সন্তান না হলে কবিরাজের কাছে যাওয়া যাবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারিণী বোনের জন্য আমার দোয়া যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন এবং অচিরেই তার কোলে সন্তান দান করুন। (আমিন)
আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। আপনি লিখেছেন, "ওই কবিরাজ তাবিস দিছে, পানি পড়া, তেল পড়া এগুলো দিছে"।
প্রথমত: কোনো তাবিজ, পানি পড়া বা তেল পড়া যদি শিরিকি হয়, অর্থাৎ সেখানে জিন, ভূত-প্রেত, গ্রহ-নক্ষত্র বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কিছু পড়ে ফুঁক দেওয়া হয়, অথবা এমন কিছু লেখা থাকে যা কুফরি বা শিরকি, তাহলে তা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম এবং গুনাহের কাজ। এটি শিরিকের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যার সাথে কাউকে শরিক করা হয়।" (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
দ্বিতীয়ত: তবে সকল তাবিজ বা পানি পড়া শিরিক নয়। ইসলামী শরিয়তে জায়েয তাবিজ-এর অনুমতি রয়েছে। যেসব তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা সহিহ দুআ লেখা থাকে, এবং যেগুলোকে শুধুমাত্র আল্লাহর রহমতের মাধ্যম মনে করে ব্যবহার করা হয়, সেগুলো জায়েয। ইমাম আবু দাউদ রহ.-এর হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে তাবিজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন:
مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ "যে ব্যক্তি কোনো কিছু (তাবিজ) ঝুলিয়ে রাখল, তাকে সেই জিনিসেরই দায়িত্বে সোপর্দ করা হলো।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৯৩১) এই হাদিসের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম থাকে এবং তাকে আল্লাহর মাধ্যম মনে করা হয়, তবে তা জায়েয। কিন্তু যদি তাতে শিরকি কালাম বা অজ্ঞাত কিছু থাকে, তবে তা হারাম। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৪৫)
তৃতীয়ত: এখন আপনার মূল প্রশ্ন হলো, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কবিরাজের দেওয়া শিরকি জিনিস ব্যবহার করতে বাধ্য করছে, আর না করলে ছাড়াছাড়ির হুমকি দিচ্ছে। এমতাবস্থায় আপনি কী করবেন?
আপনার করণীয়:
১. সরাসরি শিরকি জিনিস ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা: যদি আপনি নিশ্চিত হন যে, ওই কবিরাজের দেওয়া জিনিসগুলোতে শিরিক আছে, তাহলে সেগুলো ব্যবহার করা আপনার জন্য হারাম। আল্লাহ তাআলার হুকুম মেনে চলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
২. স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করা: ধৈর্য সহকারে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, সন্তান আল্লাহর দান। তিনি যাকে ইচ্ছা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা রাখেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ "আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।" (সূরা আশ-শূরা: ৪৯)
৩. চিকিৎসা করানো: শিরকি কবিরাজের কাছে না গিয়ে আধুনিক চিকিৎসা করানো জরুরি। বন্ধ্যাত্বের অনেক চিকিৎসা এখন সম্ভব। ডাক্তারের কাছে গিয়ে উভয়ের (স্বামী-স্ত্রী) পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। এটি সম্পূর্ণ জায়েয এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً "তোমরা চিকিৎসা করাও, কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার ঔষধ দেননি।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭৮)
৪. দোয়া ও ইস্তিগফার: বেশি বেশি দোয়া করুন, বিশেষ করে আইয়ুব আলাইহিস সালামের দোয়া পড়ুন:
رَبِّ إِنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ "হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৩) এছাড়াও দুরূদ শরীফ, ইস্তিগফার এবং সূরা ফাতিহা পড়ে দম করার নিয়ম রয়েছে। এগুলো সম্পূর্ণ জায়েয এবং বরকতময়।
সারসংক্ষেপ: করণীয় হলো, শিরিকি জিনিস ব্যবহার না করা, স্বামীকে ভালোভাবে বোঝানো, ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া, বেশি বেশি দোয়া করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা। আল্লাহ তাআলা সব সমস্যার সমাধানকারী।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।