স্ত্রীর ভরণপোষণের ওযাজিব বিধান অস্বীকার করলে কি ঈমান বাকী থাকবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: কোনো মুসলমান যদি কোনো ফরজ কাজকে অস্বীকার করে, তাহলে কি সে মুসলমান থাকে? বিশেষ করে নামাজের ফরজিয়াত অস্বীকার করা এবং স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণপোষণের ফরজিয়াত অস্বীকার করার পার্থক্য কী?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, যে কোনো ফরজ কাজকে অস্বীকার করা সর্বাবস্থায় কুফরি নয়। বরং এটি নির্ভর করে সেই ফরজটি দ্বীনের অপরিহার্য (ما علم من الدين بالضرورة) বিষয় কি না? অর্থাৎ, এমন কোনো বিধান যা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা এত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, তা অস্বীকার করলে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া স্পষ্ট।
১. নামাজের ফরজিয়াত অস্বীকার:
নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত—এগুলো দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়। এগুলোর ফরজিয়াত কুরআন-হাদিসে অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং উম্মতের ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো মুসলমান যদি নামাজের ফরজিয়াত অস্বীকার করে (অর্থাৎ বলে যে, নামাজ আবশ্যক নয়), তাহলে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়। এটি হানাফি ফিকহের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ১/২২৪; ফতোয়ায়ে উসমানী, ১/২২৫; ইমদাদুল ফতোয়া, ২/২৮৫)
২. স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণপোষণের ফরজিয়াত অস্বীকার:
স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) স্বামীর ওপর ফরজ—এটি কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি দ্বীনের অপরিহার্য (ma'lum min al-din bi al-darurah) পর্যায়ের বিষয়?
হানাফি ফকিহদের মতে, স্বামীর দায়িত্ব অস্বীকার করা কুফরি হবে না, যদি না তিনি এটি আল্লাহর হুকুম বলে মেনে না নেন। কারণ:
- এটি নামাজ, রোজার মতো সর্বজনবিদিত ফরজ নয়; অনেকে বিভিন্ন কারণে এর ব্যাখ্যায় ভুল করতে পারেন।
- স্বামী যদি বলে, "স্ত্রীর ভরণপোষণ আমার ওপর ফরজ নয়," কিন্তু তিনি এটা বলেন অজ্ঞতাবশত বা ভুল ব্যাখ্যার কারণে, তাহলে তিনি কাফির হবেন না, বরং গুনাহগার হবেন।
- তবে যদি তিনি সরাসরি আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশকে অস্বীকার করেন (যেমন বলেন, "আল্লাহ এটা ফরজ করেননি" বা "এটা কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা"), তাহলে সেই অস্বীকৃতি কুফরি হতে পারে। কিন্তু সাধারণত এ বিষয়টি ততটা স্পষ্ট নয় যতটা নামাজের ফরজিয়াত স্পষ্ট।
(সূত্র: বাদায়েউস সানায়ি, ২/৪৪; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৩০৬; ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৪৫১)
উপসংহার:
আপনার স্বামী যদি শুধু দায়িত্ব পালনে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হন, কিন্তু দায়িত্বটিকে ফরজ (আল্লাহর হুকুম) হিসেবে স্বীকার করেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন, কিন্তু কাফির হবেন না। অন্যদিকে, তিনি যদি স্পষ্টভাবে বলেন যে, "এটা আমার ওপর ফরজ নয়, আল্লাহ এটা আবশ্যক করেননি," তাহলে সেটি দ্বীনের একটি স্পষ্ট বিধানকে অস্বীকার করার নামান্তর। তবে সেক্ষেত্রেও তাকে কাফির বলার আগে তার জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। সাধারণত, স্বামীর এধরনের অস্বীকৃতি কুফরি নয়; বরং সে বড় গুনাহ করছে এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
সতর্কতামূলক পরামর্শ:
ইসলামে কাউকে কাফির বলা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তাই আপনি সরাসরি আপনার স্বামীকে কাফির বলবেন না। বরং তাকে দ্বীনের শিক্ষা বুঝানোর চেষ্টা করুন। তিনি যদি ফরজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে আপনি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদ বা অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু তাকে মুসলমানের কাতার থেকে বের করে দেওয়া উচিত নয়, যতক্ষণ না তিনি দ্বীনের কোনো অপরিহার্য বিষয়কে অস্বীকার করছেন, যা তিনি জানেন এবং মানতে অস্বীকার করছেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।