বদ সন্তানের কারণে মৃত পিতা-মাতার গোনাহ হবে কি না
Family Life · Hanafi
Question
শায়খ কয়েকমাস আগে আমার চাচিআম্মু মারা যান।চাচিআম্মুর একটাই মেয়ে।আমার পুরো পরিবার অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের মত।কেউ তেমন প্র্যাক্টিসিং না তবে আমি এবং আমার মা একটু চেষ্টা করি আলহামদুলিল্লাহ।
আমার সব চাচাতো বোন বা চাচিআম্মুরা কেউ তেমন পরিপূর্ণ পর্দা করেন না।
এখন আমার ঐ চাচাতো বোন হিজাব করে কিন্তু রিসেন্টলি ও ফেসবুকে একটি পেজ খুলেছে যেখানে ও মিউজিক এ্যাড করে সারাদিনের এ্যাক্টিভিটির ভিডিও শেয়ার করবে।
আমি আরেকটি জিনিস নিয়ে খুব টেনশনে আছি ,ও হয়তো কবে কাপল ভ্লগ করা শুরু করতে পারে।
ওকে যদি ভালমতো বোঝাই তাহলে হয়তো বন্ধ করতে পারে ইনশাআল্লহ্।
শায়খ আমার প্রশ্ন হলো, ও যদি হারাম কাজ করে এজন্য কি আমার চাচিআম্মুর কবরে আজাব হবে?ও যেহেতু পর্দা করেনা, বেপর্দা ছবি ফেসবুকে দেয়, হারাম গান শেয়ার করে এসবের জন্য কি চাচিআম্মুর গুনাহে জারিয়াহ হবে?
আমি আসলে ওকে বোঝাবো কিন্তু তার আগে বিষয়টা নিয়ে একটু ক্লিয়ার হতে চাই ইনশাআল্লহ্।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্ন করার জন্য ধন্যবাদ। আপনার চাচাতো বোনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা এবং তাকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করা একটি মহৎ কাজ। আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করতে চাই।
১. মৃত ব্যক্তির উপর সন্তানের গুনাহের প্রভাব
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো, আপনার চাচাতো বোনের (যিনি আপনার চাচির মেয়ে) হারাম কাজের কারণে আপনার মৃত চাচির কবরে আজাব হবে কিনা।
উত্তর: ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের কাজের জন্য দায়ী। কেউ অন্যের গুনাহের বোঝা বহন করবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ "আর কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা ফাতির: ১৮, সূরা আনআম: ১৬৪)
তাই আপনার চাচির মৃত্যুর পর তার মেয়ের (আপনার চাচাতো বোনের) কৃতকর্মের জন্য আপনার চাচিকে দায়ী করা হবে না এবং তার কবরে আজাব হবে না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের আমলের জন্য জবাবদিহি করবে।
তবে, যদি কোনো সন্তান পিতামাতার জীবদ্দশায় তাদের কাছ থেকে কোনো খারাপ কাজ শিখে থাকে বা তাদের নির্দেশে সেই কাজ করে থাকে, তাহলে সেই ক্ষেত্রে পিতামাতার জন্য গুনাহের অংশ থাকতে পারে। কিন্তু আপনার চাচি মারা গেছেন, এবং তার মেয়ে এখন যা করছে তা তার নিজের ইচ্ছায় করছে। তাই এর জন্য আপনার চাচির কোনো দায়িত্ব নেই।
২. সন্তানের ভালো কাজের সওয়াব পিতামাতার জন্য
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানের ভালো কাজের সওয়াব পিতামাতার কাছে পৌঁছে। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ "যখন কোনো মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ছাড়া: সদকায়ে জারিয়াহ (অবিরত দান), এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)
তাই আপনার চাচির জন্য তার মেয়ের ভালো কাজের সওয়াব পৌঁছাবে, কিন্তু তার খারাপ কাজের গুনাহ আপনার চাচিকে স্পর্শ করবে না। বরং, আপনার চাচাতো বোন নিজেই তার কাজের জন্য দায়ী হবে।
৩. আপনার করণীয়
আপনি আপনার চাচাতো বোনকে ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, এটি খুবই প্রশংসনীয়। ইসলামে অন্যকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে, এই কাজটি করতে হবে অত্যন্ত কৌশলের সাথে, নম্রভাবে এবং ভালোবাসার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ "তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান কর জ্ঞান ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।" (সূরা নাহল: ১২৫)
আপনি তাকে বোঝানোর সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মনে রাখতে পারেন:
- পর্দার গুরুত্ব: তাকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে পর্দার গুরুত্ব বোঝান। পর্দা শুধু মাথায় ওড়না দেওয়া নয়, বরং পুরো শরীর ঢেকে রাখা, সাজসজ্জা না করা এবং অন্যদের সাথে সঠিকভাবে কথা বলা।
- গানের হারাম: গান-বাজনা ইসলামে হারাম। তাকে এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিসের দলিল দেখান।
- ফেসবুক পেজ: ফেসবুকে নিজের ছবি, বিশেষ করে বেপর্দা ছবি এবং দৈনন্দিন কার্যকলাপের ভিডিও শেয়ার করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। এটি ফিতনার কারণ হতে পারে।
- কাপল ভ্লগ: কাপল ভ্লগ করা ইসলামী সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। এটি সাধারণত ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে প্রকাশ করে, যা ইসলামে উৎসাহিত নয়।
৪. দোয়া ও তাওফীক
আপনার চাচাতো বোনকে বোঝানোর পাশাপাশি তার জন্য দোয়া করুন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যেন তিনি তাকে হেদায়েত দেন। মনে রাখবেন, হেদায়েত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আপনার কাজ হলো তাকে সঠিক পথ দেখানোর চেষ্টা করা, আর ফলাফল আল্লাহর হাতে।
উপসংহার
আপনার চাচির কবরে তার মেয়ের গুনাহের কারণে আজাব হবে না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের কাজের জন্য দায়ী। আপনি আপনার চাচাতো বোনকে ভালোবাসা ও নম্রতার সাথে বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং তার জন্য দোয়া করুন। আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।