প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগ কি আসলেই সাহাবাদের মেহনত???? এটার কি কোনো দলিল আছে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগ কি সাহাবাদের মেহনত? — দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ
ভূমিকা
প্রশ্নকারী ভাইয়ের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ আসলেই সাহাবায়ে কিরামের মেহনত কিনা এবং এর কোনো দলিল আছে কিনা — এ বিষয়ে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
কুরআন থেকে দলিল
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
"তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।" (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা উম্মতের একটি দলকে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। এটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো যুগের জন্য নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত সকল যুগের জন্য প্রযোজ্য।
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।" (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
হাদীস থেকে দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে যে আমার উম্মতের কোনো বিষয় দেখে, সে যেন তা পরিবর্তন করে। যদি সে তা পরিবর্তন করতে না পারে, তবে যেন মুখে প্রতিবাদ করে। আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তরে ঘৃণা করে — আর এটাই ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।" (সহীহ মুসলিম: ৪৯)
আরেকটি হাদীসে এসেছে:
"আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সর্বদা বিদ্যমান থাকবে যারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং বিজয়ী থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের ক্ষতি করতে পারবে না যারা তাদের বিরোধিতা করবে।" (সহীহ বুখারী: ৩৬৪১, সহীহ মুসলিম: ১৯২০)
সাহাবাদের মেহনতের প্রমাণ
সাহাবায়ে কিরামের জীবনী পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল:
১. হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মৃত্যুর পর যখন কিছু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন হযরত আবু বকর (রা.) ঘোষণা করেন: "আল্লাহর কসম! যারা নামায ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।" (সহীহ বুখারী: ১৪০০) — এটি ছিল দ্বীনের প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর মেহনত।
২. হযরত উমর ফারুক (রা.)
তিনি বিভিন্ন প্রদেশে শিক্ষক ও দাঈ প্রেরণ করতেন। তাঁর খিলাফতকালে ইসলামের প্রচার-প্রসার অভূতপূর্ব গতিতে হয়।
৩. হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.)
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ইয়ামানে প্রেরণের সময় বলেছিলেন: "তুমি আহলে কিতাবের একটি সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ। তুমি তাদেরকে প্রথমে সাক্ষ্য দিতে আহ্বান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল।" (সহীহ বুখারী: ১৪৫৮)
৪. হযরত আবু হুরায়রা (রা.)
তিনি মসজিদে নববীতে বসে মানুষকে দ্বীনের শিক্ষা দিতেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াতের কাজ করতেন।
হানাফী ফিকহের আলোকে
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মেহনত
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) নিজে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি কুফার মসজিদে বসে মানুষের দ্বীনি সমস্যার সমাধান দিতেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে জ্ঞান অর্জন ও প্রচারের জন্য ছাত্র প্রেরণ করতেন।
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (ফাতাওয়া আলমগীরী) উল্লেখ আছে:
দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া এবং মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরযে কিফায়া। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫:৩৫৩)
রদ্দুল মুহতার (শামী)-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি দ্বীনের একটি মৌলিক স্তম্ভ। (রদ্দুল মুহতার, ৪:৮০)
প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগের পদ্ধতি
প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগের মূল লক্ষ্য হলো:
- ঈমান ও আকীদা সংশোধন
- নামায, যাকাত, রোজা, হজ্বের মতো ফরয আমলসমূহের প্রতি যত্নবান হওয়া
- সুন্নাহর অনুসরণ
- আখলাক ও চরিত্র গঠন
- দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ও প্রচার
এই পদ্ধতিগুলো সাহাবাদের জীবন থেকে গৃহীত। যেমন:
"তোমরা এমন একটি দল হও যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে।" (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর বক্তব্য
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর তাফসীর "মা'আরিফুল কুরআন"-এ বলেন: দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সাহাবাদের সুন্নত এবং এটি কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। (মা'আরিফুল কুরআন, ২:১২৩)
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর বক্তব্য
মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন: দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ ইসলামের একটি মৌলিক দায়িত্ব। এটি সাহাবাদের যুগ থেকে শুরু হয়ে আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। (ফিকহী মাকালাত, ২:১৫০)
উপসংহার
প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ আসলেই সাহাবাদের মেহনতের ধারাবাহিকতা। এর দলিল কুরআন, হাদীস এবং সাহাবাদের জীবনী থেকে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। এটি কোনো নতুন উদ্ভাবিত বিষয় নয়, বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগ থেকে চলে আসা একটি প্রতিষ্ঠিত আমল।
তবে এ কথা স্মরণ রাখা জরুরি যে, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করতে হবে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এবং উলামায়ে কিরামের নির্দেশনা অনুযায়ী। কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি বা কমতি ছাড়াই মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উচিত।
"আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের খেদমত করার তাওফীক দান করুন। আমীন।"