মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা বিদআত কিনা? ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা ও দোয়া-দুরুদের বিধান কী?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
ঈসালে সওয়াব এর নিয়তে একটি মাদ্রাসায় কিছু প্রয়োজনীয় আসবাব দান সদাকা করা হবে ইন শা আল্লাহ্ । সেই জিনিস গুলো নেওয়ার জন্য মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেব এবং কিছু ছাত্র আসবেন আমাদের বাসায়, পাশাপাশি কিছু সুরা , দোয়া দুরুদ পড়বেন মৃতের সাওয়াব এর উদ্দেশ্যে এবং অন্যান্য বিষয়ে।
এভাবে কি জায়েজ হবে নাকি বিদাত?
Answer
ঈসালে সওয়াব ও মৃত্যু বার্ষিকী আয়োজন প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে নিম্নোক্ত আয়োজন করা বৈধ কিনা? ঈসালে সওয়াবের নিয়তে একটি মাদ্রাসায় কিছু প্রয়োজনীয় আসবাব দান সদাকা করা হবে ইন শা আল্লাহ্। সেই জিনিসগুলো নেওয়ার জন্য মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেব এবং কিছু ছাত্র আসবেন আমাদের বাসায়, পাশাপাশি কিছু সূরা, দোয়া দুরুদ পড়বেন মৃতের সওয়াবের উদ্দেশ্যে এবং অন্যান্য বিষয়ে। এভাবে কি জায়েজ হবে নাকি বিদআত?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الأمين وعلى آله وأصحابه أجمعين أما بعد،
মূলনীতি
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত:
প্রথম অংশ: মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা।
দ্বিতীয় অংশ: ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা করা এবং মৃতের জন্য দোয়া-দুরুদ পাঠ করা।
প্রথম অংশ: মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা
মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা ইসলামী শরীয়তে বিদআত। কারণ:
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ বা সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কখনো মৃত্যু বার্ষিকী পালন করেননি। ইসলামের প্রথম যুগে কোনো মৃত ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী পালনের প্রমাণ নেই। যে কাজ রাসূল ﷺ এবং সাহাবায়ে কেরাম করেননি, তা দ্বীনের মধ্যে নতুন প্রবর্তন করা বিদআত।
২. হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ (صحيح البخاري: ২৬৯৭، صحيح مسلم: ১৭১৮)
অর্থ: "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন উদ্ভাবন করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।"
৩. ইমাম মালিক (রহ.) বলেন:
مَنْ ابْتَدَعَ فِي الْإِسْلَامِ بِدْعَةً يَرَاهَا حَسَنَةً فَقَدْ زَعَمَ أَنَّ مُحَمَّدًا ﷺ خَانَ الرِّسَالَةَ (الاعتصام للشاطبي)
অর্থ: "যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো নতুন বিষয়কে ভালো মনে করে প্রবর্তন করে, সে যেন ধারণা করল যে, মুহাম্মাদ ﷺ রিসালাতের আমানত পৌঁছাতে খিয়ানত করেছেন।"
৪. মৃত্যু বার্ষিকী পালনের ক্ষেত্রে বিশেষত্ব:
মৃত্যু বার্ষিকী পালন একটি নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া। ইসলামে নির্দিষ্ট দিনে মৃতের জন্য বিশেষ আয়োজনের কোনো বিধান নেই। এটি অমুসলিমদের সংস্কৃতি থেকে প্রবর্তিত একটি রীতি। তাই এটি বিদআত।
দ্বিতীয় অংশ: ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা ও দোয়া-দুরুদ
ঈসালে সওয়াব অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির আত্মার সওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে দান-সদাকা করা, দোয়া করা, কুরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট দিন (যেমন মৃত্যু বার্ষিকী) নির্ধারণ করা বিদআত।
১. দান-সদাকার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ ﷺ: إِنَّ أَبِي مَاتَ وَتَرَكَ مَالًا وَلَمْ يُوصِ، فَهَلْ يُكَفِّرُ عَنْهُ أَنْ أَتَصَدَّقَ عَنْهُ؟ قَالَ: نَعَمْ (صحيح مسلم: ১০০৪)
অর্থ: "আবু হুরাইরাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী ﷺ-কে জিজ্ঞেস করল: আমার পিতা মারা গেছেন এবং সম্পদ রেখে গেছেন, কিন্তু অসিয়ত করে যাননি। আমি কি তার পক্ষ থেকে সদাকা করলে তা তার জন্য কাফফারা হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ।"
২. দোয়া ও ইস্তিগফারের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায়:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ (صحيح مسلم: ১৬৩১)
অর্থ: "যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ছাড়া: চলমান সদাকা, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, অথবা সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।"
