মজা করে ছেড়ে দিব বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বিয়ের ৬দিনের দিন যখন আমি হায়েজ অবস্থায় ছিলাম আমার স্বামী আমাকে মজা করে বলেছে এঈ আমি তোমাকে ছেড়ে দিব তোমার জন্য কাজে মন বসেনা। আসলে উনি এতো আস্তে বলেছেন যে আমি শুনিনি ছেড়ে দিব নাকি ছেড়ে দিলাম বলেছে। উনি কয়বার বলেছে তাও আমার মনে নাই।
এখন কথা হলো উনি তো না জেনে মজা করে বলেছে তাও আবার হায়েজ অবস্থায়। আমাদের কয় তালাক হয়েছে?? আমরা কি সংসার করতে পারবো
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীর হায়েজ অবস্থা এবং "মজা করে বলা" — এই দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে ফতোয়া ভিন্ন হবে।
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১. হায়েজ অবস্থায় তালাক:
হানাফি মাযহাব মতে, স্ত্রী হায়েজ অবস্থায় থাকা অবস্থায় তালাক দেওয়া গুনাহের কাজ (নিষিদ্ধ/মাকরূহ তাহরিমি), কিন্তু তালাক পড়ে যায়। অর্থাৎ, হায়েজ অবস্থায় তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে, তবে তা গুনাহের কাজ হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
২. মজা করে তালাক বলা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে করলে তা কার্যকর হয় এবং ঠাট্টা-মজা করলেও তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক এবং রজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২১৯৪; সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১১৮৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২০৩৯)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, মজা করে বা ঠাট্টা করে তালাক দিলেও তালাক পতিত হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/৯৪; আল-হিদায়া, ২/৩৭৮)
৩. "ছেড়ে দিব" বনাম "ছেড়ে দিলাম" — কোনটি তালাক?
-
"ছেড়ে দিব" (ভবিষ্যৎ কাল): এটি তালাকের ইঙ্গিতবাচক শব্দ। তবে "ছেড়ে দিব" বলা মাত্রই তালাক পতিত হয় না, বরং এটি ভবিষ্যতের ওয়াদা। যদি উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া হয়, তাহলে তা তালাকে তালিক (শর্তহীন তালাক) হিসেবে গণ্য হবে এবং সাথে সাথে তালাক পতিত হবে। কিন্তু যদি কেউ বলে "আগামীকাল ছেড়ে দিব" বা "এই মাসে ছেড়ে দিব" — তাহলে সেটি তালাকে মু'আল্লাক (শর্তসাপেক্ষ) হিসেবে গণ্য হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে পতিত হবে। তবে "ছেড়ে দিব" বললে যদি উদ্দেশ্য হয় "আমি তোমাকে তালাক দিচ্ছি" — তাহলে সাথে সাথে তালাক পতিত হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৪; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯০)
-
"ছেড়ে দিলাম" (অতীত কাল): এটি স্পষ্ট তালাকের শব্দ। "ছেড়ে দিলাম" বললে সাথে সাথে একটি তালাক পতিত হয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৪)
৪. আপনার প্রশ্নের উত্তর:
আপনি বলেছেন আপনার স্বামী বলেছেন: "এই আমি তোমাকে ছেড়ে দিব" — এটি ভবিষ্যৎ কালের শব্দ। তাই তালাক পতিত হবে না।
তবে আপনি বলেছেন "উনি এতো আস্তে বলেছেন যে আমি শুনিনি ছেড়ে দিব নাকি ছেড়ে দিলাম বলেছে" — এই ক্ষেত্রে, আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে তিনি কী বলেছেন, তাহলে মূল বিষয় হলো আপনার স্বামী নিজে কী বলেছেন এবং তার নিয়্যত কী ছিল।
৫. গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
১. আপনার স্বামীকে জিজ্ঞেস করুন তিনি আসলে কী বলেছিলেন এবং তার উদ্দেশ্য কী ছিল। ২. যদি তিনি বলেন যে তিনি "ছেড়ে দিলাম" বলেছেন এবং তার উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া ছিল, তাহলে একটি তালাকে রজ'ঈ পতিত হয়েছে। তালাকে রজ'ঈতে ইদ্দতের (তিন হায়েজ বা তিন মাস) মধ্যে স্বামী-স্ত্রী পুনরায় মিলিত হতে পারবেন — নতুন করে নিকাহ করার প্রয়োজন নেই, শুধু ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই হবে। ৩. যদি তিনি বলেন যে তিনি "ছেড়ে দিব" বলেছেন এবং তার উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া ছিল, তাহলেও একটি তালাক পতিত হয়েছে (হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী)। ৪. যদি তিনি বলেন যে তার উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া ছিল না, বরং শুধু মজা করা বা কথা বলা ছিল, তাহলে কোনো তালাক পতিত হয়নি — কারণ "ছেড়ে দিব" একটি কিনায়া (ইঙ্গিতবাচক) শব্দ, যা নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন এবং আপনার স্বামীও নিশ্চিতভাবে জানেন না, তাই আপনাদের উচিত একজন স্থানীয় মুফতির কাছে গিয়ে বিস্তারিত বলার পর ফতোয়া নেওয়া। তবে সাধারণ নিয়ম হলো:
- যদি স্বামী বলেন, "আমি তালাক দেওয়ার নিয়তে বলিনি, শুধু মজা করছিলাম" — তাহলে "ছেড়ে দিব" বলায় তালাক পতিত হবে না (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)।
- যদি স্বামী বলেন, "আমি তালাক দেওয়ার নিয়তেই বলেছিলাম" — তাহলে একটি তালাকে রজ'ঈ পতিত হয়েছে এবং ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে।
তালাকের সংখ্যা: যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন কতবার বলা হয়েছে এবং স্বামীর নিয়্যতও স্পষ্ট নয়, তাই আমরা বলব — যদি তালাক পতিত হয়েও থাকে, তবে সর্বোচ্চ একটি তালাক পতিত হয়েছে বলে গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ। কারণ সন্দেহের ক্ষেত্রে কম সংখ্যা ধরা হয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৫)
সংসার করার ব্যাপারে: যদি একটি তালাকে রজ'ঈ পতিত হয়ে থাকে, তাহলে ইদ্দতের (তিন মাস) মধ্যে স্বামী-স্ত্রী পুনরায় মিলিত হতে পারবেন। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে নতুন নিকাহ ছাড়া পুনরায় মিলিত হওয়া জায়েয হবে না।
আমাদের পরামর্শ: আপনারা দুজনেই স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত মুফতির কাছে যান এবং পুরো ঘটনা খুলে বলুন। তিনি বিস্তারিত শুনে সঠিক ফতোয়া দেবেন। ইনশাআল্লাহ।
والله أعلم بالصواب