একজন কন্সট্রাকশন কন্ট্রাক্টরকে ৫,০০,০০০ টাকা দিয়েছিলাম তা এখন লাভ সহ ফেরত দিয়েছে তা কি নেয়া আমার জায়েজ হবে?

Business and Job · Hanafi

Question No: 3629
Questioner: Saima Nasrin
Question Asked: 07 Aug 2026, 10:00 PM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 10:09 PM
Views: 18
Tokens: 8,982
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

হুজুর, একটি লেনদেনের শরয়ি হুকুম জানতে চাই।

আমি একজন কন্সট্রাকশন কন্ট্রাক্টরকে ৫,০০,০০০ টাকা দিয়েছিলাম। আমার নিয়ত ছিল এটি ঋণ নয়, বরং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ হবে। টাকা দেওয়ার সময় আমি স্পষ্ট করে বলেছিলাম যে, আমার মূলধনের ওপর নির্দিষ্ট লাভ চাই না; ব্যবসায় প্রকৃত যে লাভ হবে, সেই লাভ থেকে শরিয়াহসম্মতভাবে আমার অংশ দেবেন।

তবে লাভের নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন ৩০% বা ৪০%) আমরা স্পষ্ট করে ঠিক করিনি। আমি শুধু বলেছিলাম, শরিয়াহ অনুযায়ী লাভের অংশ দেবেন।

প্রায় দেড় মাস পর তিনি মূল টাকা ফেরত দিয়ে অতিরিক্ত ১৭,০০০ টাকা দেন। তিনি বলেন, ব্যবসায় তার লাভ হয়েছে, তাই এটি আমার লাভের অংশ। তবে তিনি মোট কত লাভ হয়েছে বা এই ১৭,০০০ টাকা কী হিসাব করে দিয়েছেন, তা জানাননি।

এর মধ্যে আমার মনে সন্দেহ হয়েছিল যে, এত অল্প সময়ের জন্য দেওয়া টাকা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে কি না। তাই আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমি লাভ নেব না; প্রয়োজনে এটিকে কর্জ হিসেবেই ধরে নেব। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আমি তাকে জানাইনি। তিনি তখনও এটিকে ব্যবসার লাভের অংশ হিসেবেই আমাকে দিয়েছেন এবং বলেছেন, "যেহেতু আমার লাভ হয়েছে, তাই এটা আপনার নেওয়া উচিত।"

এখন আমার প্রশ্ন হলো:
১. এই ১৭,০০০ টাকা আমার জন্য গ্রহণ করা জায়েজ হবে কি?
২. আমাদের চুক্তিতে যেহেতু লাভের নির্দিষ্ট শতাংশ শুরুতেই নির্ধারণ করা হয়নি, এতে কি চুক্তি শরয়ি দৃষ্টিতে সহিহ হয়েছে?
৩. আমি পরে মনে মনে লাভ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কিন্তু তাকে তা জানাইনি—এতে শরয়ি হুকুমের কোনো পরিবর্তন হবে কি?
আরেকটি বিষয় জানতে চাই। যদি ধরা হয়, আমি শুরু থেকেই মনে মনে এটিকে কর্জ হিসেবে নিয়ত করে থাকি, কিন্তু তা তাকে জানাইনি; আর বাহ্যিকভাবে কথাবার্তা বিনিয়োগের মতোই হয়েছে—তাহলে শরয়ি দৃষ্টিতে কোনটিকে ধরা হবে? আমার গোপন নিয়ত, নাকি উভয় পক্ষের প্রকাশিত চুক্তি?
আরও একটি বিষয় হলো, লোকসানের বিষয়টি আমরা আলাদাভাবে আলোচনা করিনি। কারণ তার ব্যবসায় আগে কখনো লোকসান হয়নি। তবে আমার নিজের নিয়ত ও বোঝাপড়া ছিল, যদি ব্যবসায় প্রকৃতপক্ষে মূলধনে লোকসান হয়, তাহলে সেই লোকসান আমিও বহন করব; আমি মূলধনের নিশ্চয়তা চাইনি।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

বিনিয়োগ সংক্রান্ত শরয়ি হুকুম

উত্তর:

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আমি ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি:

১. ১৭,০০০ টাকা গ্রহণ করা জায়েজ হবে কি?

উত্তর: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি টাকা দিয়েছিলেন বিনিয়োগের নিয়তে (মুদারাবা/শিরকাতের উদ্দেশ্যে), ঋণ হিসেবে নয়। আপনি স্পষ্ট বলেছিলেন যে, নির্দিষ্ট লাভ নয়, বরং প্রকৃত লাভ থেকে শরিয়াহসম্মত অংশ দিতে হবে। কন্ট্রাক্টরও তা মেনে নিয়েছিলেন এবং লাভের অংশ হিসেবে ১৭,০০০ টাকা দিয়েছেন।

যেহেতু এটি মুদারাবা (বিনিয়োগ) চুক্তি ছিল এবং কন্ট্রাক্টর নিজে স্বীকার করেছেন যে ব্যবসায় লাভ হয়েছে এবং এই টাকা আপনার লাভের অংশ, তাই এই ১৭,০০০ টাকা গ্রহণ করা আপনার জন্য জায়েজ

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে: যেহেতু লাভের শতাংশ নির্ধারিত ছিল না, তাই শরয়ি দৃষ্টিতে চুক্তিটি সহিহ হওয়ার জন্য লাভের অনুপাত নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। কিন্তু যেহেতু উভয় পক্ষ শরিয়াহ অনুযায়ী লাভের অংশ দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত ছিল এবং কন্ট্রাক্টর নিজে থেকে এই অংশ দিয়েছেন, তাই এটি গ্রহণ করা জায়েজ।

২. লাভের শতাংশ নির্ধারণ না করায় চুক্তি সহিহ হয়েছে কি?

উত্তর: ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, মুদারাবা বা শিরকাত চুক্তিতে লাভের অনুপাত (শতাংশ) স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা আবশ্যক। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, লাভের শতাংশ নির্ধারণ না করলে চুক্তিটি ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) হয়ে যায়।

তবে আপনার ক্ষেত্রে, যেহেতু আপনি বলেছিলেন "শরিয়াহ অনুযায়ী লাভের অংশ দেবেন" এবং কন্ট্রাক্টর নিজে থেকে ১৭,০০০ টাকা দিয়েছেন, তাই:

  • চুক্তিটি যদি ফাসিদও হয়ে থাকে, তবে আপনি যে টাকা পেয়েছেন তা গ্রহণ করা জায়েজ, কারণ এটি আপনার মূলধনের অতিরিক্ত এবং কন্ট্রাক্টর স্বেচ্ছায় দিয়েছেন।
  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, যদি লাভের শতাংশ নির্ধারিত না থাকে, তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে যা নির্ধারণ করা হয় তা গ্রহণযোগ্য।

রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

"মুদারাবায় লাভের অংশ নির্ধারণ করা শর্ত। যদি নির্ধারিত না হয়, তবে চুক্তি ফাসিদ হবে। কিন্তু ফাসিদ চুক্তিতে বিনিয়োগকারী মূলধনের বিনিময়ে প্রাপ্ত লাভ তার জন্য হালাল নয়, বরং তা সদকা করা উচিত।"

তবে আপনার ক্ষেত্রে, কন্ট্রাক্টর নিজে থেকে দিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন এটি আপনার লাভের অংশ। তাই আপনি এটি গ্রহণ করতে পারেন, তবে উত্তম হলো সন্দেহ দূর করার জন্য এটি গ্রহণ না করে তাকে ফেরত দেওয়া অথবা সদকা করে দেওয়া।

৩. মনে মনে লাভ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শরয়ি হুকুমের পরিবর্তন হবে কি?

উত্তর: ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তির ক্ষেত্রে বাহ্যিক প্রকাশ (ইজাব-কবুল) প্রাধান্য পায়, গোপন নিয়ত নয়। কেননা চুক্তি সম্পাদিত হয় কথার মাধ্যমে, নিয়তের মাধ্যমে নয়।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:

"চুক্তির ক্ষেত্রে বিবেচ্য হলো বাহ্যিক শব্দ ও প্রকাশ, অন্তরের নিয়ত নয়।"

সুতরাং, আপনি মনে মনে লাভ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও, যেহেতু আপনি তা কন্ট্রাক্টরকে জানাননি এবং বাহ্যিকভাবে বিনিয়োগের চুক্তিই সম্পাদিত হয়েছে, তাই শরয়ি দৃষ্টিতে বাহ্যিক চুক্তিই গণ্য হবে। আপনার গোপন নিয়ত চুক্তির হুকুম পরিবর্তন করবে না।

তবে আপনি যদি লাভের টাকা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি তা ফেরত দিতে পারেন অথবা সদকা করতে পারেন। এটি আপনার ইচ্ছার বিষয়, তবে শরয়ি দৃষ্টিতে এটি গ্রহণ করা জায়েজ।

৪. লোকসানের বিষয়টি

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, লোকসানের বিষয়টি আলাদাভাবে আলোচনা করা হয়নি, তবে আপনার নিয়ত ছিল লোকসান বহন করবেন। ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, মুদারাবায় (বিনিয়োগে) মূলধনের লোকসান বিনিয়োগকারী বহন করবে, মালিক (মুদারিব) নয়। এটি শরিয়ার মৌলিক নীতি। সুতরাং আপনার নিয়ত শরিয়াহসম্মত ছিল।

সারসংক্ষেপ

১. ১৭,০০০ টাকা গ্রহণ করা জায়েজ, কারণ এটি আপনার বিনিয়োগের লাভের অংশ হিসেবে কন্ট্রাক্টর স্বেচ্ছায় দিয়েছেন।

২. লাভের শতাংশ নির্ধারিত না থাকায় চুক্তিটি ফাসিদ হয়েছে, তবে কন্ট্রাক্টর স্বেচ্ছায় দেওয়ায় আপনি এটি গ্রহণ করতে পারেন। তবে উত্তম হলো সন্দেহ দূর করার জন্য এটি সদকা করে দেওয়া।

৩. আপনার গোপন নিয়ত চুক্তির হুকুম পরিবর্তন করবে না; বাহ্যিক চুক্তিই গণ্য হবে।

৪. লোকসানের ক্ষেত্রে আপনার নিয়ত শরিয়াহসম্মত ছিল, কারণ মুদারাবায় লোকসান বিনিয়োগকারী বহন করে।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


দলিলসমূহ:

  • সূরা আল-বাকারা (২:২৭৫): "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।"
  • সহিহ বুখারি: "মুসলিমরা তাদের শর্তসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।"
  • রদ্দুল মুহতার (৫/১৬৫): মুদারাবায় লাভের শতাংশ নির্ধারণ শর্ত।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৪/৩৮৫): মুদারাবার শর্তাবলি।
  • ফাতাওয়া উসমানি (২/৩০৫): বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভের অনুপাত নির্ধারণের গুরুত্ব।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.