৩. মাদ্রাসায় আসবাবপত্র দান করা:
মাদ্রাসায় আসবাবপত্র দান করা একটি সাদাকায়ে জারিয়া (চলমান সদাকা)। যতদিন সেই আসবাবপত্র ব্যবহৃত হবে, ততদিন মৃত ব্যক্তির সওয়াব পৌঁছতে থাকবে। এটি অত্যন্ত উত্তম কাজ।
৪. মৃতের জন্য দোয়া-দুরুদ পাঠ:
মৃতের জন্য দোয়া করা, কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো, দুরুদ শরীফ পাঠ করা ইত্যাদি জায়েয। তবে এতে কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সময় বাধ্যতামূলক করা যাবে না।
সমাধান ও পরামর্শ
মৃত্যু বার্ষিকী পালনের নামে আয়োজন করা বিদআত। তবে ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা করা এবং দোয়া করা জায়েয। তাই নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত:
১. মৃত্যু বার্ষিকী হিসেবে নয়, বরং সাধারণভাবে মৃতের ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা করুন। এতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখের শর্ত নেই।
২. মাদ্রাসার মুহতামিম ও ছাত্ররা আসবেন এবং দোয়া করবেন — এতে কোনো সমস্যা নেই, যদি তা মৃত্যু বার্ষিকী হিসেবে না হয়, বরং সাধারণ ঈসালে সওয়াবের আয়োজন হিসেবে হয়।
৩. নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ না করে যেকোনো দিন এই কাজটি করা যেতে পারে। ইসলামে প্রতি দিনই মৃতের জন্য দোয়া করা যায়।
৪. মৃতের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার, দান-সদাকা — এগুলো সব সময়ই করা যায় এবং এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায়।
৫. মৃত্যু বার্ষিকী পালনের রীতি পরিহার করুন এবং পরিবার-পরিজনকে বুঝিয়ে বলুন যে, ইসলামে নির্দিষ্ট দিনে মৃত্যু বার্ষিকী পালনের কোনো বিধান নেই।
ফাতাওয়া ও উলামাদের বক্তব্য
১. ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
وَمِنْ الْبِدَعِ الْمَكْرُوهَةِ اتِّخَاذُ الْوَلَائِمِ فِي الْمَوَاسِمِ وَالْمَوَالِدِ وَالْمَآتِمِ (رد المحتار: ৯/৫৬৭)
অর্থ: "নিষিদ্ধ বিদআতের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে (মৃত্যু বার্ষিকী ইত্যাদি) ভোজের আয়োজন করা।"
২. ফাতাওয়া আলমগীরিতে বর্ণিত:
وَأَمَّا صَنِيعُ النَّاسِ فِي الْمَوَاسِمِ وَالْمَوَالِدِ وَالْمَآتِمِ فَهُوَ بِدْعَةٌ وَمَكْرُوهٌ (فتاوی ہندیہ: ৫/৩৫৮)
অর্থ: "নির্দিষ্ট সময়ে (মৃত্যু বার্ষিকী ইত্যাদি) মানুষের আয়োজন বিদআত এবং মাকরূহ।"
৩. মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:
মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা ইসলামী শরীয়তে বৈধ নয়। এটি অমুসলিমদের সংস্কৃতি থেকে গৃহীত একটি রীতি। তবে ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা করা এবং দোয়া করা জায়েয, কিন্তু তা নির্দিষ্ট দিনের সাথে সম্পর্কিত না করে যেকোনো দিন করা যেতে পারে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/১৮৫)
৪. মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা বিদআত। তবে মৃতের জন্য দোয়া করা, দান-সদাকা করা এবং ঈসালে সওয়াব করা জায়েয। কিন্তু এগুলোকে নির্দিষ্ট দিনের সাথে জড়িয়ে ফেলা বিদআত। (ফাতাওয়া উসমানী: ২/১৮০)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |-------|-------| | মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা | বিদআত ও নাজায়েয | | ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা | জায়েয ও সওয়াবের কাজ | | মৃতের জন্য দোয়া-দুরুদ পাঠ | জায়েয ও মুস্তাহাব | | মাদ্রাসায় আসবাবপত্র দান | জায়েয ও সাদাকায়ে জারিয়া | | নির্দিষ্ট দিনে (বার্ষিকীতে) আয়োজন | বিদআত | | সাধারণভাবে ঈসালে সওয়াবের আয়োজন | জায়েয |
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়:
১. মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা বিদআত — এটি পরিহার করা উচিত।
২. ঈসালে সওয়াবের নিয়তে মাদ্রাসায় আসবাবপত্র দান করা — এটি অত্যন্ত উত্তম কাজ এবং এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছাবে।
৩. মাদ্রাসার মুহতামিম ও ছাত্ররা এসে দোয়া-দুরুদ পড়বেন — এতে কোনো সমস্যা নেই, যদি তা মৃত্যু বার্ষিকী হিসেবে না হয়, বরং সাধারণ ঈসালে সওয়াবের আয়োজন হিসেবে হয়।
৪. সর্বোত্তম পদ্ধতি: মৃত্যু বার্ষিকীর ধারণা বাদ দিয়ে, যেকোনো দিন ঈসালে সওয়াবের নিয়তে দান-সদাকা করুন এবং মৃতের জন্য দোয়া করুন। এতে বিদআত থেকে বাঁচা যাবে এবং সওয়াবও পাওয়া যাবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب