বিবাহপূর্ব সম্পর্ক, আশা দেওয়া এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা, ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে চাই??
Halal and Haram · Hanafi
Question
তোর সঙ্গে আমার কোনো অভিমান নেই, রাগও নেই। বরং আল্লাহ জানেন, আমি তোকে সম্মান করি বলেই এই সিদ্ধান্ত নিসি।আমরা দুজনই একে অপরকে হালালভাবে চাইসি। তাই আমি চাই না, আমাদের মধ্যে এমন কিছু থাকুক যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। যদি আমাদের ভাগ্যে এক হওয়া লেখা থাকে, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই হালাল পথেই আমাদের মিলিয়ে দেবেন।
আর তাঁর সিদ্ধান্ত ই উত্তম। তাই এখন থেকে আমি অপ্রয়োজনীয় ফোন বা নিয়মিত কথা বলা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাই।
এটা তোকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য।যদি সত্যিই আমাকে চাস, তাহলে আমার এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করিস।
আমার জন্য দোয়া কর, আমিও তোর জন্য দোয়া করব। আমরা দুজনই আল্লাহর কাছে চাইব তিনি যদি আমাদের জন্য কল্যাণকর মনে করেন, তাহলে যেন সহজ ও হালালভাবে আমাদের এক করে দেন।আমি চাই, কিয়ামতের দিন আমাদের সম্পর্কের কারণে যেন কোনো আফসোস না থাকে; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হোক।
আল্লাহ হাফেজ
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন/ভাই, আপনার বার্তাটি অত্যন্ত সুন্দর, পরিণত ও ইসলামী আদর্শে পরিপূর্ণ। আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা আপনার এই নেক নিয়তে বরকত দান করুন এবং আপনার জন্য কল্যাণের ফয়সালা করুন। (আমিন)
আপনার প্রশ্নের উত্তরে, আপনি যা করেছেন এবং যা বলতে চেয়েছেন, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তা সম্পূর্ণ সঠিক ও কাম্য। আসুন, বিষয়টি কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বুঝে নিই।
১. অবৈধ সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার গুরুত্ব
ইসলামে বিবাহপূর্ব বা বিবাহবহির্ভূত নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, প্রেম-প্রণয় এবং গোপন কথোপকথন সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)
এই আয়াতে শুধু ব্যভিচারই নয়, বরং এর দিকে নিয়ে যাওয়া সকল পথ (যেমন: প্রেম, অবৈধ সম্পর্ক, একান্তে দেখা-সাক্ষাৎ) বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, যে পথে পাপ পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে, তা-ও হারাম।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"দুই চোখের যিনা হলো (হারাম দিকে) তাকানো, দুই কানের যিনা হলো (অশ্লীল) কথা শোনা, জিহ্বার যিনা হলো (অশ্লীল) কথা বলা, হাতের যিনা হলো (হারাম বস্তু) স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হলো (হারাম স্থানে) পা চালনা করা; আর অন্তর তা কামনা করে এবং লজ্জাস্থান তা সত্যি করে বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।" (সহীহ মুসলিম: ২৬৫৭)
আপনি "অপ্রয়োজনীয় ফোন বা নিয়মিত কথা বলা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চান" — এটি অবিকল এই হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ। এটি কোনো অভিমান বা দূরত্ব সৃষ্টির জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজেদের ঈমান হিফাজতের জন্য অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।
২. "আশা দেওয়া" বা "সম্ভাবনার সম্পর্ক" রাখার বিধান
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, "এখানে কি কাউকে আশা দিয়ে রাখা বোঝাচ্ছে?"
