ব্যাংকে চাকরি করা কি জায়েয?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর।
ব্যাংকের চাকরির জায়েজ-নাজায়েজ বিষয়টি নির্ভর করে সুদ (রিবা)-এর সাথে সংশ্লিষ্টতার ওপর। কুরআন, সহিহ হাদিস এবং সালাফি বিদ্বানদের (ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, ইবন বাজ, আলবানী, উসাইমীন, ফাওযান) মতানুযায়ী মূলনীতি হলো:
১. কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট বিধান:
- আল্লাহ বলেন: "তোমরা সুদ খেয়ো না, দ্বিগুণ-চতুর্গুণ বৃদ্ধি করে। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩০)
- "যারা সুদ খায়, তারা কেয়ামতে দাঁড়াবে শয়তান আক্রান্ত উন্মাদের মতো। কারণ তারা বলে, ‘বেচাকেনাও তো সুদের মতো’। কিন্তু আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারাহ ২:২৭৫)
- সহিহ মুসলিমে (হাদিস নং ১৫৯৮) উল্লিখিত: রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ খায়, খাওয়ায়, লেখে এবং সাক্ষী থাকে—সবাইকে লানত করেছেন। ইমাম নববী (রহ.) বলেন: ‘লেখে’ বলতে দলিল-নথি প্রস্তুতকারী ও গণনাকারী, ‘সাক্ষী’ বলতে যে দু’পক্ষের মধ্যে দাঁড়ায়—সবাই লানতপ্রাপ্ত।
২. সালাফি বিদ্বানদের ফতোয়া:
- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি সুদের ভিত্তিতে চালিত ব্যাংকে কোনো কাজ করে, এমনকি সে যদি শুধু তরমুজও বিক্রয় করে, তবুও তা হারাম, কারণ সে সুদি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করছে।” (মাজমু’ ফাতাওয়া ২৯/৩০৯)
- শাইখ ইবন বাজ (রহ.) বলেন: “সুদি ব্যাংকে চাকরি করা জায়েজ নয়, চাই তা নিরাপত্তাকর্মী হোক বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কারণ সবাই ব্যাংকের সুদি কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়।” (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/৪২৭)
- শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি জানে তার চাকরি সুদের সাথে জড়িত, তার জন্য তা করা হারাম।” (সিলসিলা সহিহাহ ৯/৩৪৬)
- শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: “ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকের যেকোনো চাকরি—হিসাবরক্ষক, টেলার, ম্যানেজার—সবই হারাম, কারণ এরা সুদ লেখা, গণনা ও সহযোগিতার সাথে জড়িত।” (লিকা’ বাব আল-মাফতুহ)
- শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: “সুদি ব্যাংকে চাকরি করা জায়েজ নয়, এমনকি পিওন বা ড্রাইভারের চাকরিও না, কারণ এটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।” (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান ১/২২১)
৩. কোন কোন পোস্ট জায়েজ হতে পারে?
উপরোক্ত দলিল ও ফতোয়ার আলোকে ঐতিহ্যবাহী (সুদি) ব্যাংকের কোনো পোস্টই জায়েজ নয়, কারণ:
- প্রত্যেক কর্মী ব্যাংকের অর্থনৈতিক কার্যকলাপে অংশ নেয়।
- নিরাপত্তাকর্মীও ব্যাংকের শাখাকে সুরক্ষা দিয়ে সুদি লেনদেনের স্থান স্থায়ী করে।
- পরিচ্ছন্নতাকর্মীও ব্যাংকের সুদি কাগজপত্র, আসবাব ইত্যাদি পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখে।
হ্যাঁ, শুধুমাত্র যদি ব্যাংকটি পুরোপুরি ইসলামি (সুদমুক্ত) হয় এবং শারিয়াহ বোর্ড দ্বারা অনুমোদিত হয়, তাহলে সব পোস্ট জায়েজ। তবে বাস্তবে অধিকাংশ ব্যাংক সুদি, তাই সেখানে কোনো পোস্টই গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. ব্যতিক্রম (যদি কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে):
- যদি জীবিকা নির্বাহের আর কোনো উপায় না থাকে এবং ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে সুদি কাজ থেকে বিরত থেকে শুধুমাত্র নিরাপত্তা বা পরিচ্ছন্নতার মতো ‘সুদ বিষয়ক লেনদেনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়’ এমন কাজ করে—তবে কিছু বিদ্বান অনিচ্ছায় সাময়িক অনুমতি দিয়েছেন (যেমন ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু’ ফাতাওয়া ২৯/৩০৭)। কিন্তু এটিও নাজায়াজের নিকটবর্তী, তাই সর্বোত্তম হলো সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা।
উপসংহার: প্রশ্নে উল্লেখিত ‘ব্যাংকের পোস্ট’ বলতে সুদি ব্যাংক বুঝালে—কোনো পোস্টই জায়েজ নয়। দলিল: কুরআন, হাদিস ও সালাফি বিদ্বানদের ঐকমত্য। মুসলিমদের উচিত হালাল উপার্জনের পথ অবলম্বন করা এবং সুদি প্রতিষ্ঠানের কোনো সাহায্য না করা। আল্লাহ তাওফিক দিন।