বেতনের নিয়তে কুরআন পড়ালে কি গোনাহ হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
একজন ব্যাক্তি কুরআন শিখান বাচ্চাদেরকে, এখন উনি যদি এই নিয়ত করে শেখান, যে কুরআন শেখালে আমাকে বেতন দেওয়া হবে,,এজন্য আমি শিখাই তাহলে কি কবীরা গুনাহ হবে?
উনি এই নিয়তও করেন যে, কুরআন শিখালে সওয়াব হবে, সাথে এটাও নিয়ত করেন, কুরআন শিখালে টাকা পাওয়া যাবে, এধরণের নিয়ত করলে কি কবীরা গুনাহ হবে?
Answer
উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
নিম্নোক্ত তথ্য-উপাত্তের আলোকে প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া হলো—
(১) কুরআন শেখানোর বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করা কি জায়েয?
হানাফি মাজহাব মতে, কুরআন শিক্ষাদানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অভিমত অনুযায়ী, কুরআন শিক্ষাদান একটি পেশা হিসেবে গ্রহণ করা এবং এর বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা বৈধ। তবে এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ নিয়ত ও ইখলাস (একনিষ্ঠতা) অপরিহার্য।
দলিলঃ
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, "কুরআন শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা জায়েয, কারণ এটি একটি বৈধ পেশা।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৪/৪৪৩; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)
- ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, কুরআন শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা মাকরূহ তানযীহি (অপছন্দনীয়), তবে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতামতই অধিক শক্তিশালী। (আল-হিদায়া, ৩/২৩৪)
(২) শুধুমাত্র বেতনের নিয়তে শেখালে কি কবীরা গুনাহ হবে?
যদি কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র পার্থিব লাভ (বেতন) এর উদ্দেশ্যে কুরআন শেখায়, এবং তার নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টি বা সওয়াবের কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে তা নাজায়েয ও গুনাহের কাজ হবে। তবে এটি কবীরা গুনাহ কিনা—এ ব্যাপারে হানাফি ফুকাহায়ে কিরামের মতামত হলো, এটি কবীরা গুনাহ নয় বরং ছগীরা গুনাহ বা মাকরূহ তাহরীমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) গণ্য হবে। কারণ এটি ইখলাসের পরিপন্থী।
হাদীসঃ
- রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান শিক্ষা করে যা দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়, কিন্তু সে তা শুধুমাত্র দুনিয়ার সামান্য সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে করে, সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।" (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
- এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায়, নিছক দুনিয়াবি লাভের নিয়তে জ্ঞানার্জন বা শিক্ষাদান ভয়াবহ গুনাহ, তবে তা শিরক বা কুফরের মতো কবীরা গুনাহ নয়।
(৩) সওয়াব ও বেতন উভয়ের নিয়ত করলে বিধান কী?
যদি কেউ একই সাথে এই নিয়ত করে যে, "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং সওয়াব লাভের জন্যও শেখাচ্ছি, আবার এর বিনিময়ে বেতনও গ্রহণ করব", তাহলে এ নিয়তটি মাকরূহ তানযীহি (অপছন্দনীয়) হবে। তবে এটি গুনাহ হবে না, যদি সওয়াবের নিয়ত প্রাধান্য পায় এবং বেতনকে জীবিকার প্রয়োজনীয় মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়।
ফাতাওয়ায়ে উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি) তে এসেছে—
"কুরআন শিক্ষাদান একটি ইবাদত। এতে যদি দুনিয়াবি উদ্দেশ্য মিশ্রিত হয়, তবে তা ইবাদতের পূর্ণতায় বাধা সৃষ্টি করে, কিন্তু ইবাদত বাতিল করে না। তাই উভয় নিয়ত থাকলে সওয়াব কম হবে, কিন্তু গুনাহ হবে না, যদি মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়।" (ফাতাওয়া উসমানী, ১/৫২৩)
(৪) হানাফি ফুকাহার মতামত
- ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে বলেন, "কুরআন শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ জায়েয, তবে শর্ত হলো শিক্ষকের নিয়ত যেন ইখলাসপূর্ণ থাকে। যদি নিয়ত শুধু দুনিয়াবি হয়, তবে তা নাজায়েয।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)
- মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় বলেন, "কুরআন শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা জায়েয, কিন্তু উত্তম হলো বিনিময় না নেওয়া। তবে জীবিকার প্রয়োজনে নিলে দোষ নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩৪)
সারসংক্ষেপ
| নিয়তের ধরন | বিধান | টিকা | |-------------|--------|------| | শুধু বেতনের নিয়ত | নাজায়েয ও গুনাহ (ছগীরা গুনাহ) | ইখলাসের অভাব | | সওয়াব + বেতন উভয় নিয়ত | মাকরূহ তানযীহি (গুনাহ নয়) | সওয়াব কম হবে, তবে কাজ বৈধ | | শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি | উত্তম ও পূর্ণ সওয়াব | ইখলাসই আসল |
সতর্কতা
- নিয়তের সংশোধন জরুরি। প্রতিবার শিক্ষাদানের আগে "আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য" নিয়ত করে নেওয়া উচিত।
- বেতনকে জীবিকার মাধ্যম মনে করবেন, কিন্তু মূল লক্ষ্য রাখবেন দ্বীন শিক্ষা দেওয়া ও সওয়াব অর্জন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইখলাসের সাথে দ্বীনি কাজ করার তাওফিক দান করুন।