কোম্পানির অধীনে চাকরিতে ঘুষ দেওয়া সম্পর্কে
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. ঘুষের শারঈ বিধান
ঘুষ (রিশওয়াত) ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং জেনেশুনে মানুষের সম্পদের এক অংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে শাসকদের কাছে তা পেশ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ "রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুষদাতা এবং ঘুষগ্রহীতাকে অভিশাপ দিয়েছেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮০, সুনানে তিরমিজি: ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ: ২৩১৩)
ইমাম তিরমিজি (রহ.) এই হাদিসটি সহিহ বলেছেন। হাদিসে আরও এসেছে:
وَالرَّائِشَ অর্থাৎ "এবং যে মধ্যস্থতাকারী" (ঘুষ আদান-প্রদানে সাহায্যকারী) - তিনিও অভিশপ্ত। (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪১৮)
২. ঘুষ প্রদানে সহায়তা করার বিধান
ঘুষ প্রদানে সহায়তা করা বা ঘুষ পৌঁছে দেওয়াও হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ৫)
তাই ঘুষ আদান-প্রদানে সহায়তা করা, ঘুষের টাকা পৌঁছে দেওয়া বা ঘুষের ব্যবস্থা করা—সবই নিষিদ্ধ।
৩. আপনার চাকরির বিধান
আপনি কোম্পানির ট্যাক্স ও ভ্যাট সেকশনে চাকরি করেন এবং মাঝে মাঝে আপনাকে কোম্পানির হয়ে ট্যাক্স অফিসে ঘুষ দিতে হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা:
(ক) ঘুষ প্রদানকারী হিসেবে আপনার অবস্থান
আপনি যদি সরাসরি ঘুষ প্রদান করেন (টাকা বা উপহার ঘুষগ্রহীতার কাছে পৌঁছে দেন), তাহলে আপনি ঘুষদাতা হিসেবে গণ্য হবেন। হাদিসে ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা এবং মধ্যস্থতাকারী—সবাইকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। তাই আপনার পক্ষ থেকে ঘুষ প্রদান করা সম্পূর্ণ হারাম।
(খ) চাকরির বৈধতা
আপনার চাকরির মূল কাজ যদি বৈধ হয় (যেমন: ট্যাক্স রিটার্ন প্রস্তুত করা, হিসাব-নিকাশ করা, কাগজপত্র তৈরি করা) কিন্তু সাথে সাথে ঘুষ প্রদানের কাজও করতে হয়, তাহলে:
- মূল চাকরি বৈধ হতে পারে, কিন্তু ঘুষ প্রদানের কাজটি হারাম।
- আপনি যদি ঘুষ প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে পারেন এবং শুধু বৈধ কাজগুলো করতে পারেন, তাহলে আপনার চাকরি বৈধ থাকবে।
- কিন্তু যদি ঘুষ প্রদান আপনার চাকরির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় এবং আপনি তা করতে বাধ্য হন, তাহলে সেই ঘুষ প্রদানের কাজটি আপনার জন্য হারাম হবে।
(গ) বাধ্য হয়ে ঘুষ দেওয়া
আপনি বলেছেন "বাধ্য হয়ে" ঘুষ দিতে হয়। ইসলামে "ইকরাহ" (জবরদস্তি) এর শর্ত হলো:
- প্রাণনাশের ভয়
- অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতির ভয়
- গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের ভয়
কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় বা আর্থিক ক্ষতির ভয় দ্বারা জবরদস্তি প্রমাণিত হয় না। তাই চাকরি হারানোর ভয়ে ঘুষ দেওয়া জায়েয হবে না।
তবে যদি আপনার জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে ভিন্ন বিধান হতে পারে।
৪. করণীয়
আপনার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত:
(ক) ঘুষ প্রদান থেকে বিরত থাকা
আপনি যতটুকু সম্ভব ঘুষ প্রদানের কাজটি এড়িয়ে চলুন। আপনি আপনার সুপিরিয়রকে জানিয়ে দিন যে, ইসলামী বিধান অনুযায়ী আপনি ঘুষ প্রদান করতে পারবেন না।
(খ) বৈধ উপায়ে কাজ করার চেষ্টা
ট্যাক্স অফিসে বৈধ উপায়ে কাজ করার চেষ্টা করুন। অনেক সময় সঠিকভাবে কাগজপত্র প্রস্তুত করলে ঘুষের প্রয়োজন হয় না।
(গ) চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা
যদি ঘুষ প্রদান আপনার চাকরির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে এবং আপনি তা এড়াতে না পারেন, তাহলে অন্য চাকরি খোঁজার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
(ঘ) ঘুষের টাকা নিজের জন্য গ্রহণ না করা
আপনি যদি ঘুষের টাকা নিজের জন্য গ্রহণ না করেন এবং শুধু পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন, তবুও আপনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুনাহগার হবেন। তবে আপনার বেতন যদি বৈধ কাজের বিনিময়ে হয়, তাহলে সেই বেতন আপনার জন্য হালাল হবে।
৫. ফিকহী আলোচনা
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"ঘুষ প্রদান ও গ্রহণ করা হারাম। ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা এবং মধ্যস্থতাকারী—সবাই গুনাহগার।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬০)
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (আলমগীরি) বলা হয়েছে:
"রিশওয়াত (ঘুষ) হারাম। যে ব্যক্তি ঘুষ দেয় বা গ্রহণ করে, সে গুনাহগার।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৬৩)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"ঘুষ দেওয়া-নেওয়া উভয়ই হারাম। যে ব্যক্তি ঘুষের মাধ্যমে কোনো কাজ করিয়ে নেয়, তার সেই কাজও বৈধ হবে না।" (মা'আরিফুল কুরআন: ২/১৮৮)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"ঘুষ প্রদান করা, গ্রহণ করা এবং তাতে মধ্যস্থতা করা—সবই হারাম। কোনো ব্যক্তি যদি এমন চাকরিতে থাকে যেখানে ঘুষ দিতে হয়, তাহলে তার উচিত সেই কাজ থেকে বিরত থাকা এবং সম্ভব হলে চাকরি পরিবর্তন করা।" (ফতোয়ায়ে উসমানি: ২/৩৮৫)
৬. সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
-
ঘুষ প্রদান করা হারাম — আপনি ব্যক্তিগতভাবে ঘুষের লেনদেনে জড়িত না থাকলেও, আপনি যদি ঘুষের টাকা পৌঁছে দেন, তাহলে আপনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুনাহগার হবেন।
-
আপনার চাকরি সম্পূর্ণ হারাম হবে না — কারণ আপনার চাকরির মূল কাজ (ট্যাক্স ও ভ্যাট সংক্রান্ত বৈধ কাজ) বৈধ। তবে ঘুষ প্রদানের কাজটি হারাম।
-
বাধ্য হয়ে ঘুষ দেওয়া জায়েয নয় — চাকরি হারানোর ভয় দ্বারা জবরদস্তি প্রমাণিত হয় না। তাই আপনাকে ঘুষ প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে।
-
করণীয় — ঘুষ প্রদান থেকে বিরত থাকুন, সুপিরিয়রকে জানান, বৈধ উপায়ে কাজ করার চেষ্টা করুন এবং সম্ভব হলে চাকরি পরিবর্তন করুন।
উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থসমূহ:
- কুরআনুল কারিম (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮, সূরা আল-মায়িদা: ৫, সূরা আত-তালাক: ২-৩)
- সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হারাম থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।