সম্পত্তি বন্টন কিভাবে হবে

Family Life · Hanafi

Question No: 3940
Questioner: Abdullah
Question Asked: 14 Aug 2026, 01:46 AM
Reviewed & Published: 14 Aug 2026, 02:35 AM
Views: 9
Tokens: 8,248
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আম্মুর স্বর্ণ গহনা রয়েছে। আমার বিয়েতে মোহরনা পরিশোধ এর জন্য সেখান থেকে আমাকে কিছু দিয়েছে, এছাড়া আমার আহলিয়াকে কিছু দিয়েছে। আমার বোনের বিয়েতে বোনের জামাই কে কিছু স্বর্ণ গহনা হাদিয়ে হিসেবে দিয়েছে। আম্মুর কাছে নিজস্ব আরও কিছু রয়েছে।

১/ এখন স্বর্ণের বন্টনের ক্ষেত্রে কি আগের যে স্বর্ণ আমাকে এবং আমার বোনের জামাই কে যেগুলো দিয়েছে সেগুলো সহ হিসাব করতে হবে বন্টনের?

আমাদের একটা জায়গা আছে যেটা আব্বু বিদেশ থাকার কারণে আম্মুর নামে নেওয়া হয়েছে পরবর্তীতে যদি বিক্রি করা লাগে যাতে সহজে বিক্রি করতে পারে সেজন্য। জায়গা আব্বুর টাকায় কিনা হয়েছে।

২/ বর্তমানে এই জায়গা বিক্রি করে একটা ব্যবসা শুরু করতে চাচ্ছে পরিবার থেকে আমার জন্য, এর জায়গার বন্টন কিভাবে হবে?

৩/আব্বুর নামে যে সকল জায়গা আছে সকল সম্পত্তির বন্টন কিভাবে হবে? যে জায়গা ঘর আছে সে জায়গা সহ। এবং আব্বুর নামের সম্পত্তি থেকে আমার ব্যবসা করার জন্য জায়গা বিক্রি করলে তার বন্টন কিভাবে হবে।

যেহেতু প্রয়োজনে স্বর্ণ এবং জায়গা বিক্রি করছে এক্ষেত্রে বোনের ভাগ কি পরিমাণ হবে বন্টন কিভাবে করবে তা জানার জন্য। উল্লেখ্য আব্বু, আম্মু দুইজনে জীবিত এবং এগুলো যেহেতু আমার ব্যবসা করার জন্য বিক্রি সেক্ষেত্রে কোন ভাবে বোনের সাথে অবিচার যাতে না হতে হয়, সে জন্য জেনে নেওয়া।

৪/ আমার নানুর কিছু স্বর্ণ গহনা রয়েছে সেগুলো তিনি আমাদের দিতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে কি এগুলো নেওয়া কি ঠিক হবে? উনার আরও ছেলে মেয়ে রয়েছেন।

নানু সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পূর্ণ৷ নানুর সেবা যত্ন করার জন্য এবং উনার কাছে থাকার জন্য আমরা ছিলাম, আছি। সে জন্য হাদিয়া হিসেবে আমাদের দিতে চাচ্ছেন।

Answer

সম্পত্তি বন্টন সংক্রান্ত ইসলামী বিধান


প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার প্রশ্নে মূলত ৪টি বিষয় রয়েছে:

  1. মায়ের স্বর্ণালঙ্কার বন্টনের ক্ষেত্রে পূর্বে দেওয়া উপহার/মোহরানা হিসাব করা হবে কি না
  2. মায়ের নামে থাকা জমি (যা আব্বুর টাকায় কেনা) বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করলে বন্টন কীভাবে হবে
  3. আব্বুর নামে থাকা সকল সম্পত্তির বন্টন পদ্ধতি
  4. নানুর স্বর্ণালঙ্কার হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ কি না

১ম প্রশ্নের উত্তর: মায়ের স্বর্ণালঙ্কার বন্টন

মূলনীতি: ইসলামী শরীয়তে মৃত্যুর পর সম্পত্তি বন্টন করা হয়। জীবিত অবস্থায় কেউ তার সম্পত্তি নিজ ইচ্ছায় কাউকে দিতে পারেন, যা হিবা (দান) বা হাদিয়া (উপহার) হিসেবে গণ্য হবে।

আপনার মা জীবিত থাকা অবস্থায় আপনাকে এবং আপনার বোনের জামাইকে যে স্বর্ণ দিয়েছেন, তা হাদিয়া/হিবা হিসেবে গণ্য হবে। এটি মৃত্যুর পর সম্পত্তি বন্টনের সময় আর হিসাব করা হবে না। কারণ:

