রিজিকের পেরেশানিতে গর্ভপাত করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
রিজিকের পেরেশানিতে গর্ভপাত করা কি জায়েজ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, শুধু রিজিকের পেরেশানি বা আর্থিক সংকটের কারণে গর্ভপাত করা ইসলামে জায়েজ নয়। এটি একটি বড় গুনাহ। তবে ইসলামি শরিয়তে গর্ভপাতের বিধান গর্ভের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
গর্ভপাতের শরয়ি বিধান (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
১. গর্ভের প্রথম পর্যায় (নুতফা, আলাকা, মুদগা — সাধারণত ১২০ দিন বা ৪ মাসের পূর্বে)
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, গর্ভের প্রথম ১২০ দিনের মধ্যে (যখন রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়নি) কোনো শরয়ি ওজর ছাড়া গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। তবে কিছু হানাফি ফকিহ বলেছেন, একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে (নুতফা অবস্থায়) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওজর থাকলে অনুমতি আছে — কিন্তু শুধু দারিদ্র্য বা রিজিকের ভয় তা নয়।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন:
"গর্ভের প্রথম পর্যায়ে ওষুধ দিয়ে গর্ভপাত করা জায়েজ নয়, তবে যদি গর্ভ থাকার কারণে মায়ের জীবন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অনুমতি আছে।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৭৬
ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে এসেছে:
"যদি কোনো নারীর গর্ভের কারণে তার প্রাণনাশের আশঙ্কা হয়, তাহলে গর্ভপাতের অনুমতি আছে। কিন্তু শুধু দারিদ্র্য বা সন্তান লালন-পালনের কষ্টের ভয়ে গর্ভপাত করা জায়েজ নয়।"
— ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৪
২. ১২০ দিন পর (রূহ ফুঁকে দেওয়ার পর)
১২০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর গর্ভপাত করা সম্পূর্ণ হারাম। কারণ তখন রূহ ফুঁকে দেওয়া হয় এবং শিশুটি একটি জীবিত প্রাণ হিসেবে গণ্য হয়। এ অবস্থায় গর্ভপাত করা হত্যার সমান।
হাদিস শরিফে এসেছে:
"প্রত্যেকের সৃষ্টি মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন নুতফা হিসেবে থাকে, অতঃপর চল্লিশ দিন আলাকা হিসেবে, অতঃপর চল্লিশ দিন মুদগা হিসেবে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান, যিনি তাতে রূহ ফুঁকে দেন..."
— সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩২০৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৪৩
রিজিকের পেরেশানির কারণে গর্ভপাত: বিশেষ আলোচনা
ক. রিজিকের মালিক আল্লাহ তাআলা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"আর তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।"
— সূরা আল-আনআম, আয়াত ১৫১
"আর তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না দারিদ্র্যের ভয়ে। আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা মহাপাপ।"
— সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩১
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআনে লিখেছেন:
"এই আয়াতগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ রিজিকের মালিক আল্লাহ। তিনি যাকে সন্তান দেন, তার রিজিকের ব্যবস্থাও তিনি করেন।"
— মাআরিফুল কুরআন, সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩১-এর তাফসির
খ. তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর ওপর ভরসা
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেছেন:
"সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত ও রিজিক। অনেক সময় সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর আল্লাহ তাআলা পিতামাতার জন্য রিজিকের নতুন দরজা খুলে দেন। তাই সন্তানের ভয়ে গর্ভপাত করা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশার নামান্তর।"
— ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩২১ (অনুরূপ)
গ. হানাফি ফকিহদের অভিমত
ইমাম তাহতাবি (রহ.) বলেছেন:
"গর্ভপাতের অনুমতি শুধু তখনই দেওয়া হবে যখন গর্ভ ধারণ করলে মায়ের জীবন নষ্ট হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কা থাকে। আর শুধু অভাব-অনটন বা সামাজিক লজ্জার ভয় কোনোভাবেই গর্ভপাতের বৈধ কারণ নয়।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৭৬-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বেহেশতী জেওরে লিখেছেন:
"গর্ভপাত করানো মহাপাপ। বিশেষত যখন রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছে। তবে যদি ডাক্তার মুসলিম ও নির্ভরযোগ্য হন এবং তিনি বলেন যে, গর্ভ থাকলে মায়ের প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে, তাহলে প্রথম ১২০ দিনের মধ্যে অনুমতি হতে পারে।"
— বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫৬ (প্রাসঙ্গিক অংশ)
আপনার বোনের করণীয়
১. গর্ভপাত করবেন না
যেহেতু গর্ভধারণের মেয়াদ মাত্র এক মাস (১২০ দিনের অনেক আগে), এবং গর্ভপাতের একমাত্র কারণ হলো স্বামীর চাকরি না হওয়া ও আর্থিক সংকট — যা শরিয়তে গর্ভপাতের বৈধ কারণ নয় — তাই তাকে গর্ভপাত করতে বলা যাবে না। এটি হারাম ও মহাপাপ হবে।
২. পরিবারকে বোঝান
পরিবারকে ইসলামের বিধান বোঝান। তাদের বলুন:
- রিজিকের মালিক আল্লাহ, তিনি সন্তানের রিজিকও দেবেন।
- গর্ভপাত করা আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন।
- সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত, অভিশাপ নয়।
- অনেক সময় সন্তান জন্মের পর আল্লাহ রিজিকের নতুন দরজা খুলে দেন।
৩. স্বামীকে উপার্জনের চেষ্টা করতে বলুন
স্বামীর ওপর পরিবারের ভরণপোষণ করা ফরজ। তাকে চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তবে চাকরি না হওয়া সন্তান হত্যার justification নয়।
৪. পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন
অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত থাকলে গর্ভকালীন ও সন্তান জন্মের পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনেক নারী সন্তান থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন।
৫. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন। এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।"
— সূরা আত-তালাক, আয়াত ২-৩
৬. দুআ করুন
নিম্নলিখিত দুআ পড়তে পারেন:
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
"হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে বাঁচান এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে আপনার সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী করুন।"
— তিরমিজি, হাদিস নং ৩৫৬৩
বিশেষ সতর্কতা
যদি কখনো মায়ের জীবন নাশের নিশ্চিত আশঙ্কা হয় (যেমন: এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি, গুরুতর জটিলতা), তাহলে যোগ্য মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শে প্রথম ১২০ দিনের মধ্যে গর্ভপাতের অনুমতি হতে পারে। কিন্তু বর্তমান প্রশ্নে এমন কোনো তথ্য নেই। শুধু আর্থিক সংকট গর্ভপাতের বৈধ কারণ নয়।
উপসংহার
আপনার বোনের করণীয় হলো: গর্ভপাত করবেন না। পরিবারকে ইসলামের বিধান বোঝান। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। তিনি সন্তানের রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। স্বামীকে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে বলুন। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সহায়তা করুন। আমিন।