"নিজের জীবদ্দশায় ভাড়া আয়ের অধিকার রেখে সম্পত্তি ওয়াকফ করার হুকুম"
Zakat and Charity · Hanafi
Question
বর্তমানে উভয় বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ভাড়া আমি ও আমার ভাই আমাদের মালিকানার অংশ অনুযায়ী ভাগাভাগি করে গ্রহণ করি।
আমি আমার মালিকানাধীন অংশ (জমি ও তাতে আমার স্বত্বাধিকার) মসজিদের নামে ওয়াকফ করতে চাই। তবে আমার ইচ্ছা হলো, ওয়াকফ করার পরও আমি যতদিন জীবিত থাকব, ততদিন আমার অংশ থেকে যে ভাড়া আয় হবে তা আমি নিজেই গ্রহণ করব। আমার মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তি বা তার আয় সম্পূর্ণভাবে মসজিদের জন্য নির্ধারিত থাকবে।
প্রশ্ন হলো, হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এ ধরনের ওয়াকফ করা কি বৈধ হবে? অর্থাৎ, ওয়াকফকারী নিজের জীবদ্দশায় ভোগদখল ও ভাড়া আয়ের অধিকার নিজের জন্য শর্তসাপেক্ষে রেখে ওয়াকফ করতে পারে কি না?
Answer
ওয়াকফের শর্ত ও নিজের জন্য আয়ের অধিকার রাখা
প্রশ্ন: আমি আমার মালিকানাধীন অংশ (জমি ও তাতে আমার স্বত্বাধিকার) মসজিদের নামে ওয়াকফ করতে চাই। তবে আমার ইচ্ছা হলো, ওয়াকফ করার পরও আমি যতদিন জীবিত থাকব, ততদিন আমার অংশ থেকে যে ভাড়া আয় হবে তা আমি নিজেই গ্রহণ করব। আমার মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তি বা তার আয় সম্পূর্ণভাবে মসজিদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এ ধরনের ওয়াকফ করা কি বৈধ হবে?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ। আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ:
হানাফি মাজহাবের মূল নীতি
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ওয়াকফের মূল শর্ত হলো ওয়াকফকৃত সম্পত্তির মালিকানা আল্লাহর নামে নিবেদন করা এবং তা থেকে ওয়াকফকারীর কোনো প্রকার মালিকানা বা স্বত্বাধিকার ছিন্ন হয়ে যাওয়া। ওয়াকফ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে সম্পত্তিটি ওয়াকফকারীর মালিকানা থেকে বেরিয়ে যায় এবং আল্লাহর মালিকানায় বা সাধারণ মুসলিমদের কল্যাণে নিবেদিত হয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ওয়াকফকারী নিজের জন্য ভোগদখল বা আয়ের অধিকার শর্ত হিসেবে রাখতে পারেন না। ওয়াকফের মাধ্যমে সম্পত্তি থেকে তার মালিকানা সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি যদি নিজের জন্য কোনো সুবিধা বা আয়ের শর্ত রাখেন, তবে তা ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ওয়াকফকারী নিজের জীবদ্দশায় ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আয় থেকে নিজের জন্য কিছু শর্ত রাখতে পারেন, তবে তা যেন ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন না করে। তবে এই মতেও ওয়াকফকারীর জন্য নিজের ভরণপোষণের প্রয়োজনীয়তা পূরণের শর্ত রাখা জায়েয আছে, কিন্তু তা যদি অন্য কারো জন্য ক্ষতির কারণ হয় তবে তা বৈধ নয়।
ফতোয়ায় যে মতটি প্রাধান্য পেয়েছে
হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত (যেটি ফতোয়ার ভিত্তি) হলো ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত। এই মত অনুযায়ী, ওয়াকফকারী নিজের জীবদ্দশায় ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আয় থেকে নিজের জন্য কিছু অংশ রাখার শর্ত করতে পারেন, তবে শর্তটি অবশ্যই ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে
আপনি যে শর্তটি রাখতে চান—ওয়াকফ করার পরও যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন আপনার অংশ থেকে ভাড়া আয় নিজে গ্রহণ করবেন—এটি হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী বৈধ হবে। কারণ:
১. আপনি ওয়াকফের মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানা মসজিদের নামে নিবেদন করছেন। ২. আপনার জীবদ্দশায় আয়ের অধিকার নিজের জন্য রাখার শর্তটি ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্য (মসজিদের কল্যাণ) বিনষ্ট করছে না। ৩. আপনার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ আয় মসজিদের জন্য নির্ধারিত থাকবে, যা ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্য পূরণ করবে।
তবে মনে রাখতে হবে, ওয়াকফ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে সম্পত্তিটির মালিকানা আপনার কাছ থেকে চলে যাবে এবং তা আর আপনার সম্পত্তি থাকবে না। আপনি শুধু আয়ের অধিকার নিজের জন্য রাখতে পারবেন, সম্পত্তির মালিকানা নয়।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. ওয়াকফ করার সময় সাক্ষী রাখা এবং স্থানীয়ভাবে নিবন্ধন করা উত্তম। ২. ওয়াকফনামায় স্পষ্টভাবে শর্তগুলো উল্লেখ করা প্রয়োজন। ৩. ওয়াকফের পর আপনি যদি আয় নিজে গ্রহণ করেন, তবে তা আপনার জন্য হালাল হবে, কারণ এটি ওয়াকফকারীর জন্য বৈধ শর্ত হিসেবে গণ্য হবে।
উপসংহার: হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, আপনি নিজের জীবদ্দশায় ভাড়া আয়ের অধিকার নিজের জন্য রেখে ওয়াকফ করতে পারবেন। এটি বৈধ হবে এবং আপনার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ সম্পত্তি ও আয় মসজিদের জন্য নির্ধারিত থাকবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।