সারাক্ষন মারা যাবার ভয়

Waswasa-OCD · Hanafi

Question No: 3749
Questioner: Shahana Akter Nitu
Question Asked: 09 Aug 2026, 11:18 PM
Reviewed & Published: 09 Aug 2026, 11:24 PM
Views: 7
Tokens: 9,901
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম....

গত জুন মাস শুরু থেকে নিয়ে প্রায় ২৬-২৭ দিন আমার রুহের মধ্যে কেমন যেনো অস্থিরতা হতো আর যেটা আমাকে মনে করাতো আমি মনে হয় বেশিদিন বাঁচবো না। মাঝে মাঝে এমন হতো মনে হতো এক্ষুনি মারা যাবো বা আজকে রাতে মনে হয় মারা যাবো

কিছুদিন খাওয়া আর ঘুমের সমস্যা হয়েছিল। ঘুম থেকে উঠেও ভয় ভয় লাগতো মনে হতো আমি বেচে আছি!!

আমি খুব কান্না করতাম।তখন প্রথম কিছুদিন তাওবা করে মনে হতো আমার তাওবা খাঁটি হচ্ছে না মনে হয় আবার মনে হতো আমার ইমান নেই তবে কি আমি ইমান হারা হয়ে মৃত্যুবরণ করবো!।

তারপর ৪-৫ দিন ভালো ছিলাম খুব একটা বেশিদিন বাঁচবো না আর রুহে অস্থিরতা অনুভব হয়নি।

এখন আবার জুলাই মাসের শুরু থেকে আবার একটানা অনেকদিন রুহে অস্থিরতা থাকে যেটা কিছু সময় বন্ধ থাকে আবার শুরু হয় প্রায় বেশিরভাগ সময়ই এই অস্থিরতা থাকে আর মনে হয় আমি বেশিদিন বাঁচবো না

তারপর আবার গতো পরশু সারাদিন রাত খুব ভয়ে অস্থির ছিলাম মনে হচ্ছিলো কখন যেনো মৃত্যুটা চলে আসে। সেদিন রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে পর্যন্ত পারিনি মনে হচ্ছিলো এটাই মনে হয় শেষ রাত। কালকেও একই অবস্থা নামাজম পড়ে বার কয়েক আল্লাহর কাছে কেঁদেছি তাওবা করেছি তবুও মনে অস্থিরতা দূর হয়ে শান্তি আসেনি।
প্রায় প্রতিদিন বুকে এমন অস্থির ধরফর আর এমন অস্বস্তি লাগে মনে হয় আজকে রাতটাই শেষ রাত মারা যাবো

নামাজের মধ্যেও মৃত্যুর কথা চিন্তা হয় বারবার মাঝে মাঝে এমন হয় মনে হয় নামাজের মধ্যেই মারা যাবো

আবার মনে হয় মৃত্যুটা আমার কেমন হবে ভালো নাকি খারাপ!! মৃত্যুর যন্ত্রণা কেমন হবে এ ভেব খুবই ভয় লাগে।মনে হয় ইমানে সাথে মৃত্যুবরণ করতে পারবো তো। এ ভয় আর অস্থিরতার কারণে আমি সারাক্ষণই কাঁদি।

কোনো কাজকর্ম করিনা নিজের কোন দায়িত্ব পালনও করিনা সবসময় কেমন যেনো লাগে মনে হয় মারা যাবো বেশিদিন বাঁচবোনা।

আবার মনে হয় আমি পৃথিবী থেকে আলগা হতে শুরু করেছি আর রুহ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছি। মনে হয় আমি আমার ভেতরে নেই আমার শরীর যেনো অন্য কারও। নিষ্প্রাণ লাগে নিজেকে।

আবার মনে হয় হতে পারে এগুলো আমার রোগ বা ওয়াসওয়াসা কিন্তু মৃত্যু তো আমার ভয় দেখে পিছিয়ে যাবে না আমি তো যে কোন মুহূর্তে মারা যেতে পারি। এ ভয় থাকা অবস্থায় ও তো আমার মৃত্যু হতে পারে। কখন যেনো মৃত্যু চলে আসে।

আল্লাহ কি দিচ্ছেন আমায় এ অনুভুতি ?? মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে কি মানুষের এমন অনুভব হয় অস্থির লাগে বুকের ভিতর??


আমার কেনো এমন হচ্ছে জানাবেন প্লিজ এর কি কোন শরয়ী সমাধান আছে? এমতাবস্থায় ইসলাম আমায় কি নির্দেশ দেয়?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার সমস্যাটি আমি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার এই অবস্থাটি মূলত ওয়াসওয়াসা (وسوسہ) বা মনের অবসাদজনিত একটি অবস্থা, যা শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং মানসিক উদ্বেগের কারণে হয়ে থাকে। এটি কোনো শরয়ী সমস্যা নয়, বরং একটি মানসিক ও আত্মিক অবস্থা।

মূল কথা:

প্রথমত: মৃত্যুর ভয় প্রত্যেক মুমিনেরই থাকে, তবে আপনার বর্ণিত অস্থিরতা, "আজই মারা যাবো" মনে হওয়া, নামাজের মধ্যে মৃত্যুর চিন্তা আসা, শরীর থেকে রুহ বের হয়ে যাওয়ার অনুভূতি—এগুলো ওয়াসওয়াসার লক্ষণ। এটি কোনো বাস্তব পূর্বাভাস নয়।

