কালারিং বোরকা পরলে কি পর্দা হবে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
কালারিং বোরকা (যেমন: লাল, নীল, সবুজ, গোলাপি ইত্যাদি) পরিধান করলেও পর্দা আদায় হবে যদি তা শরয়ী পর্দার শর্ত পূরণ করে। হানাফি ফিকহে বোরকার রং নির্ধারিত নয়; বরং শর্ত হলো:
- সারা শরীর (মুখ ও হাতের কব্জি পর্যন্ত বাদে) ঢাকা।
- পোশাক পাতলা ও স্বচ্ছ না হওয়া যাতে শরীরের বর্ণ বা আকৃতি বোঝা যায়।
- আঁটসাঁট না হওয়া যাতে শরীরের গঠন ফুটে ওঠে।
- অতি আকর্ষণীয় ও জাকজমকপূর্ণ না হওয়া যা পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সুতরাং, যদি বোরকাটি উল্লেখিত শর্ত পূরণ করে এবং শরীরের ভাঁজ বোঝা না যায়, তবে রং ভিন্ন হলেও তা জায়েজ। তবে উত্তম হলো নিরপেক্ষ ও মাফলুক রং (যেমন: কালো, গাঢ় নীল, গাঢ় খাকি) ব্যবহার করা, কারণ এসব রং কম আকর্ষণীয়।
উল্লেখযোগ্য হানাফি কিতাব ও ফতোয়া
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন) :
“নারীর জন্য উত্তম হলো এমন পোশাক পরিধান করা যা তার সৌন্দর্য গোপন রাখে ও পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। রং নির্ধারিত নয়, তবে উজ্জ্বল রং মাকরুহ (অপছন্দনীয়) হতে পারে যদি তা ফিতনার কারণ হয়।”
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬; কিতাবুল হায়াজ) -
ফতোয়া হিন্দিয়া (ফতোয়া আলমগিরি) :
“নারীর জন্য বাইরে বের হওয়ার সময় এমন কাপড় পরা জরুরি যা তার শরীরকে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত করে এবং পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। রংয়ের ব্যাপারে কোনো কঠোর বাধ্যবাধকতা নেই।”
(ফতোয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫১) -
বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী) :
“পর্দার কাপড় মোটা ও ঢিলা হওয়া চাই। রং কালো হওয়া জরুরি নয়; বরং যে রং কম চোখে পড়ে ও মনোযোগ আকর্ষণ করে না, তা উত্তম।”
(বেহেশতি জেওর, পর্দা অধ্যায়) -
ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকী উসমানি) :
“কালো বোরকা জরুরি নয়। নারীরা গাঢ় নীল, সবুজ, ধূসর ইত্যাদি রং ব্যবহার করতে পারেন। তবে অতি উজ্জ্বল ও চটকদার রং পরিহার করাই ভালো।”
(ফতোয়া উসমানি, ২/৩৮০-৩৮১)
সমসাময়িক প্রসঙ্গ: নিরাপত্তাহীনতা ও রংয়ের গুরুত্ব
আপনি উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে বোরকা পরিধানকারী নারীরাও নিরাপদ নয়। এটি একটি সামাজিক ও আইনগত সমস্যা, যা ফিকহি বিধানের মূল বিষয় নয়। তবে ফিকহের দৃষ্টিতে:
-
রংয়ের প্রভাব: যদি কোনো রং (যেমন: উজ্জ্বল লাল বা ফ্লুরোসেন্ট) নারীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ বাড়ায়, তবে তা পর্দার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। তাই নিরপেক্ষ রং বেছে নেওয়া উত্তম। আবার যদি সমাজে নির্দিষ্ট রং নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে (যেমন: কালো বোরকা পরলে শত্রুতা বা টার্গেটিং হয়), তবে সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য ভিন্ন রং ব্যবহার করা জায়েজ, কারণ ইসলামে প্রাণ ও ইজ্জত রক্ষা অগ্রাধিকার পায়।
-
মাসলাহা (কল্যাণ): হানাফি ফিকহে মাসলাহার ভিত্তিতে রায় পরিবর্তন হতে পারে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: “যখন কোনো আমল ফিতনার কারণ হয়, তখন তা পরিহার করা ওয়াজিব।” (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, ৮৭)
সুতরাং, যদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে কালো বোরকা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, তবে অন্য রং ব্যবহার করা উত্তম।
চূড়ান্ত ফতোয়া
- কালারিং বোরকা পরলে পর্দা হবে, যদি তা স্বচ্ছ ও আঁটসাঁট না হয় এবং শরীরের আকৃতি প্রকাশ না করে।
- রং মূল বিষয় নয়; বরং আকর্ষণীয়তা ও ফিতনার ঝুঁকি বিবেচ্য।
- উত্তম পন্থা হলো মাফলুক ও লোমহীন রং (কালো, গাঢ় নীল, ধূসর) ব্যবহার করা।
- প্রয়োজনে নিরাপত্তার স্বার্থে ভিন্ন রং ব্যবহার করা জায়েজ, এমনকি উত্তম হতে পারে।
দলিল:
- কুরআন: “হে নবী! আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তারা উত্যক্ত হবে না।” (সূরা আহযাব: ৫৯) – আয়াতে রং নির্ধারিত নয়, বরং আচ্ছাদন ও নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে।
- হাদিস: উম্মে সালমা (রা.) বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কীভাবে চাদর পরব? তিনি বললেন: ‘তোমরা তা মাথা ও গলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত লম্বা করে ফেলো (শরীর ঢেকে) আর শরীরের গঠন প্রকাশ পাবে না।’” (আবু দাউদ, হাদিস: ৪১০১)