  • জীবিত অবস্থায় মা তার ইচ্ছায় যা দিয়েছেন তা তার পূর্ণ মালিকানা থেকে দিয়েছেন
  • এটি দান সম্পন্ন হয়ে গেছে, ফেরত নেওয়ার বিধান নেই (নিকটাত্মীয়কে দেওয়া হাদিয়া ফেরত নেওয়া নিষিদ্ধ)

তবে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: যদি মা তার সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করে থাকেন (যেমন: একজনকে বেশি, অন্যজনকে কম দিয়েছেন) এবং এর মাধ্যমে সন্তানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে, তবে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমরা সন্তানদের মধ্যে দান-উপহারে সমতা রক্ষা করো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৫৮৭)

আপনার ক্ষেত্রে: আপনার মা আপনাকে মোহরানা পরিশোধের জন্য এবং আপনার স্ত্রীকে কিছু দিয়েছেন, আর আপনার বোনের জামাইকে হাদিয়া দিয়েছেন। এটি যদি মায়ের নিজস্ব ইচ্ছায় হয়ে থাকে এবং এতে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্যের উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তা বৈধ। কিন্তু মৃত্যুর পর বন্টনের সময় এগুলো আর হিসাবের মধ্যে আনতে হবে না


২য় ও ৩য় প্রশ্নের উত্তর: জমি ও সম্পত্তি বন্টন

ক. মায়ের নামে থাকা জমি (আব্বুর টাকায় কেনা)

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, জমিটি আব্বুর টাকায় কেনা হয়েছে কিন্তু আব্বু বিদেশে থাকার কারণে মায়ের নামে নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত আব্বুর সম্পত্তি। কারণ:

  • সম্পত্তি কার নামে আছে তা নয়, বরং কার টাকায় কেনা হয়েছে তা বিবেচ্য
  • মা শুধুমাত্র নামে মালিক, প্রকৃত মালিক আব্বু

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণে ক্রয়ের অর্থ কে দিয়েছে তা বিবেচ্য।

তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়: যদি মা দাবি করেন যে, আব্বু তাকে এই জমি হিবা/দান করেছেন, তবে তা মায়ের সম্পত্তি হবে। কিন্তু যদি তা প্রমাণিত না হয় যে, আব্বু তাকে দান করেছেন, বরং শুধুমাত্র সুবিধার জন্য নামে নেওয়া হয়েছে, তবে তা আব্বুর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে।

খ. আব্বুর নামে থাকা সকল সম্পত্তির বন্টন

মূলনীতি: যতক্ষণ পর্যন্ত আব্বু ও আম্মু জীবিত, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি বন্টন করার কোনো সুযোগ নেই। সম্পত্তি বন্টন হয় মৃত্যুর পর

কিন্তু জীবিত অবস্থায় আব্বু চাইলে তার সম্পত্তি থেকে সন্তানদের মধ্যে বন্টন করতে পারেন (হিবা হিসেবে), তবে তাতে সাম্য রক্ষা করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা পছন্দ করেন।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫৪২)

গ. আব্বুর সম্পত্তি থেকে ব্যবসার জন্য জমি বিক্রি

আপনি যদি আব্বুর সম্পত্তি থেকে কিছু জমি বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করতে চান, তবে:

  1. আব্বুর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক
  2. আব্বু জীবিত থাকা অবস্থায় তার সম্পত্তি থেকে কাউকে দেওয়া হিবা হিসেবে গণ্য হবে
  3. যদি আব্বু আপনাকে ব্যবসার জন্য জমি দিতে চান, তবে বোনের সাথেও সমতা রক্ষা করা উচিত (অর্থাৎ বোনকেও সমান মূল্যের কিছু দেওয়া বা তার সম্মতি নেওয়া)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"পিতা যদি সন্তানদের মধ্যে কোনো একজনের সাথে বৈষম্য করে, তবে তা গুনাহের কাজ, যদিও তা কার্যকর হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৪২৪)

ঘ. মৃত্যুর পর বন্টনের নিয়ম

যদি আব্বু মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার সম্পত্তি নিম্নরূপ বন্টিত হবে:

| উত্তরাধিকারী | অংশ | |---|---| | স্ত্রী (আম্মু) | ১/৮ (যদি সন্তান থাকে) | | ছেলে | অবশিষ্টের ২/৩ (প্রতিটি ছেলে) | | মেয়ে | অবশিষ্টের ১/৩ (প্রতিটি মেয়ে) |

বিস্তারিত: ছেলে ও মেয়ে একত্রে থাকলে, ছেলে পাবে মেয়ের দ্বিগুণ। (সূরা আন-নিসা: ১১)


৪র্থ প্রশ্নের উত্তর: নানুর স্বর্ণালঙ্কার গ্রহণ

নানুর হাদিয়া গ্রহণ করা বৈধ কি না?

