কোম্পানির হিসাব নিকাশে জরিমানা যুক্ত করা

Business and Job · Hanafi

Question No: 3969
Questioner: Saidul
Question Asked: 14 Aug 2026, 07:43 PM
Reviewed & Published: 14 Aug 2026, 07:51 PM
Views: 27
Tokens: 6,733
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মুফতি সাহেবের কাছে প্রশ্ন -
- একটি কোম্পানির হিসাব নিকাশের দায়িত্ব থাকা লোককে কোম্পানির যাবতীয় হিসাব নিকাশ করতে হয়। আর কোম্পানিটা বহুমুখী(অনেক ধরণের ব্যবসার সাথে জড়িত, যেমন - ট্রাসপোর্ট, ফলের আড়ৎ,এলপিজি, পাইপ ইত্যাদি)
- এর পাশাপাশি নিজস্ব সম্পত্তির কিছু জায়গায় ভাড়া দিয়ে রেখেছেন।যাদের থেকে মাস শেষে ভাড়া আদায় করে। ভাড়া দিতে লেইট করলে প্রতিদিনের জন্য একটা জরিমানা যুক্ত হতে থাকে। এখন ভাড়া ১০০০০ টাকা হলে, মাসের নির্ধারিত ১০ তারিখে না দিতে পারলে, তা ১১ বা ১২,১৩, কিংবা আরো দেরিতে দিলে একটা জরিমানা যুক্ত হতে থাকে। ধরেন ১৬ তারিখ পর্যন্ত ভাড়া ও জরিমানাসহ ১০৬০০ টাকা দিতে হলো।
- প্রশ্ন - ১. এই জরিমানা স্বরুপ - ৬০০ টাকা যদি বকেয়া টাকার উপর সুদ হয়ে থাকে, তবে কোম্পানির যাবতীয় হিসাব নিকাশকারী হিসেবে নিয়োজিত ব্যক্তি যিনি অন্যান্য হিসেবের পাশাপাশি এই ভাড়ার হিসাবটা রাখতেও অবাধ্য, সে কি ব্যাংকারদের মতো সুদের হিসাবকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না?
- প্রশ্ন - ২. যদি হয়ে থাকে, তবে অন্য অনেক জায়গায় চাকরি চেষ্টা করেও না পেয়ে বাধ্য হয়ে এই জায়গায় চাকরি করাটা জায়েজ হবে কিনা?
হযরত দয়া করে উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।

Answer

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রশ্ন ১: জরিমানা আদায়কারী হিসাবরক্ষক কি সুদের হিসাবকারীর অন্তর্ভুক্ত হবেন?

উত্তর: আপনার প্রশ্নের উত্তর হলো—ভাড়া দেরিতে দেওয়ার কারণে যে জরিমানা ধার্য করা হয়, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, মূল ভাড়ার অতিরিক্ত কোনো অর্থ আদায় করা, যা বিলম্বের কারণে ধার্য হয়, তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। এটি রিবা আল-জাহিলিয়্যাহ-এর মতো, যেখানে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হলে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো।

কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি (হিসাবরক্ষক) যদি শুধুমাত্র কোম্পানির হিসাব নিকাশের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন এবং তিনি এই জরিমানা আদায়ের নীতি নির্ধারণ করেন না, বরং কোম্পানির নির্ধারিত নীতি অনুযায়ী হিসাব লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে তিনি সরাসরি সুদের লেনদেনে জড়িত হবেন না। তবে তাকে সুদী লেনদেনের সহায়ক হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, যা গুনাহের কাজে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ খাওয়াকারী, সুদ দাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষীদের উপর লানত করেছেন এবং বলেছেন তারা সবাই সমান।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)

এই হাদীসে সুদের লেনদেনের লেখক (كاتب)-কে সুদখোরের সমান বলা হয়েছে। তবে এখানে "লেখক" বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যে সুদী চুক্তি সম্পাদনে সরাসরি সহায়তা করে, যেমন—সুদী দলিল লেখা, সুদের হিসাব তৈরি করা ইত্যাদি।

হানাফী ফিকহের আলোকে:

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:

"সুদী লেনদেনের সহায়ক হওয়া, যেমন—সুদী দলিল লেখা, সাক্ষী থাকা, বা সুদের হিসাব রাখা—সবই হারাম এবং গুনাহের কাজ।"

