ভাবির গীবত থেকে বাঁচতে ফোন এড়িয়ে চলা বা মিথ্যা বলা কি জায়েয?

Family Life · Hanafi

Question No: 5919
Questioner: Champa0395
Question Asked: 24 Sep 2026, 10:37 PM
Reviewed & Published: 24 Sep 2026, 10:56 PM
Views: 38
Tokens: 5,149
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস-সালামু আলাইকুম
আমি সত্যি অনেক ক্লান্ত,আর পারছি না তাওবা আবার তাই করি।

আমার প্রশ্ন,

আমার ভাবি উনার সাথে ফোনে কথা বললে বা যেভাবেই কথা হোক উনি অন্যর গীবত করবেই' সাথে আমার ও শুনা হয় না চাইলেও আমারো বলা হয় আমি অনেক ভাবে চেষ্টা করছি কিন্ত পারি নাই ফিরতে।

এখন আমার প্রশ্ন সমপর্ক আমি যদি কোশলে উনার সাথে কথা বলা বাদ দেই মানে বেশী ভাগ ফোনেই কথা হয়।
যদি ফোন অফ রাখি উনি ফোন দিলে বলি ফোনে সমস্যা এই ভাবে যদি উনার থেকে দূরে থাকি, মিথ্যা বলি আমার কি গুনাহ হব্দ।

আমি নিরুপায়?

Answer

গীবত থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যা বলা কি জায়েয?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী বলেন, তার ভাবি (ভাইয়ের স্ত্রী) সর্বদা অন্যের গীবত করেন। ফোনে কথা বললেই গীবত হয়, শুনতে না চাইলেও শুনতে হয় এবং নিজের অজান্তেই তিনি গীবতে অংশ নেন। তিনি বহুবার বিরত থাকার চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারছেন না। এখন তিনি জানতে চান—ফোন বন্ধ রাখা বা "ফোনে সমস্যা" বলে মিথ্যা বলা কি গুনাহ হবে? তিনি কি নিরুপায়?


প্রথমে জেনে নিন: গীবত কত বড় গুনাহ

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ

অর্থ: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো, নিশ্চয়ই কিছু ধারণা গুনাহ। আর গোয়েন্দাগিরি করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করবে। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন:

أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ

অর্থ: "তোমরা জানো গীবত কী? সাহাবারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা সে অপছন্দ করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৮৯)

গীবত কবীরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আর গীবত শোনাও সমান অপরাধ—যে শোনে সে-ও গুনাহগার হয়, যদি না সে প্রতিবাদ করে বা ওই মজলিস ত্যাগ করে।


মূল প্রশ্নের উত্তর: মিথ্যা বলে দূরে থাকা কি জায়েয?

মূলনীতি (উসূল)

ইসলামে মিথ্যা বলা হারাম। তবে শরীয়ত কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মিথ্যার অনুমতি দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ فَيَقُولُ خَيْرًا أَوْ يَنْمِي خَيْرًا

অর্থ: "সেই ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য ভালো কথা বলে বা ভালো কিছু পৌঁছায়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯২)

ইমাম নববী রহ. উল্লেখ করেন, মিথ্যার অনুমতি শুধু তিনটি ক্ষেত্রে: (১) যুদ্ধক্ষেত্রে, (২) দুই মুসলমানের মধ্যে মীমাংসার জন্য, (৩) স্ত্রীর সাথে সৌহার্দ্য রক্ষার জন্য। এছাড়া অন্য ক্ষেত্রে মিথ্যা হারাম। (সহীহ মুসলিমের শরহ, ১৮/১২২)

আপনার ক্ষেত্রে করণীয়

আপনার প্রশ্নে দুটি দিক আছে:

১. ফোন বন্ধ রাখা বা এড়িয়ে চলা: এটি সম্পূর্ণ জায়েয, বরং গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য কর্তব্য। এতে কোনো গুনাহ নেই।

২. "ফোনে সমস্যা" বলে মিথ্যা বলা: এখানে সতর্কতা প্রয়োজন। সরাসরি মিথ্যা বলা জায়েয হবে না। তবে আপনি তাওরিয়া (দ্ব্যর্থক কথা) ব্যবহার করতে পারেন, যা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন—

  • "এখন কথা বলতে পারছি না, ব্যস্ত আছি" — যদি আপনি সত্যিই অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন বা ইবাদত/পড়াশোনায় থাকেন।
  • "পরে কথা বলব" বলে পরে ফোন না ধরার অভ্যাস করা—এটাও একটি কৌশল, তবে সরাসরি মিথ্যা পরিহার করুন।

