"এ বাসায় থাকতে হলে খেতে হবে আর নয়তো বাপের বাড়ি চলে যা" এভাবে বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
কিছুদিন আগে আমার স্বামীর কথায় আমি কষ্ট পাই।তারপর আমি ভাত সম্পূর্ণ একদিন খাওয়া অফ রাখি কষ্টে, আমার স্বামী এজন্য আমাকে বলেছে, এ বাসায় থাকতে হলে খেতে হবে আর নয়তো বাপের বাড়ি চলে যা।
তারপর দিন সে কাজ থেকে আসার পর বলে শরম থাকলে চলে যাইতি।
তারপর আমি ব্যাগ গুছাই। ব্যাগ গুছানোর সময় বলে যা যা চলে যা, এত্ত ন্যাকামি ভাল্লাগেনা। আর বাসায় গিয়ে সব বলে দিস, আমাকে যেন ফোন দিয়ে না বলতে হয়। মানে ডিভোর্স এর ব্যাপারে।
তারপর বাসায় চলে আসার অনেকদিন যোগাযোগ অফ থাকে। তাকে যতবারই ফোন দেই। বলে সে সে আমার সাথে আর কন্টিনিউ করবেনা। বাসায় যেন বলে দেই। আমি নাকি অনেক পাকনা, এত্ত পাকনা মেয়ের সাথে সংসার করতে পারবেনা সে,২/৩ দিন যতবারই ফোন দিয়েছি সে বলেছে আমার সাথে আর কন্টিনিউ করবেনা। আমি তার কাছে মাফ চেয়ে সম্পর্ক ঠিক করি।সে তার বাসায়ও বলে দিয়েছে আমার সাথে সংসার করবেনা।আর আমার মোহরের বাকি টাকাও দিয়ে দিবে।
তারপর তার কাছে আমি মাফ চেয়ে সব ঠিক করে নেই। তারপর আমি তাকে জিজ্ঞেস করি আপনি যে কথা গুলো বলেছেন সেগুলো কি তালাকের নিয়তে বলেছেন?
উনি বলে তালাক যদি মুখে দিতাম তাহলে তালাক উচ্চারন করেই দিতাম। এভাবে দিতাম না।মানে যে কথা গুলো বলেছে তখন তালাকের নিয়ত ছিলনা। তবে দুই পরিবার বসে মোহর আদায় করে আইনি ভাবে ডিভোর্স দিবে এমন।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের বিবরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, আপনার স্বামী রাগের মাথায় কিছু কথা বলেছেন, যেমন: "এ বাসায় থাকতে হলে খেতে হবে, নয়তো বাপের বাড়ি চলে যা", "শরম থাকলে চলে যাইতি", "যা যা চলে যা, এত ন্যাকামি ভাল্লাগে না", "বাসায় গিয়ে সব বলে দিস, আমাকে ফোন দিতে হবে না" ইত্যাদি। আপনি জিজ্ঞেস করছেন যে, এই কথাগুলো দ্বারা তালাক (divorce) হয়েছে কিনা।
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
তালাকের ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি রয়েছে: ১. সরীহ (স্পষ্ট) তালাক: যে শব্দগুলো দ্বারা তালাকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যায়, যেমন: "তুমি তালাক", "আমি তোমাকে তালাক দিলাম" ইত্যাদি। এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলে নিয়ত নির্বিশেষে তালাক পতিত হয়ে যায়। ২. কিনায়া (ইঙ্গিতপূর্ণ) তালাক: যে শব্দগুলো দ্বারা সরাসরি তালাক না বুঝিয়ে ইঙ্গিত বোঝায়, যেমন: "তুমি আমার কাছে থাকতে পারবে না", "তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও", "তোমার জন্য আমি আর কিছু করতে পারবো না" ইত্যাদি। এই ধরনের শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত (intention) শর্ত। যদি নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয় না।
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান:
আপনার স্বামী যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো কিনায়া (ইঙ্গিতপূর্ণ) শব্দের অন্তর্ভুক্ত। আপনি যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছেন যে, তিনি কি তালাকের নিয়তে এই কথাগুলো বলেছেন? তখন তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, "তালাকের নিয়ত ছিল না"। তিনি আরও বলেছেন যে, তালাক দিতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করতেন।
যেহেতু আপনার স্বামী স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, তার তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই এই কথাগুলোর মাধ্যমে কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ এখনও বৈধ ও বহাল রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি এখন বলছেন "দুই পরিবার বসে মোহর আদায় করে আইনি ভাবে ডিভোর্স দিবে"। এটি একটি ইচ্ছা প্রকাশ, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি স্পষ্টভাবে তালাক উচ্চারণ না করবেন অথবা আদালতের মাধ্যমে তালাক কার্যকর না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার বিবাহ বহাল থাকবে। তবে তিনি যদি ভবিষ্যতে স্পষ্টভাবে তালাক উচ্চারণ করেন (যেমন: "আমি তোমাকে তালাক দিলাম"), তাহলে তা পতিত হবে।
হানাফি কিতাবের দলিল:
১. আল-হিদায়াহ (১ম খণ্ড, তালাক অধ্যায়): বলা হয়েছে যে, কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।
২. রদ্দুল মুহতার (শামী) (৩য় খণ্ড, তালাক অধ্যায়): ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. বলেছেন, কিনায়া শব্দগুলোতে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত অপরিহার্য। যদি স্বামী বলে যে, তার নিয়ত তালাকের ছিল না, তাহলে তার কথা বিশ্বাস করা হবে এবং তালাক পতিত হবে না।
৩. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) (১ম খণ্ড, তালাক অধ্যায়): বলা হয়েছে, যে সকল শব্দ কিনায়া হিসেবে গণ্য, সেগুলোতে নিয়ত ব্যতীত তালাক পতিত হয় না।
আপনার করণীয়:
১. যেহেতু তালাক পতিত হয়নি, তাই আপনি এবং আপনার স্বামী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বৈধ। আপনি চাইলে তার সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে পারেন। ২. তবে আপনার স্বামী যদি ভবিষ্যতে স্পষ্টভাবে তালাক উচ্চারণ করেন, তাহলে তা পতিত হবে। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকুন। ৩. আপনার স্বামী যদি আইনি ডিভোর্সের কথা বলেন, তাহলে তাকে বুঝিয়ে বলুন যে, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারণ প্রয়োজন। আইনি ডিভোর্স শরিয়তের বিকল্প নয়। ৪. সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: "আর যদি তারা (স্ত্রী-স্বামী) মিল-মিশে থাকার ইচ্ছা করে, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলিয়ে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
উপসংহার: আপনার স্বামীর বলা কথাগুলো তালাকের নিয়তে না হওয়ায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বহাল আছে। তবে ভবিষ্যতে তিনি যদি স্পষ্টভাবে তালাক উচ্চারণ করেন, তাহলে তা পতিত হবে। আল্লাহ তায়ালা আপনার সম্পর্ক ভালো করুন। আমিন।