বিয়েতে শুধুমাত্র দ্বীনদারিতার জন্য কেউ প্রস্তাব দিলে তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জায়েয কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিয়ে সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন ছেলে আপনাকে শুধুমাত্র দ্বীনদারীতার জন্য বিয়ে করতে চাচ্ছে, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে পছন্দ করছে না। সে বলেছে, ব্যক্তি হিসেবে পছন্দ করলে আপনার চেয়ে সুন্দরী কাউকে বিয়ে করত। সে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য আপনাকে ভালোবাসবে বলে জানিয়েছে। এমন কাউকে বিয়ে করা ঠিক হবে কি না—এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
১. বিয়ের মূল উদ্দেশ্য
বিয়ে ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নারীকে চারটি বিষয়ের জন্য বিয়ে করা হয়: সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারিতা। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও, তবেই তুমি সফল হবে।" (বুখারী: ৫০৯০, মুসলিম: ১৪৬৬)
২. দ্বীনদারিতার গুরুত্ব
ইসলামে দ্বীনদারিতাকে বিয়ে নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হবে।
৩. ব্যক্তিগত পছন্দের গুরুত্ব
বিয়েতে পারস্পরিক আকর্ষণ ও পছন্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বিবাহের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সম্মতি অপরিহার্য। কুরআনে বলা হয়েছে:
"তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহযোগ্য (নারী-পুরুষ) তাদের বিবাহ দাও..." (সূরা আন-নূর: ৩২)
৪. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বিবাহের বৈধতার জন্য উভয় পক্ষের ইচ্ছা ও সম্মতি প্রয়োজন। তবে শুধুমাত্র দ্বীনদারিতার ভিত্তিতে বিবাহ করা নিষিদ্ধ নয়, বরং প্রশংসনীয়।
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) তে বলা হয়েছে:
"বিবাহের ক্ষেত্রে কুফু (সামঞ্জস্যতা) শর্ত। তবে দ্বীনদারিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কুফু।"
৫. আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
যে দিকগুলো বিবেচনা করা উচিত:
১. স্পষ্টতা ও সততা: ছেলেটি আপনার সাথে সৎ আছে এবং তার অনুভূতি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক।
২. ব্যক্তিগত পছন্দের অভাব: সে ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে পছন্দ করে না—এটি একটি উদ্বেগের বিষয়। বিবাহিত জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা ও আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. শুধুমাত্র দ্বীনদারিতার ভিত্তিতে বিবাহ: ইসলামে দ্বীনদারিতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিবাহের জন্য অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।
৬. ইমাম ও ফকীহগণের মতামত
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেছেন:
"বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতা প্রধান শর্ত, তবে পারস্পরিক আকর্ষণ ও মানসিক সামঞ্জস্যতাও প্রয়োজন। শুধুমাত্র দ্বীনদারিতার ভিত্তিতে বিবাহ করলে পরবর্তীতে সমস্যা হতে পারে।"
মুফতি তাকি উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন:
"বিবাহে দ্বীনদারিতা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হবে। উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন।"
৭. ব্যবহারিক পরামর্শ
১. বিবাহের পূর্বে পরামর্শ: আপনার পরিবারের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন এবং তাদের মতামত নিন।
২. ইস্তিখারা করুন: আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করুন এবং হিদায়াত প্রার্থনা করুন।
৩. আরও জানুন: ছেলেটির সম্পর্কে আরও জানার চেষ্টা করুন—তার চরিত্র, আচরণ, পারিবারিক পরিবেশ ইত্যাদি।
৪. স্পষ্ট আলোচনা: তার সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন—ভবিষ্যতে সে আপনাকে কীভাবে দেখবে, আপনার প্রতি তার আচরণ কেমন হবে ইত্যাদি।
৫. শরীয়তের দৃষ্টিতে: শরীয়তের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র দ্বীনদারিতার ভিত্তিতে বিবাহ করা জায়েয, তবে এটি সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত হবে কি না—তা আপনার বিবেচনা।
ফতোয়া
প্রশ্নকারিণীর জন্য ফতোয়া:
শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন ব্যক্তির সাথে বিবাহ করা জায়েয যিনি আপনাকে শুধুমাত্র দ্বীনদারিতার জন্য বিবাহ করতে চান। তবে এটি সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত হবে কি না, তা নির্ভর করে আপনার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, মানসিক প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার উপর।
মনে রাখবেন:
- বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা সতর্কতার সাথে নেওয়া উচিত
- দ্বীনদারিতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র মানদণ্ড নয়
- পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা বিবাহিত জীবনের ভিত্তি
- আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সিদ্ধান্ত নিন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য তিনি তোমাদের থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রূম: ২১)
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।