তবে যদি কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র সাধারণ হিসাবরক্ষক হিসেবে নিয়োজিত থাকে এবং তার কাজের মধ্যে সুদী লেনদেনের হিসাব রাখাও অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু তার মূল দায়িত্ব হলো কোম্পানির সার্বিক হিসাব নিকাশ, তাহলে:

১. যদি তার কাজের একটি অংশ সুদী লেনদেনের হিসাব রাখা হয়, তাহলে তিনি সুদী কাজে সহায়তা করছেন, যা গুনাহের কাজ।

২. তবে যদি তিনি এই জরিমানা আদায়ের নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ না করেন এবং শুধুমাত্র কোম্পানির নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হিসাব লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে তার গুনাহ কিছুটা কম হবে, কিন্তু সম্পূর্ণ দায়মুক্তি থাকবে না।


প্রশ্ন ২: অন্য চাকরি না পেয়ে বাধ্য হয়ে এই চাকরি করা জায়েজ হবে কি?

উত্তর: যদি ব্যক্তি সত্যিই অন্য কোনো হালাল চাকরি খুঁজে না পায় এবং এই চাকরিই তার একমাত্র উপার্জনের উৎস হয়, তাহলে নিম্নোক্ত শর্তে এই চাকরি করা জায়েজ হতে পারে:

১. সুদী লেনদেনের হিসাব রাখা থেকে বিরত থাকা: তিনি যদি কোম্পানির অন্যান্য বৈধ ব্যবসার হিসাব রাখেন এবং সুদী জরিমানার হিসাব রাখা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন, তাহলে তার জন্য এই চাকরি করা জায়েজ হবে।

২. প্রতিবাদ ও অসন্তোষ প্রকাশ: তিনি যদি কোম্পানির এই সুদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং যতটুকু সম্ভব এই কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেন, তাহলে তার জন্য এই চাকরি করা জায়েজ হতে পারে।

৩. অন্য চাকরির সন্ধান অব্যাহত রাখা: তিনি যত দ্রুত সম্ভব অন্য হালাল চাকরির সন্ধান করতে থাকবেন এবং এই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

সংক্ষিপ্ত ফতোয়া

প্রশ্ন ১: যে ব্যক্তি কোম্পানির হিসাবরক্ষক হিসেবে নিয়োজিত এবং তার দায়িত্বে ভাড়ার জরিমানার হিসাব রাখাও অন্তর্ভুক্ত, তিনি যদি এই জরিমানা আদায়ের নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ না করেন এবং শুধুমাত্র কোম্পানির নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হিসাব লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে তিনি সরাসরি সুদের লেখক হিসেবে গণ্য হবেন না। তবে তিনি সুদী লেনদেনের সহায়ক হিসেবে গণ্য হবেন, যা গুনাহের কাজ। তাকে উচিত এই কাজ থেকে বিরত থাকা এবং কোম্পানিকে এই সুদী প্রথা বন্ধ করতে পরামর্শ দেওয়া।

প্রশ্ন ২: যদি ব্যক্তি সত্যিই অন্য কোনো হালাল চাকরি খুঁজে না পায় এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকে, তাহলে সাময়িকভাবে এই চাকরি করা জায়েজ হতে পারে, তবে শর্ত হলো:

  • তিনি যতটুকু সম্ভব সুদী লেনদেনের হিসাব রাখা থেকে বিরত থাকবেন
  • তিনি অন্য হালাল চাকরির সন্ধান অব্যাহত রাখবেন
  • তিনি কোম্পানির সুদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবেন

দলিলসমূহ

কুরআন থেকে:

  1. সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫-২৭৯ (সুদের হারাম হওয়া)
  2. সূরা আল-মায়িদাহ: ২ (পাপের কাজে সহযোগিতা নিষিদ্ধ)
  3. সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৩ (বাধ্য অবস্থার বিধান)

হাদীস থেকে:

  1. সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮ (সুদের লেখক ও সাক্ষীদের লানত)
  2. সহীহ বুখারী: ২০৮৫ (সুদের বিভিন্ন প্রকার)

হানাফী কিতাব থেকে:

  1. রাদ্দুল মুহতার - ইমাম ইবনে আবিদীন
  2. ফাতাওয়া আলমগীরী
  3. ফাতাওয়া উসমানী - মুফতী তাকী উসমানী
  4. ইমদাদুল ফাতাওয়া - মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
  5. বেহিশতী জেওর - মাওলানা আশরাফ আলী থানভী

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.