স্বামীর মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্তির উপায়
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ঘটনা পড়ে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন ও মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক। আল্লাহ তাআলা আপনার (সবর) বৃদ্ধি করুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান করুন। আমিন।
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার: ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আল্লাহর নির্দেশিত একটি পবিত্র বন্ধন। এই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, দয়া, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সম্মান। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً "আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রুম: ২১)
আপনার স্বামীর আচরণ ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি যে আচরণ করছেন—আপনাকে গালিগালাজ করা, চরিত্রহীনা বলা, আপনার বাবাকে অপমান করা, আপনার সন্তানদের সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা, আপনার উপর মিথ্যা অভিযোগ করা, আপনার পরিবারের সাথে যোগাযোগে বাধা দেওয়া—এসব হারাম (নিষিদ্ধ) এবং ইসলামী দৃষ্টিতে গুনাহের কাজ।
১. স্বামীর দায়িত্ব ও আপনার অধিকার
ইসলামে স্বামীর উপর স্ত্রীর কিছু অধিকার রয়েছে, যা তিনি পালন করছেন না। যেমন:
- ভালো ব্যবহার করা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি, হাদিস: ১১৬২)
- স্ত্রীর সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা:
- স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) দেওয়া: স্বামীর উপর স্ত্রীর খোরপোষ দেওয়া ফরজ। আপনি নিজের ৮০% খরচ বহন করছেন, এটি ইসলামী দৃষ্টিতে স্বামীর দায়িত্ব এড়ানোর শামিল।
আপনার স্বামী যদি আপনাকে অপমান করে, গালিগালাজ করে, মিথ্যা অপবাদ দেয়—তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (বুখারি: ১০)
২. আপনার করণীয়
আপনি যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তাতে সবর (ধৈর্য) করা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু ইসলাম ধৈর্যের নির্দেশ দিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি চুপ করে থাকবেন এবং নিজের উপর অত্যাচার হতে দেবেন। নিম্নে কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ দেওয়া হলো:
ক. শান্তভাবে কথোপকথনের চেষ্টা করুন
যদি সম্ভব হয়, এমন একটি সময়ে যখন তিনি অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকবেন, তখন তার সাথে বসে আপনার অনুভূতির কথা জানান। তাকে বলুন যে, তার এই আচরণ আপনার জন্য কতটা কষ্টকর। কুরআন ও হাদিসের আলোকে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, ইসলামে স্ত্রীর সাথে কেমন আচরণ করা উচিত।
খ. পরিবারের বা সমাজের একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির মাধ্যমে মধ্যস্থতা
যদি সরাসরি কথা বলে কাজ না হয়, তাহলে আপনার পরিবারের বা তার পরিবারের একজন বিজ্ঞ ও সম্মানিত ব্যক্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন। ইসলামে সুলহ (আপস-মীমাংসা) একটি উত্তম পদ্ধতি। আল্লাহ বলেছেন:
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ "আর আপস-মীমাংসা উত্তম।" (সূরা আন-নিসা: ১২৮)
গ. ধৈর্য ও সবর
আপনি যদি মনে করেন যে, পরিস্থিতি এখনো সহনীয় এবং তিনি একদিন বুঝতে পারবেন, তাহলে সবর করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন।" (বুখারি: ১৪৬৯)
ঘ. তালাক (বিচ্ছেদ) চাওয়ার অধিকার
যদি পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং আপনি মানসিক বা শারীরিকভাবে নির্যাতিত হন, তাহলে ইসলাম আপনাকে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক) চাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। যদি স্বামী তার দায়িত্ব পালন না করে এবং আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করে, তাহলে আপনি তার কাছ থেকে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। তবে এটি সর্বশেষ পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, যদি স্বামী স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং তার অধিকার আদায় না করে, তাহলে স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইতে পারে। (বাদায়েউস সানায়ি, ৪/১৮৭)
ঙ. আপনার সন্তানদের সুরক্ষা
আপনার সন্তানদের উপর যদি তার আচরণ খারাপ হয়, তাহলে তাদের সুরক্ষা দেওয়া আপনার দায়িত্ব। তাদের সাথে এমনভাবে কথা বলুন যাতে তারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
৩. কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী নির্দেশনা
- গীবত ও অপবাদ থেকে বিরত থাকুন: আপনার স্বামী আপনাকে যে অপবাদ দিচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আপনি জানেন, আল্লাহ সব জানেন। আপনার উপর জুলুম করা হলে আল্লাহর কাছে তার হিসাব থাকবে।
- নামাজ ও দুআ: আপনার জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো নামাজ ও দুআ। ফজরের সময়, তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহর কাছে আপনার স্বামীর হেদায়েতের জন্য দুআ করুন। আল্লাহ দুআ কবুল করেন।
- আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করা: আপনার স্বামী যদি আপনার পরিবারের সাথে যোগাযোগে বাধা দেয়, তবে এটি ইসলামী দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ফরজ। আপনি চেষ্টা করুন গোপনে হলেও আপনার বাবার খোঁজখবর নিতে।
৪. বিচ্ছেদের আগে চিন্তা করুন
তালাক ইসলামে ঘৃণিত কিন্তু জায়েজ একটি কাজ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল কাজ হলো তালাক।" (আবু দাউদ: ২১৭৮)
তাই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালোভাবে চিন্তা করুন। যদি মনে করেন যে, আপনার ধৈর্য ও প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তাহলে চেষ্টা করুন। কিন্তু যদি পরিস্থিতি অসহনীয় হয় এবং আপনার ধর্মীয় ও মানসিক নিরাপত্তা বিপন্ন হয়, তাহলে খুলা বা বিচ্ছেদ চাওয়া আপনার জন্য জায়েজ।
৫. আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ
- আপনি একজন ধৈর্যশীল ও সহনশীল নারী। আপনার এই গুণাবলি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়। আল্লাহ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
- আপনার সন্তানদের জন্য আপনি দোয়া করুন। তাদের ভালোভাবে গড়ে তুলুন। তাদের জন্য আপনি একজন আদর্শ মা।
- আপনার বাবার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন। তাকে সম্মান করুন। আপনার স্বামী যদি তাকে অপমান করে, তবে আপনি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, ইসলামে শ্বশুরকে সম্মান করা জরুরি।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার স্বামী কখনোই পরিবর্তন হবে না এবং আপনার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তাহলে আপনি একজন আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করে খুলা (বিচ্ছেদ) চাইতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত, তাই ভালোভাবে চিন্তা করে নিন।
আল্লাহ তাআলা আপনার সমস্যার সমাধান করুন। আমিন।