হোয়াটসঅ্যাপে পরপর দুটি মেসেজে "তালাক" ও "না" বলার বিধান কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
তালাকের ব্যাপারে একটা প্রশ্ন ছিল। আমি আর আমার স্ত্রী হোয়াটসএপ এ কথা বলছিলাম। আমাদের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিলো। ঝগড়ার এক পর্যায়ে তাকে একটু ভরকে দেয়ার জন্য আমি পরপর দুইটা মেসেজে বলি, " ১ম মেসেজেঃ আমি তুমাকে ২য় তালাক, ২য় মেসেজেঃ দিবো না/ দিলাম না "
এই মেসেজ দুটা একদম পিঠাপিঠি সময়ে দেয়া হইসে। একটা মেসেজ করার সাথে সাথে আরেকটা মেসেজ দেয়া হইসে। এর মধ্যে কোনো টাইম গ্যাপ ছিল না। আর আমি কেবল ভরকে দেয়ার জন্যই এই মেসেজ গুলা লেখসিলাম। ( আল্লাহ আমাকে মাফ করুক , আমিন )
এখন আমাদের মধ্যে কি ২য় তালাক হয়ে গেসে? উল্লেখ্যা আমাদের মধ্য আগের একটা বৈধ তালাক ছিল।
Answer
উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনি আপনার স্ত্রীকে হোয়াটসঅ্যাপে পরপর দুটি মেসেজে বলেছেন:
১ম মেসেজ: "আমি তোমাকে ২য় তালাক"
২য় মেসেজ: "দিবো না / দিলাম না"
মূলনীতি:
ইসলামি ফিকহের (বিশেষত হানাফি মাযহাবের) নিয়ম অনুযায়ী, তালাকের ক্ষেত্রে শব্দের স্পষ্টতা (সরীহ) এবং নিয়ত (ইরাদাহ) গুরুত্বপূর্ণ। তবে তালাকের শব্দ যদি স্পষ্ট হয় (যেমন: "তালাক", "আমি তোমাকে তালাক দিলাম"), তাহলে তা উচ্চারণ করলে তালাক সংঘটিত হয়ে যায়, এমনকি যদি তা রাগের মাথায় বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তিনটি বিষয়ে (তালাক, বিবাহ, দাসমুক্তি) ঠাট্টা-তামাশা এবং গুরুত্ব সহকারে বলা সমান (অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হবে)।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৯৪; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১৮৪)
আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ:
১. আপনি প্রথম মেসেজে বলেছেন: "আমি তোমাকে ২য় তালাক" — এটি একটি স্পষ্ট তালাকের শব্দ।
২. দ্বিতীয় মেসেজে "দিবো না / দিলাম না" — এটি প্রথম মেসেজের সাথে যুক্ত হয়ে অর্থ দাঁড়ায়: "আমি তোমাকে ২য় তালাক দিলাম না" — অর্থাৎ আপনি তালাক দিতে অস্বীকার করছেন।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
হানাফি মাযহাবের ইমামদের মতে, যদি কেউ বলে: "তোমাকে তালাক দিলাম না" বা "তালাক দিবো না" — এটি তালাকের ইকরার (স্বীকৃতি) নয়, বরং তালাক অস্বীকার করা। তবে যদি প্রথমে স্পষ্ট তালাকের শব্দ বলা হয় এবং পরে "না" বলা হয়, তাহলে প্রথম শব্দটিই গণ্য হবে যদি তা স্পষ্ট হয় এবং নিয়ত তালাকের হয়। কিন্তু এখানে আপনার নিয়ত ছিল শুধু ভয় দেখানো, তালাক দেওয়ার নয়।
তবে হানাফি ফিকহের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, স্পষ্ট তালাকের শব্দ (সরীহ) উচ্চারণ করলে নিয়তের প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ আপনি যদি বলেন "আমি তোমাকে তালাক দিলাম" — এটি সরীহ শব্দ, তাই নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হবে। কিন্তু আপনি বলেছেন "আমি তোমাকে ২য় তালাক" — এটি সরীহ শব্দ, তাই নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে আপনার দ্বিতীয় মেসেজ "দিলাম না" — এটি প্রথম মেসেজের অর্থকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। অর্থাৎ আপনি প্রথম মেসেজে তালাকের কথা বললেও দ্বিতীয় মেসেজে তা ফিরিয়ে নিচ্ছেন বা অস্বীকার করছেন।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি পরপর দুটি মেসেজ পাঠিয়েছেন, যেখানে প্রথমটিতে "তালাক" শব্দ আছে এবং দ্বিতীয়টিতে "না" শব্দ আছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় মেসেজটি প্রথম মেসেজের উত্তর বা সংশোধন হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ আপনি তালাক দেননি, বরং তালাক দিতে অস্বীকার করেছেন। তাই আপনার উপর ২য় তালাক পতিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়।
তবে এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়। যেহেতু আপনি আগে একটি বৈধ তালাক দিয়েছেন, তাই বর্তমানে আপনার স্ত্রী আপনার সাথে এক তালাকের পর পুনরায় বিবাহিত রয়েছেন। এখন এই ঘটনার পরেও আপনার বিবাহ বহাল থাকবে, এবং ২য় তালাক পতিত হবে না।
তবে সতর্কতা:
ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। রাগ বা ভয় দেখানোর জন্য হলেও তালাকের শব্দ ব্যবহার করা থেকে বেঁচে থাকুন।
দলিল:
- কুরআন: "তালাক দুইবার। এরপর হয় বিধিমতো রাখা, অথবা সৌজন্যের সাথে বিদায় করা।" (সূরা বাকারা: ২২৯)
- হাদিস: "তিনটি বিষয়ে ঠাট্টা-তামাশা এবং গুরুত্ব সহকারে বলা সমান: তালাক, বিবাহ, দাসমুক্তি।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৪)
- হানাফি ফিকহ: "সরীহ শব্দে তালাক দিলে নিয়তের প্রয়োজন নেই, তবে শব্দের অর্থ স্পষ্ট হতে হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩)
উপসংহার:
আপনার উপর ২য় তালাক পতিত হয়নি। তবে আপনার স্ত্রী আপনার সাথে বৈধভাবে বিবাহিত রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তালাকের বিষয়ে সতর্ক থাকার তাওফিক দিন। আমিন।