জরিমানা আদায়ের হিসাব রাখা সংক্রান্ত
Business and Job · Hanafi
Question
- একটি কোম্পানির হিসাব নিকাশের দায়িত্ব থাকা লোককে কোম্পানির যাবতীয় হিসাব নিকাশ করতে হয়। আর কোম্পানিটা বহুমুখী(অনেক ধরণের ব্যবসার সাথে জড়িত, যেমন - ট্রাসপোর্ট, ফলের আড়ৎ,এলপিজি, পাইপ ইত্যাদি)
- এর পাশাপাশি নিজস্ব সম্পত্তির কিছু জায়গায় ভাড়া দিয়ে রেখেছেন।যাদের থেকে মাস শেষে ভাড়া আদায় করে। ভাড়া দিতে লেইট করলে প্রতিদিনের জন্য একটা জরিমানা যুক্ত হতে থাকে। এখন ভাড়া ১০০০০ টাকা হলে, মাসের নির্ধারিত ১০ তারিখে না দিতে পারলে, তা ১১ বা ১২,১৩, কিংবা আরো দেরিতে দিলে একটা জরিমানা যুক্ত হতে থাকে। ধরেন ১৬ তারিখ পর্যন্ত ভাড়া ও জরিমানাসহ ১০৬০০ টাকা দিতে হলো।
- প্রশ্ন - ১. এই জরিমানা স্বরুপ - ৬০০ টাকা যদি বকেয়া টাকার উপর সুদ হয়ে থাকে, তবে কোম্পানির যাবতীয় হিসাব নিকাশকারী হিসেবে নিয়োজিত ব্যক্তি যিনি অন্যান্য হিসেবের পাশাপাশি এই ভাড়ার হিসাবটা রাখতেও অবাধ্য, সে কি ব্যাংকারদের মতো সুদের হিসাবকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না?
- প্রশ্ন - ২. যদি হয়ে থাকে, তবে অন্য অনেক জায়গায় চাকরি চেষ্টা করেও না পেয়ে বাধ্য হয়ে এই জায়গায় চাকরি করাটা জায়েজ হবে কিনা?
হযরত দয়া করে উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
প্রশ্ন ১: জরিমানা আদায়ের হিসাব রাখা কি সুদের হিসাবকারীর অন্তর্ভুক্ত হবে?
উত্তর: আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তর হলো—আপনি যে জরিমানার কথা উল্লেখ করেছেন, তা যদি প্রকৃতপক্ষে বকেয়া ভাড়ার উপর নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের শর্ত হয়, তবে তা সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হবে। কেননা ভাড়া বিলম্বে পরিশোধের কারণে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা ইসলামী শরীয়তে সুদ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আপনি শুধুমাত্র হিসাবকারী হিসেবে নিয়োজিত। আপনি নিজে জরিমানা ধার্য করেন না, বরং কোম্পানির পক্ষ থেকে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী হিসাব রাখেন। ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, যে ব্যক্তি নিজে সুদ লেনদেন করে না, বরং শুধুমাত্র হিসাবকারী বা লেখক হিসেবে কাজ করে, তার জন্য এ কাজ জায়েয আছে কি না—এ বিষয়ে ফিকহবিদদের মতভেদ রয়েছে।
কুরআন ও হাদীসের দলীল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩০)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সুদ খাওয়াকারী, সুদ দাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের উপর লানত করেছেন এবং বলেছেন তারা সবাই সমান।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)
এই হাদীসের ভিত্তিতে ফিকহবিদগণ বলেছেন—সুদের লেনদেনের সাথে যুক্ত হওয়া (লেখক, সাক্ষী, সহায়ক হিসেবে) সম্পূর্ণ হারাম। তবে প্রশ্ন হলো—হিসাবকারী কি "كاتب" (লেখক) এর অন্তর্ভুক্ত হবেন?
