নারীর জন্য চাকরি করা জায়েজ কিনা
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি একজন শিক্ষিত ও দ্বীনদার বোন হিসেবে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তা সত্যিই চিন্তার বিষয়। আপনার দ্বীনদারি ও পর্দার প্রতি অনুরাগ দেখে আমরা খুবই খুশি। আল্লাহ তায়ালা আপনাদের এই নেক ইচ্ছাকে কবুল করুন এবং এতে বরকত দিন। (আমিন)
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: স্বামী দ্বীনদার এবং চান আপনি পর্দা করে ঘরে থাকুন, কিন্তু সমাজ, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের চাপ এবং ভবিষ্যতের আর্থিক অনিশ্চয়তার ভয়ে আপনি কিছু করার কথা ভাবছেন। অথচ ঘরে বসে যে কাজগুলো করার কথা ভাবছেন (যেমন: অনলাইন বিজনেস, রিমোট জব, ইউটিউব/ফেসবুক মনিটাইজেশন) সেগুলোর মাধ্যমেও পর্দা লঙ্ঘন বা হারামের আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপনি জানতে চান, এমতাবস্থায় আপনার করণীয় কী?
প্রথমত: পর্দা ও ঘরে থাকার মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা কুরআন মজিদে মুমিন নারীদের নির্দেশ দিয়েছেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى "আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করবে না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
এই আয়াতের ভিত্তিতে ফকিহগণ বলেছেন, নারীর মূল স্থান হলো তার ঘর। বাইরে বের হওয়া বা কাজ করা জরুরি প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। (তাফসির মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৬৫; রূহুল মা'আনি)
আপনার স্বামী দ্বীনদার এবং তিনি আপনাকে পর্দা করে ঘরে থাকার শর্তে বিয়ে করেছেন, এটি অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়। ইসলামি দৃষ্টিতে স্বামীর এই শর্ত মানা আপনার জন্য আবশ্যক এবং এতে আপনার জন্য কল্যাণ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ "তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে করিয়ে দাও।" (তিরমিজি: ১০৮৪)
যেহেতু আপনি দ্বীনদার স্বামী পেয়েছেন এবং তিনি আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই আপনার জন্য উচিত হবে তার সাথে সহযোগিতা করা এবং ঘরে থেকে পর্দা রক্ষা করা। এটি আপনার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় কল্যাণকর।
দ্বিতীয়ত: আর্থিক অনিশ্চয়তার ভয়
আপনি ভয় পাচ্ছেন যে, স্বামীর কিছু হলে আপনার কী হবে? এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক ভয়। তবে ইসলামি দৃষ্টিতে, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আপনি যদি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পর্দা রক্ষা করে ঘরে থাকেন, তবে আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য কোনো না কোনো ব্যবস্থা করবেনই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি কোনো বৈধ উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা করবেন না। বরং আপনি ঘরে বসে এমন বৈধ উপায় খুঁজতে পারেন, যাতে পর্দা লঙ্ঘন না হয় এবং হারামে জড়াতে না হয়।
তৃতীয়ত: ঘরে বসে বৈধ উপার্জনের উপায়
আপনি যে কাজগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক:
১. অনলাইন/রিমোট জব: আপনি যদি কোনো কোম্পানির সাথে যুক্ত হন, তবে সেখানে পুরুষ সহকর্মীদের সাথে কথা বলতে হবে, যা পর্দার পরিপন্থী। ইসলামি শরিয়তে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা কাজের ক্ষেত্রেও যদি পর্দা লঙ্ঘন হয়, তবে তা জায়েজ নয়। তবে যদি এমন কোনো কাজ হয় যেখানে শুধু ইমেইল বা টেক্সটের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয় এবং কোনো প্রকার ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, তবে সেটি জায়েজ হতে পারে। কিন্তু সাধারণত চাকরির ক্ষেত্রে মিটিং, ফোন কল ইত্যাদি থাকবেই, যা পর্দার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এ থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
২. ঘরে বসে বিজনেস: আপনি ঘরে বসে সেলাই, হস্তশিল্প, বেকিং, বা অন্যান্য পণ্য তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করতে পারেন। এতে আপনাকে বাইরে যেতে হবে না। তবে ডেলিভারির জন্য আপনাকে পুরুষের সাথে কথা বলতে হবে। এই ক্ষেত্রে আপনি যদি প্রয়ােজন অনুযায়ী সীমিত পরিমাণে কথা বলেন (যা শরিয়তে জায়েজ), তবে সমস্যা নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন তা ফিতনার কারণ না হয়। আপনি চাইলে আপনার স্বামী বা কোনো মাহরাম আত্মীয়কে ডেলিভারির দায়িত্ব দিতে পারেন।
