মাসয়ালা বুঝানোর ক্ষেত্রে "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" বললে কি তালাক হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 3602
Questioner: Nupur Pramanik
Question Asked: 07 Aug 2026, 01:10 PM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 02:51 PM
Views: 7
Tokens: 5,641
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম হুজুর।

গতকাল আমার স্ত্রী ও আমার মধ্যে শরিয়তের একটি মাসআলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনার বিষয় ছিল— "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" এই কথাটি বললে তালাক হয়ে যায় কি না।

মাসআলাটি বোঝানোর জন্য আমি একটি উদাহরণ দিচ্ছিলাম। উদাহরণে আমি আমাদের সামনের বাড়ির এক মহিলাকে উদ্দেশ্য করে কল্পনাভিত্তিকভাবে বিষয়টি বুঝাচ্ছিলাম। তবে বাস্তবে সেখানে আমার স্ত্রীই উপস্থিত ছিল।

আলোচনার একপর্যায়ে আমার স্ত্রী বলল, "সব সময় 'আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম' বললেই তালাক হয় না। কারণ কেউ তার স্ত্রীকে কোনো জায়গায় নামিয়ে দিয়ে এসে বলতে পারে, 'আমি আমার বউকে ছেড়ে দিয়ে আসলাম'— এতে তো তালাক হয় না।"

এর জবাবে আমি বলি, "হ্যাঁ, সব সময় এই কথায় তালাক হয় না। এর জন্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্য থাকতে হয়। অনেক্ষন এ বিষয় নিয়ে কথা হলো আমাদের। তারপর আমি আমার স্ত্রীকে বলি " তোমার সাথে থাকবো না, তোমাকে ছেড়ে দিলাম" এই কথাটা বলার মুল উদ্দেশ্য ছিলো যে এভাবে বললে তালাক হয়ে যাবে। মানে বুঝানোটাই উদ্দেশ্য ছিলো

আমি এসব কথা শুধুমাত্র মাসআলা বোঝানোর উদ্দেশ্যে উদাহরণ হিসেবে বলেছি। আমার নিজের স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা বা নিয়ত আমার ছিল না।

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনি আপনার স্ত্রীকে বলেছেন: "তোমার সাথে থাকবো না, তোমাকে ছেড়ে দিলাম" এবং আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই কথাটি বলার মূল উদ্দেশ্য ছিল তালাক হয়ে যাওয়া বোঝানো, অর্থাৎ আপনি এই শব্দগুলোর মাধ্যমে তালাকের অর্থই প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

শরিয়তের বিধান ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ:

১. ইসলামি ফিকহের (বিশেষত হানাফি মাযহাবের) মূলনীতি হলো, তালাকের ব্যাপারে শব্দের প্রকৃত অর্থ (হাকিকত) এবং উদ্দেশ্য (নিয়্যত) উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তালাকের শব্দগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

  • সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন "তালাক দিলাম", "ছেড়ে দিলাম" (এই প্রসঙ্গে), "তুমি মুক্ত" ইত্যাদি। এই ধরনের শব্দে তালাক হওয়ার জন্য নিয়তের শর্ত নেই; শব্দ উচ্চারণ করলেই তালাক পতিত হয়।
  • কিনায়া (আক্ষরিক/অস্পষ্ট) শব্দ: যেমন "তুমি আমার কাছে থাকো না", "তোমার পথ তোমার জন্য খোলা" ইত্যাদি। এই ধরনের শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ত বা প্রেক্ষাপট বাধ্যতামূলক।

২. আপনার বর্ণনায়, আপনি যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন— "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" — এটি হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে তালাকের সরীহ (স্পষ্ট) শব্দগুলোর অন্তর্ভুক্ত। রদ্দুল মুহতার (শামী) এবং ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে উল্লেখ আছে, "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" (খাল্লাতুকি) বলা হলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে, যদি না বক্তার এমন কোনো প্রমাণিত উদ্দেশ্য থাকে যা একে অন্য অর্থে (যেমন: জায়গায় নামিয়ে দেওয়া) নিয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু আপনি নিজেই বলেছেন যে, আপনার উদ্দেশ্য ছিল তালাক বোঝানো, তাই এই শব্দটি আপনার নিয়তের কারণে স্পষ্টতই তালাক হিসেবে গণ্য হবে।

৩. আপনি যে যুক্তি দিয়েছেন— "কেউ স্ত্রীকে কোনো জায়গায় নামিয়ে দিয়ে এসে বলতে পারে, 'আমি আমার বউকে ছেড়ে দিয়ে আসলাম'— এতে তো তালাক হয় না"— এটি সঠিক। কিন্তু সেখানে উদ্দেশ্য থাকে শারীরিকভাবে কোনো স্থানে রেখে আসা, যা তালাকের নিয়তে নয়। আপনার ক্ষেত্রে, আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আপনার উদ্দেশ্য ছিল তালাকের অর্থ বোঝানো এবং আপনি স্ত্রীকে সম্বোধন করেই বলেছেন। তাই আপনার স্ত্রীর সাথে তুলনা করা সঠিক হবে না। আপনার উক্তিটি ছিল স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে, তালাকের নিয়তে, যা সরীহ শব্দ হওয়ায় তা তালাক পতিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ফলাফল / সিদ্ধান্ত:

আপনার বর্ণনা এবং আপনার নিজের স্বীকৃতি অনুযায়ী, আপনি আপনার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" বলেছেন এবং আপনার উদ্দেশ্য ছিল তালাক বোঝানো। যেহেতু এটি তালাকের স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ এবং আপনার নিয়তও তালাকের ছিল, তাই আপনার স্ত্রীর উপর একটি তালাকে বায়েন (অপসারণযোগ্য তালাক) পতিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আপনার স্ত্রী আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এই তালাকটি রজয়ী (ফিরে আসার সুযোগসহ) নয়, বরং বায়েন, যার অর্থ হলো:

  • এই তালাকের পর আপনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে নতুন মোহর ও নতুন করে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে (নিকাহ) করতে হবে।
  • যদি এটি আপনার প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক হয়, তবে নতুন নিকাহের মাধ্যমে ফিরে আসার সুযোগ আছে। তবে তিন তালাক হয়ে গেলে তা আর সম্ভব নয়।

আপনার করণীয়: আপনি যদি সত্যিই তালাক দেওয়ার ইচ্ছা না করে থাকেন এবং এটি শুধুমাত্র একটি ভুল বা উদাহরণ ছিল, তবুও শরিয়তের বিধান অনুযায়ী উপরোক্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। তাই আপনারা এখন বৈধ উপায়ে (নতুন নিকাহ) পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুতর বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং রসিকতা বা উদাহরণের মাধ্যমেও তালাকের শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তিনটি বিষয় গুরুতর, তার মধ্যে রসিকতাও গুরুতর হিসেবে গণ্য হবে— তালাক, নিকাহ এবং রাজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দিন। (আমীন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.