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (আল-দুররুল মুখতার)-এ উল্লেখ আছে:
"এবং সুদের লেখক ও সাক্ষী হওয়া হারাম, কারণ তারা সুদ লেনদেনে সহায়তা করে।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৭৮)
তবে আল-হিদায়া-তে বলা হয়েছে:
"সুদী লেনদেনের দলিল লেখা বা হিসাব রাখা হারাম, যদি তা সরাসরি সুদ লেনদেনের সাথে জড়িত থাকে।"
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশ্লেষণ:
১. আপনার কাজের প্রকৃতি: আপনি কোম্পানির যাবতীয় হিসাব রাখেন। এর মধ্যে ভাড়ার হিসাবও রয়েছে, যেখানে বিলম্ব ফি (জরিমানা) যুক্ত হয়।
২. আপনার ভূমিকা: আপনি নিজে জরিমানা ধার্য করেন না, বরং কোম্পানির নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী হিসাব রেকর্ড করেন। আপনি সুদ আদায় করেন না, বরং শুধু হিসাবের বইয়ে তা লিপিবদ্ধ করেন।
৩. ফিকহী নীতি: ইসলামী ফিকহে বলা হয়েছে—যে কাজ সম্পূর্ণ হারাম (যেমন সুদ খাওয়া), তার সহায়তা করাও হারাম। কিন্তু যে কাজের মধ্যে হারাম ও হালাল মিশ্রিত (যেমন বহুমুখী কোম্পানির হিসাব), সেখানে শুধুমাত্র হারাম অংশের সহায়তা করা নিষিদ্ধ।
আমাদের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত:
আপনার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো:
১. আপনি একটি বহুমুখী কোম্পানির হিসাবকারী। কোম্পানির অনেক বৈধ ব্যবসা রয়েছে (পরিবহন, ফলের আড়ৎ, এলপিজি, পাইপ ইত্যাদি)। ২. ভাড়ার জরিমানা আদায়ের বিষয়টি কোম্পানির একটি ছোট অংশ। ৩. আপনি নিজে জরিমানা ধার্য করার সিদ্ধান্ত নেন না, বরং কোম্পানির নীতিমালা অনুযায়ী হিসাব রাখেন।
এই অবস্থায়, যদি আপনার কাজের প্রধান অংশ বৈধ হয় এবং হারাম অংশ শুধুমাত্র হিসাব রেকর্ড করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আপনি সরাসরি "সুদের লেখক" (كاتب الربا) হিসেবে গণ্য হবেন না। কারণ আপনি সুদ লেনদেনের দলিল তৈরি করেন না, বরং কোম্পানির আর্থিক লেনদেনের হিসাব রাখেন, যার মধ্যে কিছু লেনদেন সুদী হতে পারে।
তবে সতর্কতা: আপনার পক্ষ থেকে চেষ্টা করা উচিত যে, এই জরিমানার হিসাব রাখা এড়িয়ে চলুন। যদি সম্ভব হয়, অন্য কাউকে এই অংশের দায়িত্ব দিন অথবা কোম্পানির ব্যবস্থাপনাকে বোঝান যে, এই জরিমানা ইসলামী শরীয়তসম্মত নয়।
প্রশ্ন ২: বাধ্য হয়ে এই চাকরি করা জায়েয হবে কি না?
উত্তর: আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো—যদি আপনি অন্য কোনো বৈধ চাকরি না পান এবং এই চাকরিই আপনার আয়ের একমাত্র উৎস হয়, তবে এই অবস্থায় চাকরি করা জায়েয হবে।
দলীল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ﴾ "যে ব্যক্তি বাধ্য হয় (নিষিদ্ধ বস্তু খেতে), সে অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালঙ্ঘন না করলে তার কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৩)
হানাফী ফিকহের নীতি:
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"যদি কোনো ব্যক্তি হারাম কাজে নিয়োজিত থাকে এবং সে অন্য কোনো বৈধ উপায়ে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ না পায়, তবে সে ঐ পরিমাণ কাজ করতে পারবে যা তার জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে হারাম কাজে সম্পূর্ণ অংশগ্রহণ করা যাবে না।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৫)
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্তসমূহ:
১. যতটুকু সম্ভব হারাম কাজ এড়িয়ে চলুন। যদি সম্ভব হয়, ভাড়ার জরিমানার হিসাব রাখার দায়িত্ব অন্য কাউকে দিন অথবা কোম্পানির ব্যবস্থাপনাকে বোঝান যে, এই জরিমানা ইসলামী শরীয়তসম্মত নয়।
২. আপনার মূল বেতন বৈধ। আপনি যে বেতন পান, তা আপনার কাজের বিনিময়ে। এই বেতন বৈধ, কারণ আপনার কাজের প্রধান অংশ বৈধ ব্যবসার হিসাব রাখা।
৩. জরিমানার অর্থ থেকে আপনি কোনো সুবিধা নিচ্ছেন না। আপনি শুধু হিসাব রাখেন, জরিমানার অর্থ আপনার কাছে যায় না।
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
আপনার বেতন বৈধ হবে, তবে শর্ত হলো—আপনার কাজের প্রধান অংশ বৈধ হতে হবে। যেহেতু কোম্পানির প্রধান ব্যবসাগুলো বৈধ (পরিবহন, ফলের আড়ৎ, এলপিজি, পাইপ), তাই আপনার বেতন বৈধ হবে। তবে ভাড়ার জরিমানার হিসাব রাখার কারণে আপনি গুনাহগার হবেন কি না—এই বিষয়ে ফিকহবিদদের মতভেদ রয়েছে। তবে যতটুকু সম্ভব হারাম কাজ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন।
উপসংহার:
১. আপনি সরাসরি "সুদের হিসাবকারী" হিসেবে গণ্য হবেন না, কারণ আপনি নিজে সুদ লেনদেন করেন না, বরং কোম্পানির বহুমুখী ব্যবসার হিসাব রাখেন, যার মধ্যে একটি অংশ জরিমানা আদায়ের সাথে জড়িত।
২. বাধ্য হয়ে এই চাকরি করা জায়েয হবে।
৩. আপনার বেতন বৈধ, কারণ আপনার কাজের প্রধান অংশ বৈধ ব্যবসার হিসাব রাখা।
সূত্রসমূহ:
- কুরআনুল কারীম (সূরা আলে ইমরান: ১৩০, সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৩)
- সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ৫/১৭৮, ৬/৩৮৫
- আল-হিদায়া (মারগীনানী)
- ফাতাওয়া আলমগীরী: ৫/৩৫৫
- আল-মাবসুত (সারাখসী): ১৪/১০৫
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তাওফীক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب