তালাকের শব্দ ও নিয়ত প্রসঙ্গে।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
গতকাল আমার স্ত্রী ও আমার মধ্যে শরিয়তের একটি মাসআলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনার বিষয় ছিল— "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" এই কথাটি বললে তালাক হয়ে যায় কি না।
মাসআলাটি বোঝানোর জন্য আমি একটি উদাহরণ দিচ্ছিলাম। উদাহরণে আমি আমাদের সামনের বাড়ির এক মহিলাকে উদ্দেশ্য করে কল্পনাভিত্তিকভাবে বিষয়টি বুঝাচ্ছিলাম। তবে বাস্তবে সেখানে আমার স্ত্রীই উপস্থিত ছিল।
আলোচনার একপর্যায়ে আমার স্ত্রী বলল, "সব সময় 'আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম' বললেই তালাক হয় না। কারণ কেউ তার স্ত্রীকে কোনো জায়গায় নামিয়ে দিয়ে এসে বলতে পারে, 'আমি আমার বউকে ছেড়ে দিয়ে আসলাম'— এতে তো তালাক হয় না।"
এর জবাবে আমি বলি, "হ্যাঁ, সব সময় এই কথায় তালাক হয় না। এর জন্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্য থাকতে হয়। অনেক্ষন এ বিষয় নিয়ে কথা হলো আমাদের। তারপর আমি আমার স্ত্রীকে বলি " তোমার সাথে থাকবো না, তোমাকে ছেড়ে দিলাম" এই কথাটা বলার মুল উদ্দেশ্য ছিলো যে এভাবে বললে তালাক হয়ে যাবে। মানে বুঝানোটাই উদ্দেশ্য ছিলো
আমি এসব কথা শুধুমাত্র মাসআলা বোঝানোর উদ্দেশ্যে উদাহরণ হিসেবে বলেছি। আমার নিজের স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা বা নিয়ত আমার ছিল না।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনি আপনার স্ত্রীকে বলেছেন: "তোমার সাথে থাকবো না, তোমাকে ছেড়ে দিলাম" এবং আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই কথা বলার মূল উদ্দেশ্য ছিল তালাক হয়ে যাওয়া বোঝানো, অর্থাৎ আপনি চেয়েছিলেন যে এই শব্দগুলো বললে তালাক পতিত হয় কিনা তা বুঝাতে।
হানাফি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী: যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" (তালাক) বলে এবং তার নিয়ত বা উদ্দেশ্য থাকে তালাক পতিত করার, তাহলে তা একটি তালাকে রজ'ঈ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য তালাক) হিসেবে গণ্য হবে।
আপনি নিজেই বলেছেন, "এই কথাটা বলার মূল উদ্দেশ্য ছিলো যে এভাবে বললে তালাক হয়ে যাবে।" অর্থাৎ আপনার নিয়ত ছিল তালাক পতিত করা। তাই আপনার স্ত্রীর উপর একটি তালাকে রজ'ঈ পতিত হয়ে গেছে।
তালাকে রজ'ঈ এর বিধান: তালাকে রজ'ঈ হলে স্ত্রী ইদ্দত (তিন মাসিক বা তিন পবিত্রতা) পালন করবে। এই ইদ্দতের মধ্যে আপনি চাইলে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারেন (রুজু করতে পারেন), তবে এর জন্য নতুন করে মোহর বা আকদের প্রয়োজন নেই, শুধু বললেই হবে "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" অথবা সহবাস করলেও রুজু হয়ে যাবে। কিন্তু ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে তালাক চূড়ান্ত হয়ে যাবে এবং পুনরায় বিয়ে করতে হলে নতুন মোহর ও আকদের প্রয়োজন হবে।
আপনার প্রশ্নের মূল অংশ: আপনি বলেছেন যে, আপনার নিয়ত ছিল শুধু মাসআলা বোঝানো, কিন্তু আপনি যে বাক্যটি ব্যবহার করেছেন ("তোমার সাথে থাকবো না, তোমাকে ছেড়ে দিলাম") তা সরাসরি আপনার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে এবং আপনি স্বীকার করেছেন যে এর মাধ্যমে তালাক পতিত হওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল। তাই এই ক্ষেত্রে তালাক পতিত হওয়া আটকানো যাবে না।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি যদি সত্যিই তালাক দেওয়ার নিয়ত না করে থাকেন এবং শুধু উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, কিন্তু আপনার মুখ দিয়ে "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" বের হয়েছে এবং আপনি জানতেন এর অর্থ তালাক, তাহলে ফিকহের নিয়মে নিয়তের ভিত্তিতেই ফয়সালা হবে। যেহেতু আপনি বলেছেন উদ্দেশ্য ছিল তালাক বোঝানো, তাই তালাক পতিত হয়েছে।
আপনার করণীয়: যেহেতু তালাক পতিত হয়ে গেছে, তাই আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চান, তাহলে এখনই (ইদ্দতের মধ্যে) তাকে রুজু করে নিন। রুজু করার জন্য বলুন: "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" অথবা "আমি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলাম"। এরপর থেকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আগের মতোই চলবে। তবে খেয়াল রাখবেন, এটি ছিল প্রথম তালাক, তাই মোট তিনটি তালাকের মধ্যে একটি ব্যবহার হয়ে গেল।
মাসআলা বোঝানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা: ভবিষ্যতে মাসআলা বোঝানোর সময় সরাসরি নিজের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তালাকের শব্দ ব্যবহার করবেন না। কারণ এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাসআলা বোঝাতে চাইলে সাধারণভাবে বলুন, যেমন: "যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে, 'তোমাকে ছেড়ে দিলাম' এবং নিয়ত করে তালাকের, তাহলে তালাক পতিত হবে।"
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়াহ: তালাকের শব্দ ও নিয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): তালাকের শব্দ এবং নিয়তের ভিত্তিতে ফয়সালার নিয়ম উল্লেখ আছে।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: তালাকের শব্দ ও নিয়ত সম্পর্কিত ফতোয়া রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনি মাসআলা বুঝার এবং আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।