বাবার বাড়ি গেলে তালাক হয়ে যাবে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারীর নাম: শারমিন বিষয়: স্ত্রীকে শর্তসাপেক্ষে তালাকের হুমকি দেওয়া
উত্তর:
আপনার স্বামী যে শর্তটি দিয়েছেন—"যদি তুমি সিলেট যাও, তাহলে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক থাকবে না, অটো তালাক হয়ে যাবে"—এটি ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় তালাক-এ-তা'লীকি (শর্তসাপেক্ষ তালাক) হিসেবে গণ্য হবে। এই ধরনের বক্তব্যের বিধান নিম্নরূপ:
১. শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে: হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলে, "যদি তুমি অমুক স্থানে যাও, তাহলে তোমার সাথে আমার তালাক হয়ে যাবে" এবং স্ত্রী সেই শর্ত পূরণ করে (অর্থাৎ সিলেট যায়), তাহলে সাথে সাথে একটি তালাকে বায়িন (অপারিবর্তনীয় তালাক) পতিত হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮০; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৪)
২. শর্ত পূরণ না হলে তালাক পতিত হবে না: যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি সিলেট না যাবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো তালাক পতিত হবে না। আপনার স্বামীর এই হুমকি শুধুমাত্র শর্তসাপেক্ষ; শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বহাল থাকবে।
৩. আপনার করণীয়:
- সরাসরি সিলেট না যাওয়া: যেহেতু আপনার স্বামী স্পষ্টভাবে শর্ত দিয়েছেন, তাই আপনি যদি সিলেট যান, তাহলে তালাক পতিত হয়ে যাবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সিলেট না যাওয়াই উত্তম।
- স্বামীর সাথে আলোচনা: আপনি আপনার স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, আপনার মা একাকী এবং বৃদ্ধা, তাকে দেখাশোনা করা আপনার দায়িত্ব। তাকে জানান যে, মায়ের সাথে দেখা করতে গেলে আপনি ফিরে আসবেন এবং সংসার করবেন। সম্ভবত তিনি রাগের মাথায় এমন কথা বলেছেন।
- মাকে আপনার কাছে রাখা: যদি সম্ভব হয়, তাহলে আপনার মাকে আপনার বাসায় (স্বামীর বাসায়) কিছুদিনের জন্য রাখার ব্যবস্থা করুন, অথবা স্বামীর সম্মতিতে মায়ের সাথে দেখা করার জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করুন।
- মাসিক খরচ ও যোগাযোগ: আপনি যদি সিলেট না-ও যান, তবুও ফোনে মায়ের খোঁজখবর নিতে পারেন এবং প্রয়োজনে অর্থ পাঠাতে পারেন।
৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
- এই ধরনের শর্তসাপেক্ষ তালাকের কথা বলা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তালাক হলো বৈধ জিনিসগুলোর মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত।" (আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮)
- আপনার স্বামীকে উচিত ছিল রাগের মাথায় এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়া। তবে যেহেতু তিনি এই শর্ত দিয়েছেন, তাই আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে।
৫. যদি আপনি সিলেট যেতেই চান: যদি আপনার মায়ের অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজনে সিলেট যাওয়া একান্ত প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রথমে স্বামীর সাথে পরামর্শ করুন এবং তার অনুমতি নিয়ে যান। যদি তিনি অনুমতি দেন, তাহলে শর্ত পূরণ হবে না এবং তালাক পতিত হবে না। কিন্তু যদি তিনি অনুমতি না দেন এবং আপনি জোর করে যান, তাহলে তালাক পতিত হয়ে যাবে।
৬. মায়ের দায়িত্ব: ইসলামে মায়ের সেবা করা সন্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিবাহিত নারীর জন্য স্বামীর আনুগত্য ও তার অনুমতি ছাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়া জায়েজ নয়। তাই আপনাকে উভয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। আপনি স্বামীকে বোঝান যে, মায়ের সেবা করা আপনার ধর্মীয় দায়িত্ব, কিন্তু তার (স্বামীর) আনুগত্যও আপনার কর্তব্য। তিনি যেন এতে সহযোগিতা করেন।
৭. বিচ্ছেদের চিন্তা না করা: আপনার উচিত ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা। সম্ভবত আপনার স্বামী রাগের মাথায় এমন কথা বলেছেন। সময়ের সাথে সাথে তিনি ঠান্ডা হয়ে যাবেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আপনি তার সাথে ভালো ব্যবহার করুন এবং তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
৮. স্থায়ী সমাধান: আপনি যদি মনে করেন আপনার স্বামী অন্যায় করছেন, তাহলে আপনি এলাকার কোনো আলেম বা মুরুব্বির মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন। তবে তালাকের শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত বিবাহ বহাল থাকবে।
সারসংক্ষেপ:
- যতক্ষণ আপনি সিলেট না যাবেন, ততক্ষণ তালাক পতিত হবে না।
- সিলেট গেলে একটি তালাকে বায়িন পতিত হবে।
- তাই বর্তমানে সিলেট না যাওয়াই উত্তম।
- স্বামীর সাথে আলোচনা করে সমাধান বের করুন।
- মায়ের সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখুন এবং প্রয়োজনে অর্থ পাঠান।
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারে শান্তি বজায় রাখুন এবং এই সমস্যা থেকে উত্তরণের তাওফিক দিন। আমিন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৮০
- ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৪
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৬
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১২৩
- বেহেশতি জেওর, ৫/২৪