সর্বোত্তম পন্থা: সরাসরি স্পষ্টভাবে বলা—"আপু, আপনি যখন ফোনে অন্যের গীবত করেন, আমি শুনতে চাই না, কারণ এটি গুনাহ। আপনি গীবত করলে আমি চুপ থাকতে পারি না, আর শুনলে আমিও গুনাহগার হব। তাই দয়া করে আমার সাথে গীবত করবেন না।" এভাবে সরাসরি বলা সম্ভব না হলে, ধীরে ধীরে ফোনের মাত্রা কমিয়ে দিন, কথা সংক্ষিপ্ত করুন, এবং গীবত শুরু হলে "আমার এখন কাজ আছে" বলে ফোন কেটে দিন।


গীবত শোনার ব্যাপারে করণীয়

আপনি লিখেছেন—শুনতে চান না, তবুও শুনতে হয় এবং নিজের অজান্তেই বলাও হয়ে যায়। এর সমাধান:

১. গীবত শুরু হলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করুন — নরম ভাষায় হলেও বলুন, "আপু, এ কথা বলা ঠিক হবে না।" ২. বিষয় পরিবর্তন করুন — গীবতের বিষয় থেকে সরে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলুন। ৩. ফোন কেটে দিন — যদি প্রতিবাদ করেও না থামেন, তবে অজুহাত দিয়ে ফোন রাখুন। ৪. নিজে গীবতে অংশ নেবেন না — "হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন" জাতীয় সমর্থনমূলক কথা বলবেন না। চুপ থাকলেও গুনাহ থেকে মুক্তি নেই যদি না প্রতিবাদ করেন বা মজলিস ত্যাগ করেন। ৫. তাওবা করুন — যদি কখনো অংশ নিয়ে ফেলেন, সাথে সাথে তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করুন।

ইমাম ইবন আবিদীন শামী রহ. লিখেন:

وَالْغِيبَةُ حَرَامٌ عَلَى الْمُسْتَمِعِ أَيْضًا إِذَا لَمْ يُنْكِرْ وَلَمْ يَقُمْ

অর্থ: "গীবত শ্রবণকারীর জন্যও হারাম, যদি সে প্রতিবাদ না করে এবং ওই মজলিস ত্যাগ না করে।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪০৬)


আপনি কি নিরুপায়?

না, আপনি নিরুপায় নন। ইসলাম কাউকে গুনাহের মধ্যে ফেলে রাখে না। আপনার হাতে অনেকগুলো বিকল্প আছে:

| বিকল্প | বিধান | |--------|--------| | ফোন কমিয়ে দেওয়া | জায়েয, বরং কর্তব্য | | সরাসরি প্রতিবাদ করা | কর্তব্য | | গীবতের মজলিস ত্যাগ করা | কর্তব্য | | তাওরিয়া (দ্ব্যর্থক কথা) বলা | জায়েয | | সরাসরি মিথ্যা বলা | হারাম, পরিহার করুন | | সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা | জায়েয নয়, তবে কথা কমিয়ে দেওয়া জায়েয |

মনে রাখবেন: আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা কর্তব্য, কিন্তু গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা কখনোই আত্মীয়তার অংশ নয়। আপনি সম্পর্ক রাখুন—সালাম-দুআ, ঈদে সাক্ষাৎ, প্রয়োজনীয় খোঁজখবর—কিন্তু গীবতের মজলিস থেকে দূরে থাকুন।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

অর্থ: "নেক কাজ ও তাকওয়ায় একে অন্যের সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)


উপসংহার

১. গীবত করা ও শোনা—দুটোই হারাম ও কবীরা গুনাহ। ২. গীবত থেকে বাঁচার জন্য ফোন কমিয়ে দেওয়া বা এড়িয়ে চলা জায়েয, বরং কর্তব্য। ৩. সরাসরি মিথ্যা বলা জায়েয নয়; তবে তাওরিয়া বা দ্ব্যর্থক কথা বলা যেতে পারে। ৪. গীবত শুরু হলে প্রতিবাদ করা, বিষয় পরিবর্তন করা বা মজলিস ত্যাগ করা কর্তব্য। ৫. আপনি নিরুপায় নন—ইসলামে গুনাহ থেকে বাঁচার অনেক পথ রয়েছে। ৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখুন, কিন্তু গুনাহের কাজে অংশ নেবেন না। ৭. আল্লাহর কাছে তাওবা করুন এবং দৃঢ় সংকল্প করুন।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে গীবত থেকে হেফাজত করুন এবং তাওবার তাওফিক দান করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.