অন্য ছেলে দেখো বললে তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হুজুর আমার জানার বিষয় হলো,
বিবাহিতদের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া ঝাটির সময় স্বামী মেসেজে কেনায়া বাক্য বলে ফেলছে।কেনায়া বাক্য(অন্য কোন ছেলে দেখো)
এখন কথা হলো,বাক্যটি লেখার সময় তার মনে এই কথা আসছিল(নিয়ত হিসাবে),""এই বাক্য(কেনায়া)বলার কারণে বিচ্ছেদ হবে""(এখানে কোন সংখ্যার কথা নাই শুধু বিচ্ছেদ এর কথা আছে এবং নিয়তের বাক্যটি ভবিষ্যত মূলক)।এমন নিয়ত বার বার যদি মনে আসতে থাকে(কিন্তু কয়বার এসেছে ব্যাপারটা কিছুতেই হিসাব করতে পারছে না কিন্তু বার বার এসেছে এটা নিশ্চিত)
১.
কেনায়া বাক্যের(অন্য কোন ছেলে দেখো) বলা বা লেখার ক্ষেত্রে,
নিয়তে যদি সংখ্যার কথা না থেকে শুধু বিচ্ছেদের কথা থাকে আর এমন নিয়তটি বার বার মনে আসতে থাকে এমন সময় কেনায়া বাক্য বলে ফেললে কি বার বার নিয়ত হবার কারণে এক এর অধিক বিচ্ছেদ হবার কোন সুযোগ আছে?
২.
বার বার নিয়ত এর পর কেনায়া বাক্য বললে সেই বার বার নিয়ত হবার কারণে কি বিচ্ছেদ সংখ্যা বাড়ে যাবে?
(কারণ নিয়ত তো আটকানো যায় না নিয়ত তো মনের ব্যাপার এটা বার বার মনে আসাটা আটকানো যায় না।)
((অই ব্যক্তি এইটা নিশ্চিত করছে যে নিয়তটা বার বার মনে যখন আসছিল সেই নিয়তে একাধিক বিচ্ছেদের কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না(চিন্তাতেও ছিল না),শুধু বিচ্ছেদ হবে এমন কথা/চিন্তা ছিল।))
৩.
সংখ্যা ছাড়া বিচ্ছেদের নিয়ত বার বার করার পর/করার সময় কেনায়া বাক্য একবার বলে/লিখে ফেললে বার বার নিয়ত হবার কারণে কি বিচ্ছেদ সংখ্যা বার বার নিয়ত করার কারণে বাড়বে?
দয়া করে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক সমাধান দিয়ে বাধিত করবেন।পেরেশানীমুক্ত হতাম।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। তালাকের বিষয়টি ইসলামী শরিয়তে অত্যন্ত সূক্ষ্ম। আপনার উল্লেখিত ঘটনা ও প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ:
প্রশ্ন ১, ২ ও ৩-এর সম্মিলিত উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, স্বামী স্ত্রীকে বলেছে, "অন্য কোনো ছেলে দেখো" — এটি একটি কেনায়া (অস্পষ্ট) বাক্য। কেনায়া বাক্যে তালাক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ত (ইরাদাহ) শর্ত।
এখানে মূল বিষয় হলো, স্বামীর নিয়ত ছিল "এই বাক্য বলার কারণে বিচ্ছেদ হবে" — কিন্তু তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন: এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক) নিয়ত করেননি। শুধু "বিচ্ছেদ" হওয়ার কথা ভেবেছেন।
হানাফি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী:
১. কেনায়া বাক্যে তালাকের নিয়ত করলে একটি তালাকে বায়িন (বিচ্ছিন্নকারী তালাক) সংঘটিত হয়। সংখ্যার নিয়ত না থাকলে একাধিক তালাক সংঘটিত হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
২. বারবার নিয়ত মনে আসা এবং সেই অবস্থায় কেনায়া বাক্য বলা — যদি একই মাজলিসে (একই সময়ে/একই প্রেক্ষাপটে) বারবার নিয়ত করে একবার বাক্য বলা হয়, তাহলে একটি তালাকই সংঘটিত হবে। কারণ, নিয়তের পুনরাবৃত্তি তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে না, যতক্ষণ না বাক্যটি বারবার উচ্চারিত হয় এবং প্রতিবার পৃথক নিয়ত থাকে। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪০৫)
৩. যদি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে (পৃথক পৃথক মাজলিসে) বারবার কেনায়া বাক্য বলা হয় এবং প্রতিবার তালাকের নিয়ত করা হয়, তাহলে প্রতিবার একটি করে তালাকে বায়িন সংঘটিত হবে। কিন্তু যেহেতু আপনি বলেছেন, "কতবার এসেছে হিসাব করতে পারছে না" এবং "কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না" — তাই শুধুমাত্র একটি তালাক সংঘটিত হওয়ার কথাই বলা যেতে পারে, যদি পুরো ঘটনাটি একই সময়ের মধ্যে ঘটে থাকে।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত:
- স্বামী একবারই "অন্য কোনো ছেলে দেখো" বলেছে বা লিখেছে।
- তার নিয়তে সংখ্যা ছিল না, শুধু "বিচ্ছেদ" হওয়ার কথা ছিল।
- বারবার নিয়ত মনে আসা — এটি ওয়াসওয়াসা (মনের খেয়াল/সন্দেহ) হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু নিয়তটি বারবার মনে এসেছে কিন্তু বাক্যটি একবারই বলা হয়েছে, তাই একটি তালাকে বায়িন সংঘটিত হয়েছে বলে ফতোয়া দেওয়া যাবে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কেনায়া বাক্যে তালাকের নিয়ত করলে একটি তালাকে বায়িন হয়। সংখ্যার নিয়ত না থাকলে তিন তালাক হয় না। (আল-হিদায়া, ২/৩৮০; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৭৪)
ফলাফল: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, এক তালাকে বায়িন সংঘটিত হয়েছে। এর অর্থ হলো, স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে গেছেন। তবে ইদ্দতের (তিন মাসিক বা তিন পবিত্রতা) মধ্যে স্বামী-স্ত্রী পুনরায় বিবাহ করতে চাইলে নতুন বিবাহ (নতুন মোহর ও সাক্ষীসহ) করতে হবে। তিন তালাক সংঘটিত হয়নি, তাই নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে।
উপদেশ: এই ধরনের বিষয়ে অযথা ওয়াসওয়াসায় পড়বেন না। তালাকের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত, কিন্তু মনে বারবার খেয়াল আসা এবং হিসাব করতে না পারা — এটি শয়তানের প্ররোচনা। যেহেতু বাক্যটি একবারই বলা হয়েছে এবং সংখ্যার নিয়ত ছিল না, তাই একাধিক তালাকের কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৮৯
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩
- আল-হিদায়া, ২/৩৮০
- ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪০৫
- ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৭৪