তোর সম্পর্ক নেই, তোর সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই না, এদ্বারা কি তালাক পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহ!
উত্তর: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী তালাক সংক্রান্ত বিধান
প্রশ্নকারী বলছেন, স্বামী যদি বারবার বলে, "তোর সাথে আমার আর সম্পর্ক নেই, তোর সাথে আমি আর সম্পর্ক রাখতে চাই না" — তাহলে কি তালাক হয়ে যায়?
হানাফী মাযহাবের মূলনীতি অনুসারে, তালাকের শব্দ দুই প্রকার:
- সরীহ (স্পষ্ট) – যেমন: "তালাক", "আমি তোমাকে তালাক দিলাম" ইত্যাদি। এসব শব্দ উচ্চারণ করলে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়।
- কিনায়াহ (অস্পষ্ট) – যেমন: "তুমি আমার কাছে নেই", "আমার তোমার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই", "আমি তোমাকে চাই না" ইত্যাদি। এসব শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত (ইরাদা) অপরিহার্য। অর্থাৎ স্বামী যদি তার কথার মাধ্যমে তালাক দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে, তাহলে এক তালাকে রাজয়ী (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) পতিত হবে। আর যদি কোনো তালাকের ইচ্ছে না থাকে, তাহলে তালাক হবে না।
উক্ত বাক্যদ্বয়ের বিধান
আপনার উল্লিখিত বাক্যগুলো — "তোর সাথে আমার আর সম্পর্ক নেই" এবং "তোর সাথে আমি আর সম্পর্ক রাখতে চাই না" — কিনায়াহ শব্দ। এগুলো সরীহ তালাকের মতো নয়। তাই:
- যদি স্বামী এসব কথা বলে তালাক দেওয়ার নিয়ত করে, তাহলে তা একটি তালাকে রাজয়ী (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) গণ্য হবে।
- যদি স্বামী শুধু রাগ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এমন কথা বলে, এবং তালাকের কোনো ইচ্ছে না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
বারবার বলা বা পুনরাবৃত্তির প্রভাব
- স্বামী যদি একই কথা বারবার বলে, প্রত্যেকবার আলাদাভাবে বিচার করা হবে। তবে প্রতিটি উচ্চারণ কিনায়াহ হওয়ায় প্রতিবারই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যদি প্রতিবার তালাকেরই নিয়ত থাকে, তাহলে প্রথমবার এক তালাক পতিত হবে। এরপর দ্বিতীয়বারের উচ্চারণে আরেক তালাক (যদি ইদ্দতের মধ্যে হয়) অথবা পরবর্তী তালাক গণনা করা হবে। তবে এক্ষেত্রে বিশদ মাসয়ালা মুফতীর নিকট জিজ্ঞাসা করা কর্তব্য।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
- নিয়তের অভাবে তালাক না হওয়া: অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাগের মাথায় অনুরূপ কথা বলা হয়, যেখানে তালাকের ইচ্ছে থাকে না। তাই সাধারণত তালাক পতিত হয় না।
- সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি: যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যায় যে স্বামী তালাক দিতেই চেয়েছেন, ততক্ষণ বিয়েকে অটুট রাখতে হবে। হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো: তালাক সাব্যস্ত হতে সন্দেহের অবকাশ থাকলে তা সাব্যস্ত হবে না।
হানাফী কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): কিনায়াহ শব্দের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার নিয়ত ছাড়া পতিত না হওয়ার বিধান বিস্তারিতভাবে বর্ণিত।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): কিনায়াহ শব্দ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এসব শব্দ তালাকের জন্য পর্যাপ্ত নয় যতক্ষণ না নিয়ত থাকে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী رح): অনুরূপ বাক্যের ক্ষেত্রে তালাক পতিত না হওয়ার ফতোয়া দেওয়া হয়েছে।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী): কিনায়াহ ও সরীহের পার্থক্য এবং নিয়তের গুরুত্ব উল্লেখিত।
উপসংহার
প্রশ্নে বর্ণিত বাক্যগুলো দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর নিয়ত জরুরি। যদি স্বামী শুধু কথা বলেছে কিন্তু তালাকের ইচ্ছে না থাকে, তাহলে কোনো তালাক হয় না। তবে বাস্তবিক অবস্থা এবং স্বামীর মানসিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে সংশ্লিষ্ট কোনো মুফতী বা আলেমের নিকট বিস্তারিত বলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিঃদ্রঃ প্রয়োজনে স্থানীয় মুফতী/আলেমের নিকট সরাসরি বিষয়টি উপস্থাপন করা উত্তম, কারণ অনেক সময় পরিস্থিতি ও নিয়তের তারতম্যের ভিত্তিতে বিধান পরিবর্তন হতে পারে।