দ্বিতীয়ত: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"ওয়াসওয়াসা ঈমানের দুর্বলতা থেকে আসে না, বরং এটি পরিপূর্ণ ঈমানের লক্ষণ।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩২)

অর্থাৎ, শয়তান যখন দেখে একজন বান্দা ঈমানদার, তখন সে তাকে বিভিন্ন কুমন্ত্রণা দেয়। আপনার এই ভয়ই প্রমাণ করে আপনার অন্তরে ঈমান আছে।

তৃতীয়ত: মৃত্যুর সময় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ ۚ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً ۖ وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ "প্রত্যেক জাতির জন্য একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে। যখন তাদের সময় এসে যাবে, তখন তারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে পারবে না, আর ত্বরান্বিতও করতে পারবে না।" (সূরা আল-আ'রাফ: ৩৪)

আপনার এই ভাবনা যে "আজ মারা যাবো" বা "বেশিদিন বাঁচবো না"—এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা। মৃত্যু কখন, কোথায়, কীভাবে হবে তা একমাত্র আল্লাহ জানেন।

শরয়ী সমাধান:

১. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমরা ওয়াসওয়াসা ত্যাগ করো এবং 'আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছি' বলো।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩৪)

যখনই এই চিন্তা আসবে, তখনই বলুন: "آمَنْتُ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ" (আমানতু বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি) অর্থাৎ "আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছি।"

২. নামাজে মনোযোগ:

নামাজে মৃত্যুর চিন্তা এলে তা উপেক্ষা করুন। নামাজে মনোযোগ আনার জন্য আউযুবিল্লাহ পড়ুন এবং নামাজের অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন।

৩. তাওবা ও ইস্তিগফার:

আপনি তাওবা করেছেন—এটিই যথেষ্ট। তাওবা খাঁটি হওয়ার জন্য শর্ত হলো:

  • গুনাহ ছেড়ে দেওয়া
  • অনুতপ্ত হওয়া
  • ভবিষ্যতে না করার সংকল্প

আপনার তাওবা খাঁটি না হওয়ার চিন্তা করাও ওয়াসওয়াসা। আল্লাহ বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

৪. মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তির দোয়া:

রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়েছেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের জুলুম থেকে।" (সহীহ বুখারী: ২৮৯৩)

৫. চিকিৎসা গ্রহণ করুন:

আপনার এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এটি অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা প্যানিক অ্যাটাক-এর লক্ষণ হতে পারে। একজন ভালো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের (সাইকিয়াট্রিস্ট) পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ইসলামে রোগের চিকিৎসা করা বৈধ এবং উৎসাহিত।

৬. দৈনন্দিন কাজে ফিরে আসুন:

আপনি বলেছেন কোনো কাজ করেন না, দায়িত্ব পালন করেন না। এটি ঠিক নয়। ব্যস্ততা ওয়াসওয়াসা দূর করতে সহায়ক। কাজে মনোযোগ দিন, পরিবারের সাথে সময় কাটান।

৭. মৃত্যুর সঠিক ধারণা:

মৃত্যু ভয়ের বিষয় নয়, বরং এটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের একটি মাধ্যম। যারা ঈমানদার, তাদের জন্য মৃত্যু হলো জান্নাতের দরজা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাত পছন্দ করেন।" (সহীহ বুখারী: ৬৫০৭)

ইমাম ও ফুকাহাদের বক্তব্য:

ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে এমন একটি অবস্থা যা মানুষকে ইবাদত থেকে বিরত রাখে এবং মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে। এর চিকিৎসা হলো ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪৫২)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"মৃত্যুর ভয় প্রত্যেক মানুষেরই থাকে, কিন্তু যখন এই ভয় মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা দেয় এবং ইবাদত-বন্দেগি থেকে বিরত রাখে, তখন তা ওয়াসওয়াসা হিসেবে গণ্য হবে এবং এর প্রতিকার হলো এটাকে গুরুত্ব না দেওয়া।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৮/৪৫৩)

মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

"ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো তিনটি বিষয়: (১) ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া, (২) আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকা, (৩) প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৬)

আপনার করণীয়:

  1. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার যিকির করুন (আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস)।
  2. নিয়মিত নামাজ পড়ুন এবং নামাজের পর ইস্তিগফার করুন।
  3. ডাক্তারের পরামর্শ নিন—এটি জরুরি।
  4. কাজে ব্যস্ত থাকুন—অলসতা ওয়াসওয়াসা বাড়ায়।
  5. পরিবারের সাথে সময় কাটান—একাকীত্ব এড়িয়ে চলুন।
  6. মৃত্যুর চিন্তা এলে "আমানতু বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি" বলুন এবং অন্য কাজে মনোযোগ দিন।

উপসংহার:

আপনার এই অবস্থা কোনো শরয়ী সমস্যা নয়, বরং এটি একটি মানসিক অবস্থা (ওয়াসওয়াসা/অ্যাংজাইটি)। ইসলাম আপনাকে নির্দেশ দেয়:

  • ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়ার
  • আল্লাহর উপর ভরসা রাখার
  • তাওবা অব্যাহত রাখার
  • চিকিৎসা গ্রহণের

আল্লাহ তাআলা আপনার অসুবিধা দূর করুন এবং আপনাকে শান্তি দান করুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.