উত্তর: নানু যদি সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন হন এবং নিজ ইচ্ছায় আপনাকে হাদিয়া দিতে চান, তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলো লক্ষণীয়:

  1. নানু সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী - আপনি উল্লেখ করেছেন তিনি সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পূর্ণ, তাই তার দান বৈধ
  2. নানুর নিজস্ব সম্পত্তি - এটি নানুর নিজস্ব সম্পত্তি হতে হবে
  3. অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি না করা - নানু যদি তার সকল সন্তানকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আপনাকে দেন, তবে তা বৈষম্যমূলক হবে

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এর মতে, দাদী/নানী তার সম্পত্তি থেকে যতটুকু ইচ্ছা দান করতে পারেন, তবে উত্তম হলো সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা।

তবে সতর্কতা: নানুর যদি ছেলে-মেয়ে থাকে এবং তিনি শুধুমাত্র আপনাকে দিতে চান, তবে এতে অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের মনে কষ্ট হতে পারে। তাই উত্তম হলো:

  • নানু যদি জীবিত অবস্থায় দিতে চান, তবে তিনি যেন সকল নাতি-নাতনির মধ্যে সমতা রক্ষা করেন
  • অথবা নানু যদি মৃত্যুর পরের কথা ভাবেন, তবে ওসিয়ত হিসেবে দিতে পারেন (১/৩ অংশের বেশি নয়)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার সন্তানদের মধ্যে দানে বৈষম্য না করে।" (মুসনাদে আহমাদ)


বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নোট

১. জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বন্টন

যতক্ষণ পর্যন্ত আব্বু ও আম্মু জীবিত, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি বন্টন করা যাবে না। বন্টন তো মৃত্যুর পরই হবে। জীবিত অবস্থায় যা দেওয়া হয় তা হিবা/দান

২. ব্যবসার জন্য জমি বিক্রির ক্ষেত্রে

আপনি যদি ব্যবসার জন্য জমি বিক্রি করতে চান, তবে:

  • আব্বুর সম্পত্তি থেকে জমি বিক্রি করলে আব্বুর অনুমতি নিন
  • বোনের অংশ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে আলোচনা করুন
  • বোনকে তার প্রাপ্য অংশ দেওয়ার অঙ্গীকার করুন
  • লিখিতভাবে চুক্তি করা উত্তম

৩. বোনের সাথে ইনসাফ

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, বোনের সাথে যেন অবিচার না হয়। এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইসলামে ন্যায়বিচারপারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৮৪)


সংক্ষিপ্ত উত্তরসমূহ

| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | মায়ের দেওয়া স্বর্ণ কি বন্টনে হিসাব হবে? | না, জীবিত অবস্থায় দেওয়া হাদিয়া/দান হিসেবে গণ্য হবে, মৃত্যুর পর বন্টনে হিসাব হবে না | | মায়ের নামে থাকা জমি (আব্বুর টাকায় কেনা) | এটি আব্বুর সম্পত্তি, মৃত্যুর পর আব্বুর সম্পত্তি হিসেবে বন্টিত হবে | | আব্বুর সম্পত্তি থেকে ব্যবসার জন্য জমি বিক্রি | আব্বুর অনুমতি নিয়ে নিতে পারেন, তবে বোনের সাথে সমতা রক্ষা করা আবশ্যক | | নানুর হাদিয়া গ্রহণ | বৈধ, তবে নানু যেন অন্যান্য নাতি-নাতনিদের মধ্যে সমতা রাখেন |


দলিলসমূহ

কুরআন থেকে:

"আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: ছেলের অংশ মেয়ের অংশের দ্বিগুণ।" (সূরা আন-নিসা: ১১)

হাদীস থেকে:

"তোমরা সন্তানদের মধ্যে দান-উপহারে সমতা রক্ষা করো।" (সহীহ বুখারী: ২৫৮৭)

"আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা পছন্দ করেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৪২)

ফিকহের কিতাব থেকে:

"পিতা যদি সন্তানদের মধ্যে কোনো একজনের সাথে বৈষম্য করে, তবে তা গুনাহের কাজ, যদিও তা কার্যকর হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৪২৪)


সর্বশেষ পরামর্শ

১. আব্বু ও আম্মু জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের সম্পত্তি বন্টন না করে, বরং তাদের সম্মতিতে ব্যবসার ব্যবস্থা করুন ২. বোনের সাথে আলোচনা করে তার সম্মতি নিন ৩. লিখিত চুক্তি করুন যাতে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা না হয় ৪. নানুর হাদিয়া গ্রহণে কোনো সমস্যা নেই, তবে নানু যেন অন্য নাতি-নাতনিদেরও মনে রাখেন ৫. প্রয়োজনে স্থানীয় মুফতির সাথে পরামর্শ করুন


আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.