৩. ইউটিউব/ফেসবুক মনিটাইজেশন: আপনি ঠিকই শুনেছেন যে, ইউটিউব বা ফেসবুক থেকে আয় করা অনেক সময় হারাম হতে পারে। কারণ:
- এতে গান, নাচ, অশ্লীলতা বা অশ্লীল কনটেন্ট থাকতে পারে।
- বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও আয় হয়, যেখানে হারাম পণ্যের বিজ্ঞাপন থাকতে পারে।
- অনেক সময় নারীদের ছবি বা ভিডিও দিয়ে আয় করা হয়, যা সম্পূর্ণ হারাম।
তবে যদি কোনো ইসলামিক কনটেন্ট তৈরি করা হয়, যেখানে কোনো হারাম জিনিস নেই, এবং বিজ্ঞাপনও বৈধ হয়, তবে সেটি জায়েজ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ইউটিউব/ফেসবুকের বিজ্ঞাপন নীতিমালা এমন যে, হারাম বিজ্ঞাপন আসবেই। তাই এ থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ। (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৪৩; ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯৪)
চতুর্থত: পরিবার ও সমাজের চাপ
আপনার পরিবার ও সমাজের চাপের কথা উল্লেখ করেছেন। মনে রাখবেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও স্বামীর সন্তুষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের চাপে পড়ে যদি আপনাকে পর্দা লঙ্ঘন করতে হয় বা হারাম উপার্জনে জড়াতে হয়, তবে তা কখনোই জায়েজ হবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানির ক্ষেত্রে সৃষ্টিজীবের আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)
আপনি যদি চান, আপনি আপনার পরিবারকে বোঝাতে পারেন যে, ইসলামি দৃষ্টিতে নারীর জন্য পর্দা করা ফরজ এবং ঘরে থাকা উত্তম। আপনি তাদেরকে বলতে পারেন যে, আমার স্বামী আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই আমার বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন নেই। তবে প্রয়োজনে আমি ঘরে বসে বৈধ উপায়ে কাজ করতে পারি।
পঞ্চমত: স্বামীর সাথে পরামর্শ
আপনার স্বামী দ্বীনদার এবং তিনি চান আপনি পর্দা করে ঘরে থাকুন। তাই আপনার উচিত তার সাথে খোলামেলা আলোচনা করা। আপনি তাকে আপনার ভয়ের কথা বলতে পারেন এবং জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, ঘরে বসে কোনো বৈধ উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা করা যায় কিনা। যদি তিনি সম্মত হন, তবে আপনি ঘরে বসে সেলাই, হস্তশিল্প বা অন্যান্য বৈধ কাজ করতে পারেন। তবে যদি তিনি মনে করেন যে, এতে পর্দার সমস্যা হবে, তবে তার কথা মেনে চলাই উত্তম। কারণ স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর জন্য জরুরি, যতক্ষণ তা আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ না হয়। (সূরা আন-নিসা: ৩৪; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৬৪)
ষষ্ঠত: সঞ্চয়ের বিষয়ে
আপনি বলেছেন যে, স্বামীর বেতনে সংসার চলে কিন্তু সঞ্চয় হয় না। এটি একটি বাস্তব সমস্যা। তবে এর সমাধান হলো, আপনি ঘরে বসে সাশ্রয়ী জীবনযাপন করুন এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَا عَالَ مَنِ اقْتَصَدَ "যে ব্যক্তি মিতব্যয়ী হয়, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না।" (মুসনাদ আহমাদ: ২২৮৮)
আপনি চাইলে স্বামীকে পরামর্শ দিতে পারেন যে, তিনি যেন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করেন। ইসলামি দৃষ্টিতে সঞ্চয় করা নিষিদ্ধ নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা ভালো। তবে জাকাত আদায়ের পর সঞ্চয় করা উচিত।
সবশেষে:
আপনার জন্য আমার পরামর্শ হলো: ১. আপনি ঘরে থাকুন এবং পর্দা রক্ষা করুন। এটি আপনার জন্য সর্বোত্তম। ২. স্বামীর সাথে পরামর্শ করে ঘরে বসে কোনো বৈধ উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা করুন, যেমন: সেলাই, হস্তশিল্প, বেকিং, বা অনলাইনে পণ্য বিক্রি (যেখানে পর্দা লঙ্ঘন না হয়)। ৩. ইউটিউব/ফেসবুক মনিটাইজেশন থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে হারামের আশঙ্কা প্রবল। ৪. পরিবার ও সমাজের চাপকে গুরুত্ব দেবেন না। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আসল লক্ষ্য। ৫. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। তিনি কখনো আপনাকে অসমর্থ রাখবেন না।
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনার দ্বীনদারি ও পর্দা রক্ষার তাওফিক দান করুন। (আমিন)