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে একে অপরকে "আশা দেওয়া" বা "সম্ভাবনার সম্পর্কে" রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, বিয়ে একটি চুক্তি (নিকাহ), যা নির্দিষ্ট শর্ত ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বিয়ের আগে একে অপরকে ভালোবাসার কথা বলা, "আমি তোমাকে বিয়ে করব" এই আশ্বাস দেওয়া বা সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা ইসলামসম্মত নয়।
তবে, আপনার বার্তার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আপনি কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার আশা দিচ্ছেন না; বরং আপনি বলছেন— "যদি আমাদের ভাগ্যে এক হওয়া লেখা থাকে, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই হালাল পথেই আমাদের মিলিয়ে দেবেন।" এটি কোনো আশা দেওয়া নয়, বরং এটি হলো তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) এবং তাসলিম (আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণ)। আপনি আল্লাহর উপর নির্ভর করছেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত মনে করছেন। এটি একজন মুমিনের ঈমানদার মনোভাব।
আপনি যা করেছেন, তা হলো:
- সীমারেখা নির্ধারণ: অবৈধ সম্পর্কের পথ বন্ধ করে দেওয়া।
- আল্লাহর উপর ভরসা: বিয়ে যদি হয়, তবে তা হালাল পথেই হবে।
- দোয়ার ওয়াদা: একে অপরের জন্য কল্যাণ কামনা করা।
এটি কোনো "আশা দেওয়া" নয়, বরং এটি হলো সৎ উদ্দেশ্যে সম্পর্কটিকে পবিত্র রাখার সংকল্প। ইসলামে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখতে পারে (দেখা-সাক্ষাতের অনুমতি আছে), কিন্তু অবৈধ সম্পর্ক বা গোপন প্রেমের কোনো সুযোগ নেই।
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহ ও রদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, নারী-পুরুষের মধ্যে এমন কোনো সম্পর্ক রাখা জায়েয নয়, যা বিয়ের বন্ধন ছাড়া চলে। ফিকহবিদগণ বলেন, "বেগানা নারী-পুরুষের জন্য একে অপরের সাথে প্রেম-প্রণয়ের সম্পর্ক রাখা, গোপন কথাবার্তা বলা বা দেখা-সাক্ষাৎ করা হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৯ম খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা নূরের তাফসীরে বলেন, "মুসলিম সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও প্রেম-প্রণয় ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। ঈমানদারদের জন্য একমাত্র পথ হলো, বিয়ের মাধ্যমে সম্পর্ককে পবিত্র করা।"
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন, "বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। বিয়ের আগে কোনো নারী-পুরুষের মধ্যে 'বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড' বা 'প্রেমের সম্পর্ক' রাখা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এই সম্পর্ক থেকে তওবা করা ফরজ।"
আপনার সিদ্ধান্তটি অবিকল এই ফিকহি নির্দেশনারই প্রতিফলন। আপনি হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
৪. আপনার জন্য দিকনির্দেশনা ও দোয়া
আপনার এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সাহসী ও ঈমানদীপ্ত। আপনি যদি সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চান, তাহলে ইসলামী পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
১. পরিবারের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠান: আপনার বা তার পরিবারের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। এটি সবচেয়ে সম্মানজনক ও বরকতময় পদ্ধতি। ২. দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ: ইসলাম বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাত্র-পাত্রীকে একে অপরকে দেখার অনুমতি দিয়েছে, তবে তা পরিবারের উপস্থিতিতে এবং শরয়ী পর্দার মধ্যে হতে হবে। ৩. ইস্তেখারা করুন: আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করুন। তিনি যদি আপনার জন্য কল্যাণ মনে করেন, তাহলে তিনি পথ সহজ করে দেবেন। ৪. দোয়া চালিয়ে যান: আপনার বার্তায় যেমন বলেছেন, একে অপরের জন্য দোয়া করতে থাকুন। আল্লাহর কাছে ভালোবাসা ও সম্পর্কের কল্যাণ প্রার্থনা করুন।
আপনার জন্য দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَذَا الْأَمْرُ خَيْرًا لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ "হে আল্লাহ! যদি এই বিষয়টি আমার জন্য আমার দ্বীন, আমার জীবিকা এবং আমার পরিণতির দিক থেকে কল্যাণকর হয়, তবে আপনি এটি আমার জন্য নির্ধারিত করুন, সহজ করে দিন এবং এতে বরকত দিন।"
মনে রাখবেন, "আল্লাহর সিদ্ধান্তই উত্তম।" আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেন, তবে আল্লাহ আপনাকে এমন কিছু দেবেন, যা আপনার জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হবে। কিয়ামতের দিন কোনো আফসোস না থাকার জন্য আপনি যে চিন্তা করেছেন, এটি অত্যন্ত উচ্চমানের ঈমানের পরিচায়ক।
আল্লাহ তায়ালা আপনার এই নেক নিয়তকে কবুল করুন, আপনার ঈমান ও আমলকে মজবুত করুন এবং আপনাকে হালাল ও পবিত্র পথে আপনার কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ দান করুন। (আমিন)
আল্লাহ হাফেজ।