দুনিয়াবি পড়াশুনা,পরিবার চায় চাকুরী করতে এবং চাকরিরত পাত্রের সাথে বিয়ে দিতে,কি করণীয়??
Family Life · Hanafi
Question
পড়াশুনা আমার মাথায়ও ঢুকছে না।
এমতাবস্থায় কি করনীয় আমার?
আমার জামাই ও দ্বীনহিন।
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি এবং আপনার জন্য দুআ করছি। আসুন, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
দুনিয়াবি শিক্ষা ও চাকরির ইসলামী বিধান
দুনিয়াবি শিক্ষা অর্জন করা এবং চাকরি করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং এটি জায়েয, যদি তা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে করা হয়। কুরআন ও হাদীসে জ্ঞান অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং হালাল উপার্জনের মাধ্যমে নিজেকে ও পরিবারকে সৎভাবে পরিচালনা করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?" (সূরা আয-যুমার: ৯)
আপনার করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ
১. আত্মহত্যা বা হতাশা কখনোই সমাধান নয়
আপনি বলেছেন "বিয়ে করে দুনিয়া আখিরাত দুটোই শেষ করে ফেললাম" - এটি শয়তানের প্ররোচনা। ইসলামে হতাশা ও নিরাশা নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
২. পড়াশুনা ও চাকরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত
আপনি যদি মন থেকে দুনিয়াবি পড়াশুনা ও চাকরি না করতে চান, তবে এটি আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে মনে রাখবেন:
- পড়াশুনা করা জায়েয - যদি তা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে হয় (পর্দার নিয়ম মেনে, গুনাহের কাজ থেকে দূরে থেকে)
- চাকরি করা জায়েয - যদি তা হালাল হয় এবং পর্দার নিয়ম মেনে করা সম্ভব হয়
- স্বামীর অনুমতি - স্ত্রীর জন্য চাকরি করা বৈধ, তবে স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে
৩. স্বামীর দ্বীনহীন হওয়া
আপনার স্বামী দ্বীনহীন - এটি আপনার জন্য কঠিন পরিস্থিতি। তবে মনে রাখবেন, আপনার কর্তব্য হলো তাকে দ্বীনের পথে আহ্বান করা, উত্তম আচরণের মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী)
৪. মা-বাবার সাথে কথা বলা
আপনার উচিত মা-বাবার সাথে খোলাখুলি কথা বলা। তবে সেটা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে। তাদের বলুন আপনার অনুভূতির কথা। ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য ফরজ, তবে গুনাহের কাজে নয়। পড়াশুনা ও চাকরি গুনাহ নয়, তাই এখানে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৫. দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করুন
যেহেতু আপনি দুনিয়াবি পড়াশুনায় মনোযোগী নন, তাই দ্বীনি ইলম অর্জনের চেষ্টা করুন। এটি আপনার আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হবে। হাদীসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।" (মুসলিম)
ফিকহী দৃষ্টিকোণ
হানাফী মাযহাবের আলোকে, দুনিয়াবি শিক্ষা অর্জন করা এবং চাকরি করা জায়েয, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- পর্দার নিয়ম মেনে চলা - মহিলাদের জন্য পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশা করা জায়েয নয়
- হালাল উপার্জন - চাকরি বা ব্যবসা হালাল হতে হবে
- স্বামীর অনুমতি - স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়া জায়েয নয়
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, মহিলাদের জন্য ঘরে থাকা উত্তম, তবে প্রয়োজনে বৈধ কাজের জন্য বের হওয়া জায়েয।
ব্যবহারিক পরামর্শ
-
আল্লাহর উপর ভরসা করুন - তাওয়াক্কুল করুন। আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে তিনি উত্তম পথ দেখাবেন।
-
নামায ও দুআতে মনোযোগী হোন - ফজরের নামাযের পর দুআ করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।" (সূরা গাফির: ৬০)
-
স্বামীর সাথে কথা বলুন - আপনার অনুভূতির কথা তাকে জানান। দ্বীনহীন হলেও তাকে দ্বীনের দাওয়াত দিন।
-
মা-বাবার সাথে আলোচনা করুন - তাদেরকে জানান আপনার মানসিক অবস্থা। তারা আপনার ভালো চান, তাই তারা বুঝবেন।
-
দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করুন - বাসায় দ্বীনি আলোচনা, কুরআন তিলাওয়াতের চেষ্টা করুন।
শেষ কথা
আপনি যদি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে জোর করে চালিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। তবে মা-বাবা ও স্বামীর সাথে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছান। মনে রাখবেন, ইসলামে বাধ্য হয়ে কিছু করা নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ কারো উপর এমন দায়িত্ব চাপান না যা তার সামর্থ্যের বাইরে।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
আপনার জন্য দুআ করছি, আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমীন।