বিসিএস ডক্টর হিসেবে জব করা কি জায়েজ?
Business and Job · Hanafi
Question
আমার স্বামী একজন ইন্টার্ন ডক্টর। উনি ৫ম বর্ষে থাকা কালীন সবাইকে জানান যে উনি আর মেডিকেলে পড়তে চান না। উনার ফ্রী মিক্সিং এ পড়াশোনা করা লাগে, শরীয়তে ফ্রী মিক্সিং জায়েজ নেই। কলেজে গেলেই নাকি উনার খুব অস্বস্তি হতো, মনে হতো কখন বের হবে এখান থেকে। এমনও হয়েছে কলেজে গিয়ে ক্লাস শেষ না করেই চলে এসেছেন। এমন অবস্থা দেখে আমার শ্বশুর উনাকে নিয়ে আব্দুল মালেক হুজুরের কাছে নিয়ে যান, হুজুর বলেন যে এমবিবিএস শেষ করতে, শেষ করে সামনে কি করবেন সেজন্য দরকার হলে দেখা করতে। হুজুরের কথায়ও হবে না, পড়বে না মানে না এমন অবস্থা। পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারি এগুলো জাদুর জন্য হচ্ছে, যার কারনে আমি স্ত্রী হিসেবে উনাকে অনেক জোর করি এম বি বি এস টা শেষ করতে। যাই হোক পরবর্তীতে উনি ফাইনাল এক্সাম দেন এবং ইন্টারশীপ শুরু করেন। হুট করে কেন রাজি হইলেন সেটা এখনও জানা নাই আমার, কারন উনার সাথে কথায় কেউ পারে না। যারা যাদু করে তারা মূলত আমার আত্নীয়। ওরা আমার মা, বাবা, ভাই, বোন, আমি, আমার স্বামী সবাইকেই যাদু করে। এখন আমার ছোট ভাইয়ের এইচ এস সি চলে তাই ওরা এখন বেশি বেশি যাদু করছে যা আমি স্বপ্নে দেখি। ওদের পরিচয়ও আমি স্বপ্নে জানতে পারি। এখন এই যাদু করার পর আমার স্বামী আবার শুরু করসেন যে ইন্টার্নশীপ শেষ করবেন না। মহিলা কলিগ, মহিলা রোগী উনার জন্য এসব জায়েজ নাই। তো সিহরের পানি আর মদিনার আজওয়া খাওয়ার পর এখন এমন বলছেন যে ইন্টার্নশীপ শেষ করবেন কিন্তু এরপর ক্যারিয়ারে আর কিছু করবেন না, শুধু পুরুষ রোগী দেখবেন, রিযিক তো মাধ্যম দিয়ে আসে না, রিযিক নির্ধারিত, আমি কেন ভয় পাই, আল্লাহর উপর ভরসা নাই। কিন্তু উনিই বলেন ইন্টার্নশীপে কিছু শেখায় না তেমন, নিজে চেম্বার করার মতও কনফিডেন্স আসে না ওতটুকুতে। বিসিএসে গেলে সামনে শেখার সুযোগ হয় আবার বিসিএস ডক্টরদের জন্য অন্যান্য ডিগ্রি নেওয়া সহজ। কয়েকদিন বিসিএসের জন্য পড়লোও বাসায়, কিন্তু এই যাদুর সমস্যা বাড়ার পর উনি বলছেন যে বিসিএসে ৭০% মহিলা রোগী দেখা লাগবে, মহিলা কলিগ আছে, যদিও মহিলা কলিগ কম ১০ জনে ২/৩ জনের মত। পুরুষ ডাক্তারের মহিলা রোগী দেখা জায়েজ নাই আবার মহিলা কলিগের সাথে কাজ করাও জায়েজ নাই। তো আমি বললাম শুধু এফ সি পি এস, এমডি, বা এমএস করতে শিশু রোগের উপর। নাহ, তাও করবে না কারন কলিগরা মহিলা বেশি আবার বাচ্চার সাথে মহিলা এটেনডেন্স থাকে মানে মা থাকে। এখন আমার প্রশ্ন হলো আসলেই কি বিসিএস ডাক্তার হয়ে মহিলা কলিগ দের সাথে কাজ করা বা মহিলা রোগী দেখা জায়েজ নাই? এটা ২ বছর করে তারপর শিশু বিশেষজ্ঞ হয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া যাবে। বা যদি এটা জায়েজ না হয় তাহলে মহিলা কলিগ, এটেনডেন্স আছে এমন জায়গায় শিশুরোগের উপর এফ সি পি এস, এমডি বা এমএস করাও কি জায়েজ নাই? যদি তাও না হয় তাহলে এই এমবিবিএসটা শুধু নামেই যা সামনে শুধু এগুতে সাহায্য করবে কিন্তু শুধু এটা দিয়ে নিজে চেম্বার করার মত শেখা যায় নি তেমন, তাহলে উনি কি করবেন? চেম্বার করলেও নাকি শুধু পুরুষ দেখবেন, যদিও উনার রোগী দেখার কনফিডেন্স টাও নাই, শেখা হয় নি অনেক কিছুই। গাইনী বাকি শুধু ইন্টার্নশীপে আর সার্জারী শেষ দিকে। আবার অন্য কোন স্কিলও নেই, অনেক সুযোগ ছিল মেডিকেলে থাকতে ইনকাম করে টাকা কিছু জমিয়ে অন্য কিছু করার, কিন্তু যাদুর জন্য উনি নিজে চলার মত টাকাও ইনকাম করতে পারতেন না। উনি কোন কাজ তেমন নিজে থেকে করতে পারেন না, অনেক ভাবে ব্যবসার ট্রাই করসিলেন সেগুলোও কিছু হয় নি উল্টো অনেক টাকা ঋণ আছে উনার। আমাদের আলহামদুলিল্লাহ ৩ সন্তান। উনি উনার ফ্যামিলির দায়িত্ব নিয়েও চিন্তিত নন। উনার এসব কারনে খুবই হতাশ লাগে কিছু নসিহা করবেন প্লিজ।
Answer
বিসিএস ডাক্তার হিসেবে মহিলা কলিগের সাথে কাজ করা ও মহিলা রোগী দেখা প্রসঙ্গে
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারিণী বোন, আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি আমি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার স্বামীর বিষয়ে জানতে পেরে সত্যিই দুঃখিত। আসুন, আমরা শরীয়তের আলোকে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করি।
১. মহিলা রোগী দেখা প্রসঙ্গে শরীয়তের বিধান:
ইসলামী শরীয়তে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূলনীতি হলো—প্রয়োজনের তাগিদে নিষিদ্ধ বিষয় বৈধ হয়ে যায় (الضرورات تبيح المحظورات)।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ)在其著名的著作 রদ্দুল মুহতার -এ উল্লেখ করেছেন:
"إذا اضطرت المرأة إلى الطبيب، جاز لها أن يكشف موضع الضرورة عند الطبيب بقدر الحاجة، وينبغي أن يكون الطبيب مسلماً ثقة، فإن لم يوجد فذمي، ويقدم الطبيبة على الطبيب عند الحاجة"
অর্থ: "যদি মহিলা চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তায় বাধ্য হয়, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ডাক্তারের কাছে সেই স্থান প্রকাশ করা জায়েয। ডাক্তার মুসলিম ও বিশ্বস্ত হওয়া উচিত। যদি মুসলিম ডাক্তার না পাওয়া যায় তবে অমুসলিম ডাক্তার দেখাতে পারবে। প্রয়োজনে পুরুষ ডাক্তারের চেয়ে মহিলা ডাক্তারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৫)
আল-হিদায়া -তেও উল্লেখ আছে:
"وللمرأة أن تكشف وجهها وكفيها عند الطبيب للحاجة"
অর্থ: "মহিলা প্রয়োজনে ডাক্তারের কাছে তার চেহারা ও হাতের তালু প্রকাশ করতে পারবে।"
(আল-হিদায়া, ৪/৪৬০)
ফতোয়ায়ে আলমগীরী -তে বলা হয়েছে:
"إذا احتاجت المرأة إلى مداواة، فلها أن تنظر إلى موضع الداء بقدر الحاجة، ولا يحل للطبيب النظر إلى ما وراء ذلك"
অর্থ: "যদি মহিলার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী রোগের স্থান দেখা জায়েয। এর বেশি দেখা ডাক্তারের জন্য বৈধ নয়।"
(ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ৫/৩৫৫)
সুতরাং, বিসিএস ডাক্তার হিসেবে মহিলা রোগী দেখা জায়েয আছে যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পালন করা হয়:
১. প্রয়োজন থাকতে হবে - অর্থাৎ মহিলা রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। ২. মহিলা ডাক্তার না থাকলে - যদি মহিলা ডাক্তার পাওয়া যায়, তবে মহিলা ডাক্তারের কাছে পাঠানো উচিত। কিন্তু যদি মহিলা ডাক্তার না থাকে বা মহিলা ডাক্তারের কাছে যাওয়া সম্ভব না হয়, তবে পুরুষ ডাক্তার দেখাতে পারবেন। ৩. প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত পরিমাণে - শুধুমাত্র রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান দেখা যাবে, এর বেশি নয়। ৪. মাহরাম বা অন্য মহিলা উপস্থিত থাকা - সম্ভব হলে রোগীর সাথে অন্য মহিলা বা মাহরাম পুরুষ থাকা উচিত। ৫. পর্দার প্রতি লক্ষ্য রাখা - রোগীকে পর্দা করতে বলা এবং ডাক্তারও পর্দার প্রতি লক্ষ্য রাখবেন।
২. মহিলা কলিগের সাথে কাজ করা:
মহিলা কলিগের সাথে কাজ করা নিজে নিজে হারাম নয়, তবে ফ্রি-মিক্সিং (অবাধ মেলামেশা) হারাম। অর্থাৎ, কাজের প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণে কথা বলা ও সহযোগিতা করা জায়েয, কিন্তু অবাধ মেলামেশা, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, একান্তে থাকা ইত্যাদি হারাম।
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ
"হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।" (সূরা নূর: ২১)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:
"مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ"
"আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা আমি রেখে যাইনি।" (বুখারী: ৫০৯৬, মুসলিম: ২৭৪০)
তবে কাজের প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণে সহযোগিতা করা জায়েয, যদি পর্দার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় এবং অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা না হয়।
৩. শিশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য এফসিপিএস/এমডি/এমএস করা:
শিশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য এফসিপিএস, এমডি বা এমএস করা জায়েয আছে। শিশুদের চিকিৎসায় মহিলা রোগী ও মহিলা এটেনডেন্স থাকলেও, এটি প্রয়োজনীয় কাজ। তবে শর্ত হলো—পর্দার প্রতি লক্ষ্য রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত পরিমাণে কথা বলা, এবং অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা থেকে বিরত থাকা।
৪. আপনার স্বামীর জন্য নসীহা:
১. সর্বপ্রথম জাদু থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করুন - আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনার স্বামীর উপর জাদু করা হয়েছে। জাদু থেকে মুক্তির জন্য কুরআন-সুন্নাহর বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া
- আয়াতুল কুরসি পড়া
- সূরা বাকারাহ নিয়মিত পড়া
- জাদুর প্রভাব দূর করার জন্য বৈধ রুকইয়াহ করা
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"بَيْتٌ تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ لَا يَدْخُلُهُ الشَّيْطَانُ" "যে ঘরে সূরা বাকারাহ পড়া হয়, সে ঘরে শয়তান প্রবেশ করে না।" (মুসলিম: ৭৮০)
২. তাওয়াক্কুল ও ভরসা - আপনার স্বামীকে বুঝান যে, রিযিকের মালিক আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা রিযিক দেন। তবে চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা তালাক: ৩)
৩. পেশাগত দক্ষতা অর্জন - আপনার স্বামীকে বুঝান যে, ইন্টার্নশিপ শেষ করা এবং বিসিএস বা অন্যান্য ডিগ্রি অর্জন করা তার জন্য জরুরি। কারণ:
- এটি তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয়
- এটি সমাজের সেবার একটি মাধ্যম
- এটি তার নিজের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়
৪. স্ত্রী হিসেবে আপনার কর্তব্য - আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং স্বামীকে উৎসাহিত করুন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"خَيْرُ النِّسَاءِ الَّتِي تَسُرُّهُ إِذَا نَظَرَ، وَتُطِيعُهُ إِذَا أَمَرَ، وَلَا تُخَالِفُهُ فِي نَفْسِهَا وَمَالِهَا بِمَا يَكْرَهُ" "সেরা নারী সেই, যে স্বামী দেখলে খুশি করে, আদেশ করলে মেনে চলে, এবং নিজের ও স্বামীর সম্পদে এমন কিছু করে না যা স্বামী অপছন্দ করে।" (নাসাঈ: ৩২৩১)
৫. ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা - আপনার স্বামীর ঋণ আছে উল্লেখ করেছেন। ঋণ পরিশোধ করা জরুরি। ইন্টার্নশিপ শেষ করে এবং বিসিএস বা অন্য কোনো চাকরি করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করুন।
৫. জাদু সম্পর্কে সতর্কতা:
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনার আত্মীয়রা জাদু করে। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। জাদু করা কুফরী পর্যায়ের গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَىٰ "যাদুকর যেখানেই আসুক, সফল হবে না।" (সূরা ত্বহা: ৬৯)
জাদু থেকে বাঁচার জন্য:
- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া
- সূরা বাকারাহ নিয়মিত পড়া
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির করা
- আয়াতুল কুরসি পড়া
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
বিসিএস ডাক্তার হওয়া এবং মহিলা রোগী দেখা জায়েয আছে যদি শরীয়তের শর্তগুলো পালন করা হয়। মহিলা কলিগের সাথে কাজ করাও জায়েয, যদি পর্দার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় এবং অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা না হয়। শিশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য এফসিপিএস/এমডি/এমএস করাও জায়েয।
তবে আপনার স্বামীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: ১. জাদু থেকে মুক্তি লাভ করা ২. ইন্টার্নশিপ শেষ করা ৩. বিসিএস বা অন্য কোনো পেশাগত ডিগ্রি অর্জন করা ৪. পরিবারের দায়িত্ব পালন করা
আল্লাহ তাআলা আপনার স্বামীকে হিদায়াত দান করুন এবং জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি দিন। আমীন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।