দুই বন্ধু ব্যবসা করার জন্য চুক্তি বিষয়ক
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
অংশীদারি ব্যবসা ও সুদ সংক্রান্ত বিশ্লেষণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
দুই বন্ধু ব্যবসা করার জন্য চুক্তি করেছে:
- একজন (মালিক) ৮০ টাকার মালামাল দিবে
- অন্যজন (শ্রমিক/বিক্রেতা) শ্রম দিবে এবং ১০০ টাকায় মালামাল বিক্রি করবে
- দিনশেষে মালিককে ৫০% লাভ অর্থাৎ ১০ টাকা দিতে হবে
- যদি ৮০ টাকার কমে বিক্রি হয়, তাহলে মালিক পুরো ক্ষতি বহন করবে
- বিক্রেতাকে কোনো ক্ষতি বহন করতে হবে না
ইসলামী ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ
১. চুক্তির প্রকৃতি নির্ধারণ
এই চুক্তিটি মূলত মুদারাবা (Mudarabah) বা শিরকাতুল ইনান (Shirkat-ul-Inan) -এর অন্তর্ভুক্ত কিনা তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
২. মুদারাবার মূলনীতি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মুদারাবা হলো এমন একটি অংশীদারিত্ব যেখানে:
- এক পক্ষ মূলধন দেয় (রাব্বুল মাল)
- অপর পক্ষ শ্রম দেয় (মুদারিব)
- লাভ নির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয়
- ক্ষতি শুধুমাত্র মূলধন মালিককে বহন করতে হয় (যদি অসাবধানতা বা গাফিলতি না থাকে)
৩. প্রশ্নে বর্ণিত চুক্তির বিশ্লেষণ
ক. মূলধন ও লাভের অনুপাত
- মূলধন: ৮০ টাকা
- নির্ধারিত বিক্রয়মূল্য: ১০০ টাকা
- লাভ: ২০ টাকা (১০০ - ৮০)
- মালিককে দেওয়া লাভ: ১০ টাকা (৫০% লাভ)
- বিক্রেতার লাভ: ১০ টাকা (অবশিষ্ট ৫০%)
খ. ক্ষতির বিধান
- ৮০ টাকার কমে বিক্রি হলে মালিক পুরো ক্ষতি বহন করবে
- বিক্রেতাকে কোনো ক্ষতি বহন করতে হবে না
এটি মুদারাবার মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ মুদারাবায় ক্ষতি মূলধন মালিককে বহন করতে হয়।
৪. সুদের (রিবা) বিষয়টি পরীক্ষা
ক. নির্ধারিত লাভের বিষয়
এখানে লক্ষণীয় যে, মালিক নির্ধারিত পরিমাণ (১০ টাকা) লাভ হিসেবে নিচ্ছেন, যা প্রকৃত লাভের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি একটি সমস্যা হতে পারে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
"মুদারাবায় লাভের অংশ নির্ধারিত শতাংশে হতে হবে, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকায় নয়। কারণ লাভ অর্জিত হওয়ার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা লাভ হিসেবে নির্ধারণ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত।"
খ. বিশ্লেষণ
- যদি মাল ১০০ টাকায় বিক্রি হয়: লাভ ২০ টাকা, মালিক পাবেন ১০ টাকা (৫০%)
- যদি মাল ৯০ টাকায় বিক্রি হয়: লাভ ১০ টাকা, মালিক পাবেন ১০ টাকা (১০০% লাভ)
- যদি মাল ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়: লাভ ৫ টাকা, মালিক পাবেন ১০ টাকা (ক্ষতি ৫ টাকা মালিকের নিজের থেকে দিতে হবে)
এখানে দেখা যাচ্ছে যে, মালিকের জন্য নির্ধারিত ১০ টাকা লাভের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যা প্রকৃত লাভের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি সুদ (রিবা) -এর শামিল হতে পারে, কারণ:
- নির্ধারিত রিটার্ন: মালিক একটি নির্ধারিত পরিমাণ (১০ টাকা) লাভ হিসেবে পাবেন, যা প্রকৃত ব্যবসায়িক ফলাফলের উপর নির্ভরশীল নয়।
- ক্ষতির অসামঞ্জস্য: মালিক ক্ষতির পুরো অংশ বহন করছেন, কিন্তু লাভের অংশ নির্ধারিত - এটি ন্যায়সঙ্গত নয়।
৫. হানাফি ফিকহের নির্দেশনা
ফাতাওয়া আলমগীরী তে উল্লেখ আছে:
"মুদারাবায় লাভের অংশ অবশ্যই শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত হতে হবে (যেমন: ৫০%, ৪০% ইত্যাদি), নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা হিসেবে নয়। কারণ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা লাভ হিসেবে নির্ধারণ করলে তা সুদে পরিণত হয়।"
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) -এর মতে:
"যদি কেউ বলে যে, 'আমি এই মূলধনে ব্যবসা করব এবং তোমাকে নির্দিষ্ট ১০ টাকা দেব', তাহলে এটি জায়েয নয়। কারণ এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত।"
৬. সঠিক পদ্ধতি
সঠিক ইসলামী পদ্ধতি হবে:
- মালিক ৮০ টাকার মালামাল দিবেন
- বিক্রেতা শ্রম দিবেন
- লাভ শতাংশ অনুপাতে ভাগ হবে (যেমন: ৫০%-৫০%)
- ক্ষতি শুধুমাত্র মালিককে বহন করতে হবে (মুদারাবা) অথবা উভয়কে মূলধন অনুপাতে (শিরকাত)
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, প্রশ্নে বর্ণিত চুক্তিতে সুদের (রিবা) বিষয়টি বিদ্যমান। কারণ:
-
নির্ধারিত লাভ: মালিকের জন্য নির্ধারিত ১০ টাকা লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে, যা প্রকৃত লাভের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি মূলধনের উপর নির্ধারিত রিটার্ন, যা সুদের শামিল।
-
ক্ষতি ও লাভের অসামঞ্জস্য: মালিক ক্ষতির পুরো অংশ বহন করছেন কিন্তু লাভের অংশ নির্ধারিত - এটি ইসলামী অর্থনীতির ন্যায়বিচার নীতির পরিপন্থী।
৮. সমাধান
এই চুক্তি সংশোধনের জন্য নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে:
-
শতাংশ ভিত্তিক লাভ: মালিক ও বিক্রেতা উভয়ে লাভের শতাংশ নির্ধারণ করবেন (যেমন: ৫০%-৫০%)। প্রকৃত লাভ অনুযায়ী ভাগ হবে।
-
বিকল্প পদ্ধতি: মালিক বিক্রেতাকে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক (কমিশন) দিতে পারেন মালামাল বিক্রির জন্য, এবং মালিক নিজেই ব্যবসার সমস্ত লাভ-ক্ষতির মালিক হবেন।
-
শিরকাতুল ইনান: উভয়ে মূলধন ও শ্রম দিয়ে অংশীদারিত্ব করবেন, লাভ-ক্ষতি মূলধন অনুপাতে ভাগ হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।