق في شيء إلا زانه، وما نزع من شيء إلا شانه" "যে বিষয়ে নম্রতা থাকে তা সুশোভিত হয়, আর যে বিষয় থেকে নম্রতা দূর হয় তা কলুষিত হয়।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৯৪)

"من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليصل رحمه" "যে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহীহ বুখারী: ৬১৩৮)


উপসংহার

পাত্রের বড় বোনের অমূলক আপত্তি সত্ত্বেও যদি পাত্র-পাত্রী উভয়ে বিবাহে সম্মত হন এবং পাত্রের পিতা (অভিভাবক) সম্মত থাকেন, তবে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ বৈধ। তবে উত্তম হলো বোনকে বোঝানোর চেষ্টা করা এবং পারিবারিক সম্প্রীতি রক্ষা করা। বোনের সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী এবং এটি তার নিজের জন্য গুনাহের কারণ হবে।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.